শতাব্দীর 'সবচেয়ে শক্তিশালী' এল নিনোর মুখে যুক্তরাজ্য
- লন্ডন থেকে অ্যামাজন–বদলে যেতে পারে আবহাওয়ার ছন্দ

এ বারের এল নিনো হতে পারে 'স্মরণকালের সবচেয়ে শক্তিশালী'
প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে তৈরি হচ্ছে এমন এক আবহাওয়ার পরিবর্তন, যা আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের আবহাওয়ার ছন্দই বদলে দিতে পারে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর মেট অফিসের সতর্কবার্তা, এ বারের এল নিনো হতে পারে 'স্মরণকালের সবচেয়ে শক্তিশালী'। নিজের ওয়েবসাইটে গতকাল এ পূর্বাভাস দিয়েছে মেট অফিস।
এই প্রাকৃতিক আবহাওয়া চক্রের প্রভাবে এক দিকে বাড়তে পারে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা, অন্য দিকে দেখা দিতে পারে ভয়াবহ খরা, অতিবৃষ্টি, ঝড় ও কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয়। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই শক্তিশালী এল নিনোর যোগ হলে ২০২৭ সাল পৃথিবীর উষ্ণতম বছরও হয়ে উঠতে পারে।
এল নিনো এখনও পুরো শক্তিতে পৌঁছয়নি। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। মেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বারের এল নিনো ঐতিহাসিকভাবে বিরল শক্তির হতে পারে। সাধারণত এল নিনোর সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের জল অস্বাভাবিক ভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে এবং সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে বিশ্বের বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টির ধরনে।
ব্রিটেনে গরমের পর এ বার ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা
এল নিনোর প্রভাব সরাসরি ব্রিটেনের আবহাওয়ার সঙ্গে সব সময় এক রকম হয় না। তবে মেট অফিসের বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ বারের শক্তিশালী এল নিনো শরৎ ও শীতের সময়ে যুক্তরাজ্যে অস্থির আবহাওয়া তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নভেম্বর নাগাদ অতিরিক্ত বৃষ্টি ও ঝড়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই পূর্বাভাস এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ব্রিটেন ইতিমধ্যেই চরম আবহাওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম হওয়ার পথে রয়েছে। জুন থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১.৮৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ইংল্যান্ডে খরা পরিস্থিতিও তীব্র হয়েছে।
জুলাইয়ে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে রেকর্ড কম বৃষ্টি হয়েছে। ইংল্যান্ডে মাসজুড়ে মাত্র ৬.৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের মাত্র ১০ শতাংশ। ফলে মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী সময়ে ভারী বৃষ্টি এলেও বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মেট অফিসের অধ্যাপক অ্যাডাম স্কাইফের মতে, শক্তিশালী এল নিনোর কারণে ব্রিটেনে শরৎকালে ঝড়ো আবহাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তবে এটি একমাত্র কারণ নয়, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার প্রবণতা আরও তীব্র হচ্ছে।
শুধু ব্রিটেন নয়, বিশ্বজুড়ে বিপদের সংকেত
এল নিনোর প্রভাব কোনও একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া এই পরিবর্তন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ভারসাম্য বদলে দেয়।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, শক্তিশালী এল নিনোর কারণে দক্ষিণ গোলার্ধের কিছু অঞ্চলে তীব্র খরা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অ্যামাজন অঞ্চলে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইতিমধ্যেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো চরম পর্যায়ে পৌঁছালে অ্যামাজন বৃষ্টিবনের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে, বাড়তে পারে দাবানল ও জলসংকট।
এশিয়ার কিছু অংশেও প্রভাব পড়তে পারে। এল নিনোর কারণে বর্ষার ধরন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় চাপ তৈরি করতে পারে। মেট অফিস জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন ইতিমধ্যেই বদলাতে শুরু করেছে এবং কোথাও অতিরিক্ত শুষ্কতা, কোথাও অতিবৃষ্টির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
উষ্ণতম বছরের আশঙ্কা
এল নিনো সাধারণত পৃথিবীর তাপমাত্রা সাময়িক ভাবে বাড়িয়ে দেয়। তবে এ বার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, কারণ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।
মেট অফিসের বিজ্ঞানীদের মতে, ২০২৭ সাল পৃথিবীর উষ্ণতম বছর হওয়ার সম্ভাবনা “খুব বেশি”। কারণ এল নিনোর অতিরিক্ত উষ্ণতার সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে সৃষ্ট তাপমাত্রা বৃদ্ধিও যোগ হবে।
তবে বিজ্ঞানীরা এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এল নিনো নিজে কোনও নতুন জলবায়ু সংকট তৈরি করে না। বরং এটি এমন এক প্রাকৃতিক চক্র, যা ইতিমধ্যেই উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলিকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
কী এই এল নিনো?
এল নিনো হল এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন (ইএনএসও) নামের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রের উষ্ণ পর্যায়। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এটি দেখা যায়। তখন নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্য অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়।
এই অতিরিক্ত উষ্ণ জল বায়ুমণ্ডলের প্রবাহে পরিবর্তন আনে। তার ফলে পৃথিবীর এক প্রান্তে খরা, অন্য প্রান্তে অতিবৃষ্টি বা ঝড়ের মতো বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
গত কয়েক দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি ছিল ২০১৫-১৬ সালের ঘটনা। সেই সময় বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছিল এবং বহু অঞ্চলে খরা ও বন্যার ঘটনা দেখা গিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এ বারের ঘটনা তার চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, পৃথিবীর আবহাওয়া এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অস্থির। প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েক ডিগ্রি উষ্ণতা তাই শুধু সমুদ্রের সমস্যা নয়; তার ঢেউ পৌঁছতে পারে ব্রিটেনের ঝড়-বৃষ্টি থেকে শুরু করে বিশ্বের খাদ্য, কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রায়।






