সৈনিকের ঘাটতি মেটাতে মরিয়া ইউক্রেন
- জোরপূর্বক নিয়োগে উত্তাল কিয়েভ

ইউক্রেনের সেনাবাহিনীতে নতুন সদস্য জোগাড়ের চাপ সামলাতে সেনা নিয়োগকর্মীরা রাস্তাঘাট থেকে সাধারণ মানুষকে জোর করে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন, কোথাও কোথাও তা গড়াচ্ছে সংঘর্ষে।
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীতে নতুন সদস্য জোগাড়ের চাপ। আর সেই চাপ সামলাতে গিয়ে এবার দেশের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ। অভিযোগ উঠছে, সেনা নিয়োগকর্মীরা রাস্তাঘাট থেকে সাধারণ মানুষকে জোর করে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন, কোথাও কোথাও তা গড়াচ্ছে সংঘর্ষে। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যের ঘাটতি মেটাতে ইউক্রেনের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ ব্যবস্থা এখন পরিণত হয়েছে এক বড় সামাজিক বিতর্কে।
ইউক্রেনে সামরিক নিয়োগের দায়িত্বে থাকা টেরিটোরিয়াল রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল সাপোর্ট সেন্টার (টিসিসি)-এর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, সেনা কর্মকর্তারা পুরুষদের জোর করে গাড়িতে তুলছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। যদিও সব ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, তবু এসব ঘটনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সেনা নিয়োগ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিয়োগকেন্দ্রের কর্মীদের ওপর ৬০০টির বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই এমন ১১৭টি হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে, যা যুদ্ধের প্রথম বছরে নথিভুক্ত ঘটনার তুলনায় বহু গুণ বেশি।
কিয়েভের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন জনবল। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক সেনা নিহত ও আহত হয়েছেন। ফ্রন্টলাইনে থাকা অনেক সেনা দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাঁদের পরিবর্তে নতুন সদস্য প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতেই সরকার সামরিক নিয়োগ আরও কঠোর করেছে।
ইউক্রেনের আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়সের পুরুষদের সামরিক দায়িত্ব পালনের জন্য ডাকা যেতে পারে। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত কঠোরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে নিয়মিত যাচাই বা প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর ফলে যুদ্ধের প্রতি সমর্থনের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে ইউক্রেন সরকার বলছে, দেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে সেনাবাহিনীর জন্য পর্যাপ্ত সদস্য নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মকর্তাদের দাবি, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা হচ্ছে, কিন্তু রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে জনবল বাড়ানোর বিকল্প নেই।
এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন ইউক্রেন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সরকারকে এক দিকে রাশিয়ার হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্য দিকে সাধারণ মানুষের যুদ্ধক্লান্তি ও ক্ষোভ সামলাতে হচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুতে স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রবণতা ছিল বেশি। কিন্তু বছরের পর বছর সংঘাত চলায় পরিস্থিতি বদলেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, দেশ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সেনা জোগাড় করতে গিয়ে রাষ্ট্র কতটা কঠোর হতে পারে?
রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু অস্ত্র বা অর্থ নয়, মানুষের আস্থা ধরে রাখা। কারণ ফ্রন্টলাইনে যতই সৈন্য প্রয়োজন হোক, ঘরের ভেতরের অসন্তোষ বাড়লে সেই যুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।






