অনলাইনে কিশোরীদের যৌন নির্যাতন ও ব্ল্যাকমেইল
ফ্রান্সে ভারতীয় যুবকের ২০ বছরের কারাদণ্ড

এআই নির্মিত ছবি
অনলাইনে আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র গড়ে তুলে বিভিন্ন দেশের অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের যৌন নির্যাতন, ব্ল্যাকমেইল ও শারীরিক নিপীড়নে বাধ্য করার দায়ে ভারতীয় নাগরিক রোহান রানেকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ফ্রান্সের একটি আদালত। ২৯ বছর বয়সী এই যুবক ‘সিভিএলটি’ নামের একটি সহিংস অনলাইন গোষ্ঠীর অন্যতম নেতা ছিলেন। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর প্যারিসের আদালত এ রায় দেন। মামলায় তাঁর ৩০ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছিলেন সরকারি কৌঁসুলিরা।
ফ্রান্স ২৪, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং ফরাসি দৈনিক ল্য মঁদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীর সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের লক্ষ্যবস্তু বানাতেন। অনলাইনে প্রথমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে তোলা হতো। পরে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হতো। এর মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের যৌন কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা এবং নিজেদের শরীরে আঘাত করতে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করে সেগুলো অনলাইনে আদানপ্রদান করতেন গোষ্ঠীর সদস্যরা। ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানো এবং তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য এসব ভিডিও ব্যবহার করা হতো। গোষ্ঠীটির সঙ্গে নব্য নাৎসি মতাদর্শ, বর্ণবাদ, ইহুদিবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ এবং চরম সহিংসতার সম্পর্কও পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
যেভাবে সামনে আসে অপরাধচক্রের কর্মকাণ্ড
২০২০ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষাবিষয়ক একটি সংস্থা অনলাইনে ১২ বছর বয়সী এক শিশুর নির্যাতনসংক্রান্ত ছবি শনাক্ত করে। ছবিতে শিশুটিকে নিজের শরীরে রোহান নামটি খোদাই করতে উৎসাহিত করার তথ্য পাওয়া যায়। ওই ঘটনার সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফরাসি তদন্তকারীরা অপরাধচক্রটির কর্মকাণ্ড অনুসন্ধান করেন। তদন্তে রোহান রানেকে গোষ্ঠীটির অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
গোষ্ঠীটি অনলাইন যোগাযোগমাধ্যম ডিসকর্ড ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখত। তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, সদস্যরা বিভিন্ন অনলাইন ফোরাম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা কিশোরীদের খুঁজে বের করতেন। পরে তাদের ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্য, বন্ধু কিংবা সহপাঠীদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো।
কিছু ক্ষেত্রে মিথ্যা জরুরি খবর দিয়ে ভুক্তভোগীদের বাড়িতে পুলিশ পাঠানোর ভয়ও দেখানো হতো। এভাবে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে তাদের বিভিন্ন কাজে বাধ্য করা হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
নির্যাতনের শিকার অন্তত ২০ জন ফরাসি দৈনিক ল্য মঁদ ও সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তে অন্তত ২০ জন ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জন, যাদের বয়স বর্তমানে ১৮ থেকে ২১ বছরের মধ্যে, মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভুক্তভোগী পক্ষ হিসেবে অংশ নেন। তাদের অধিকাংশই নির্যাতনের শিকার হওয়ার সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। অনেকের বয়স ছিল ১৫ বছরেরও কম।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের দিয়ে নিজেদের শরীরে আঘাত করানো, ধারালো বস্তু দিয়ে ত্বকে নাম বা নাৎসি প্রতীক খোদাই করানো এবং বিপজ্জনক কাজ করতে বাধ্য করার মতো ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতনের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারেরও অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, এই গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য শুধু যৌন ব্ল্যাকমেইল করে সুবিধা আদায় করা ছিল না। ভুক্তভোগীদের ওপর চরম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নির্যাতনের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনও তাদের কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল।
ভারতের পুনে থেকে ফ্রান্সে, ২০২১ সালে গ্রেপ্তার রোহান রানে ভারতের পুনে শহরের বাসিন্দা। পড়াশোনার জন্য তিনি ফ্রান্সে যান এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্তিব শহরে একটি ব্যবসায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। পরে শরীরচর্চার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।
২০২১ সালে ফ্রান্সের আন্তিব শহর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোহান রানে পরে অনলাইন গোষ্ঠীটির প্রশাসক হিসেবে নিজের ভূমিকার কথা স্বীকার করেছিলেন। তদন্তকারীরা তার কম্পিউটার ও মুঠোফোনে পাওয়া ভিডিও এবং অন্যান্য তথ্য পরীক্ষা করে ভুক্তভোগীদের ওপর নির্যাতনের প্রমাণ সংগ্রহ করেন।
গ্রেপ্তারের পরও তার অনলাইন যোগাযোগ অব্যাহত ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এমনকি আটক অবস্থায়ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাদের গোষ্ঠীতে যোগ দিতে উৎসাহিত করার তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
পাঁচ দিনের বিচার শেষে ২০ বছরের কারাদণ্ড
গত ৫ অক্টোবর প্যারিসে রোহান রানেকে ঘিরে বিচার শুরু হয়। পাঁচ দিন শুনানি চলার পর ৯ অক্টোবর আদালত রায় ঘোষণা করেন। শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য থাকায় বিচারপ্রক্রিয়া মূলত রুদ্ধদ্বার কক্ষে পরিচালিত হয়।
তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর নির্যাতন, যৌন ব্ল্যাকমেইল এবং নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ। আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন। সরকারি কৌঁসুলিরা ৩০ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছিলেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলায় ভুক্তভোগী পাঁচ মার্কিন নাগরিকের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী আদালতের রায়কে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছেন। তাঁর মতে, ভুক্তভোগীদের ওপর নির্যাতনের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী।
আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের অন্য সদস্যরাও তদন্তের আওতায়
তদন্তে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের তরুণদের এই অপরাধচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গোষ্ঠীটির আরও কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, গোষ্ঠীটির সদস্যরা নব্য নাৎসি মতাদর্শ, বর্ণবাদ, ইহুদিবিদ্বেষ এবং নারীবিদ্বেষে বিশ্বাস করতেন। অনলাইনে চরম সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া এবং শিশু-কিশোরদের নির্যাতনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছিল তাদের কর্মকাণ্ডের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ফ্রান্সে কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হলে রোহান রানেকে দেশটি ছাড়তে হবে। যুক্তরাষ্ট্রও তাকে নিজেদের দেশে নিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে চায় বলে ফরাসি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।



