গৃহহীনদের ঘরে তুলতে ৪৪ কোটি পাউন্ডের অভিযানে ব্রিটেন
- করোনাকালের ‘এভরিওয়ান ইন’ মডেলে দেশজুড়ে তৎপরতার ডাক প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের
- ইংল্যান্ডে রাস্তায় রাত কাটানো মানুষের সংখ্যা এখন রেকর্ড ৪,৭৯৩

ব্রিটেনে এই দৃশ্য এতটাই পরিচিত হয়ে গেছে যে একসময় যা মানুষকে নাড়া দিত, এখন তা যেন শহরের ‘স্বাভাবিক দৃশ্যের’ অংশ হয়ে গেছে।
বড়দিনের সকালে ইংল্যান্ডের কোনো ফুটপাত, স্টেশনের বারান্দা কিংবা দোকানের দরজায় যেন কাউকে কম্বল জড়িয়ে রাত কাটাতে না হয় এই লক্ষ্য নিয়েই নতুন অভিযান শুরু করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। বুধবার তিনি স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন, বড়দিনের আগেই রাস্তায় ঘুমানো প্রত্যেক মানুষকে অন্তত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার একটি বাস্তব সুযোগ দিতে হবে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় যেভাবে জরুরি ভিত্তিতে গৃহহীনদের হোটেল, ছাত্রাবাস ও অন্যান্য আবাসনে নেওয়া হয়েছিল, এ বারও তেমনই ‘কোভিড-ধাঁচের’ জাতীয় তৎপরতা চান তিনি। মোট ৪৪ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড এই অভিযানের পেছনে রাখছে তাঁর সরকার।
‘রাফ স্লিপিং’ বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে এমন গৃহহীন মানুষকে, যারা নিয়মিত রাস্তা, পার্ক, স্টেশন, দোকানের দরজা কিংবা খোলা জায়গায় রাত কাটান। বার্নহ্যামের ভাষায়, ব্রিটেনে এই দৃশ্য এতটাই পরিচিত হয়ে গেছে যে একসময় যা মানুষকে নাড়া দিত, এখন তা যেন শহরের ‘স্বাভাবিক দৃশ্যের’ অংশ হয়ে গেছে। সেই স্বাভাবিকীকরণই বদলাতে চান তিনি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গত ২০ জুলাই ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দেওয়া প্রথম ভাষণেই রাস্তায় ঘুমানো বন্ধ করাকে নিজের সরকারের প্রথম দিককার প্রধান অঙ্গীকার করেছিলেন বার্নহ্যাম।
নতুন বরাদ্দ আরও ১০ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড
বার্নহ্যাম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দিনই গৃহহীনতা মোকাবিলায় ৩৪ কোটি পাউন্ড অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন। সেই অর্থে আগামী কয়েক বছরে ১,২০০টি নতুন বাসস্থান তৈরি এবং দীর্ঘদিন ধরে গৃহহীন থাকা অন্তত ৩,০০০ মানুষকে নিবিড় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বুধবার সেই তহবিলের সঙ্গে আরও ১০ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড যোগ করার কথা জানানো হয়েছে। নতুন অর্থ মূলত চিকিৎসাসেবা, মানসিক স্বাস্থ্য, মাদকাসক্তি থেকে পুনর্বাসন এবং মানুষকে আশ্রয় পাওয়ার পর আবার রাস্তায় ফিরে যাওয়া ঠেকানোর মতো সেবায় ব্যবহার হবে।
এই অর্থের মধ্যে ৮৪ লাখ পাউন্ড যাবে দাতব্য, স্বেচ্ছাসেবী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠনগুলোর হাতে। সরকার আগে থেকেই ‘এন্ডিং হোমলেসনেস ইন কমিউনিটিজ ফান্ড’ নামে তিন বছরের একটি বড় কর্মসূচি চালু করেছে, যেখানে স্থানীয় সংগঠনগুলোকে গৃহহীনতা প্রতিরোধ, পুনর্বাসন এবং চাকরি বা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কাজে অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
বার্নহ্যাম অবশ্য অর্থ কীভাবে খরচ করতে হবে, তা হোয়াইটহল থেকে প্রতিটি কাউন্সিলকে লিখে দিতে চান না। তাঁর যুক্তি, নিউক্যাসল, লিভারপুল কিংবা প্লাইমাউথে কী ধরনের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেটি স্থানীয় প্রশাসন, মেয়র, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোই ভালো জানে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যাশা একটাই, যিনি রাস্তা ছাড়তে চান, তাঁর সামনে বড়দিনের আগেই একটি গ্রহণযোগ্য পথ থাকতে হবে।
সবাই কি সত্যিই বড়দিনে ঘর পাবেন?
সরকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে আইন করে সব গৃহহীন মানুষকে আবাসন দিতে বাধ্য করছে না। বর্তমান নিয়মে শিশু থাকা পরিবার বা বিশেষ ঝুঁকিতে থাকা মানুষসহ নির্দিষ্ট ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত’ শ্রেণির ক্ষেত্রেই কাউন্সিলের আবাসনের দায়িত্ব বেশি। তা ছাড়া কাউকে জোর করে আশ্রয়ে নেওয়াও সম্ভব নয়। ফলে বড়দিনে একজনও রাস্তায় থাকবেন না, এমন নিশ্চয়তা সরকার নিজেও দিচ্ছে না। এমনকি ডিসেম্বরের মধ্যে রাস্তায় ঘুমানো মানুষের সংখ্যা কত শতাংশ কমাতে হবে, সে ধরনের নির্দিষ্ট সংখ্যাগত লক্ষ্যমাত্রাও রাখা হয়নি। কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের প্রত্যাশা হলো তত দিনে ‘বাস্তব ও দৃশ্যমান অগ্রগতি’ হওয়া।
আবাসনমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার অবশ্য বুধবার বলেছেন, বড়দিনের মধ্যে মানুষকে রাস্তা থেকে সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় আশ্রয় পাওয়া যাবে বলে তিনি ‘খুবই আত্মবিশ্বাসী’। তবে তার মতে, কাউকে কয়েক রাতের জন্য হোটেলে তুলে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। স্থায়ী আবাসনের পাশাপাশি চাকরি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মাদক বা অ্যালকোহল-নির্ভরতার চিকিৎসাও দিতে হবে, যাতে মানুষ কয়েক মাস পর আবার রাস্তায় ফিরে না আসেন।
কেন এত জরুরি হয়ে উঠল বিষয়টি
ইংল্যান্ডের সরকারি পরিসংখ্যানই বার্নহ্যামের সামনে চ্যালেঞ্জের আকারটি স্পষ্ট করে দেয়। ২০২৫ সালের শরতের এক রাতের সরকারি হিসাবে ৪,৭৯৩ জনকে রাস্তায় ঘুমাতে দেখা গেছে, যা রেকর্ড শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ। এক বছরের ব্যবধানে সংখ্যা ৩ শতাংশ বেড়েছে এবং ২০১০ সালের তুলনায় বৃদ্ধি ১৭১ শতাংশ। মোট রাফ স্লিপারের ৪৩ শতাংশই ছিলেন লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে। শুধু লন্ডনে ওই রাতের হিসাবে সংখ্যা ছিল ১,২৭৭।
আর রাস্তায় ঘুমানো মানুষই ব্রিটেনের পুরো গৃহহীনতার ছবি নন। অনেক পরিবারকে কাউন্সিল হোটেল, বি অ্যান্ড বি কিংবা অস্থায়ী বাসায় রাখছে। আবাসনসংস্থা শেল্টারের প্রধান নির্বাহী সারাহ এলিয়টের হিসাবে, প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার শিশু বর্তমানে এমন অস্থায়ী আবাসনে রয়েছে। তাই তিনি বার্নহ্যামের বড়দিনের পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা বললেও সতর্ক করেছেন, রাস্তায় দৃশ্যমান গৃহহীনতা কমানোই যথেষ্ট নয়; স্থায়ী ও সাশ্রয়ী কাউন্সিল বাসস্থান বাড়ানো না গেলে সংকটের মূল কারণ থাকবে।
করোনাকালের সেই মডেলই ফের সামনে
বার্নহ্যামের আত্মবিশ্বাসের বড় কারণ ২০২০ সালের করোনাকাল। তখন ‘এভরিওয়ান ইন’ কর্মসূচির মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার হোটেল, ছাত্রাবাস ও হলিডে রেন্টাল ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক রাফ স্লিপারকে দ্রুত আশ্রয়ে নিয়েছিল। মহামারির সময় রাস্তায় ঘুমানো মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরে জরুরি অর্থায়ন কমার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যা আবার বাড়তে থাকে এবং টানা চার বছর বৃদ্ধির পর ২০২৫ সালে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়।
‘বিগ ইস্যু’র সহপ্রতিষ্ঠাতা জন বার্ডও সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, করোনা দেখিয়েছিল রাষ্ট্র যখন সিদ্ধান্ত নেয় যে রাস্তায় মানুষ ঘুমাবে না, তখন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তাই বড়দিনকে সামনে রেখে নতুন অঙ্গীকারকে তিনি সেই জরুরি মানসিকতার প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন।
ম্যানচেস্টারের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার গোটা ইংল্যান্ডে পরীক্ষা
গৃহহীনতা বার্নহ্যামের কাছে নতুন রাজনৈতিক বিষয় নয়। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকাকালেও তিনি রাফ স্লিপিং শেষ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। তাঁর আমলে ১০টি কাউন্সিলের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান বাড়ানো হয়েছিল, যাতে একজন গৃহহীন ব্যক্তি এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গেলেও সহায়তার আওতা থেকে হারিয়ে না যান। স্থানীয় সংস্থা ও আবাসনদাতাদের একসঙ্গে কাজ করানোর ফলে প্রথম দিকে সংখ্যা কমেছিল। তবে গত চার বছর ধরে গ্রেটার ম্যানচেস্টারেও রাস্তায় ঘুমানো মানুষের সংখ্যা আবার বাড়ছে।
তাই এবার চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থ ঢালা নয়, ডিসেম্বরের পরেও মানুষকে ঘরে রাখা। বার্নহ্যামের আগে বরিস জনসনও রাফ স্লিপিং শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; কিয়ার স্টারমার তাঁর মেয়াদে দীর্ঘমেয়াদি রাফ স্লিপিং অর্ধেকে নামানোর লক্ষ্য নিয়েছিলেন। নতুন সরকার সেই লক্ষ্য আরও বাড়িয়ে ‘শেষ করার’ ভাষা ব্যবহার করছে।
শীত নামতে এখনও কয়েক মাস বাকি। কিন্তু লন্ডনের স্টেশন, ম্যানচেস্টারের ফুটপাত কিংবা ইংল্যান্ডের কোনো শহরের দোকানের দরজায় যিনি আজ রাতে ব্যাগ মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে থাকবেন, তাঁর কাছে ৪৪ কোটি পাউন্ডের ঘোষণা তখনই অর্থবহ হবে, যখন সত্যিই একটি দরজা তাঁর জন্য খুলবে।
বড়দিনে ব্রিটেনের আলো ঝলমলে শহরগুলোয় ঘর সাজবে, জানালায় জ্বলবে উৎসবের আলো। বার্নহামের প্রতিশ্রুতির আসল পরীক্ষা হবে সেই আলো থেকে কয়েক গজ দূরের ফুটপাতটিতে, সেখানে এ বছরও কি কারও বিছানা হবে কার্ডবোর্ড আর স্লিপিং ব্যাগ, নাকি সত্যিই তাঁর জন্যও একটি ছাদ অপেক্ষা করবে?






