আয়ারল্যান্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ

সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কিছু নাগরিক সংগঠন ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন
একসময় ইউরোপের অন্যতম নিরাপদ সড়কব্যবস্থার দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল আয়ারল্যান্ড। গত দুই দশকে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে দেশটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। কঠোর আইন প্রয়োগ, আধুনিক সড়ক অবকাঠামো, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জনসচেতনতা কর্মসূচি এবং কার্যকর জরুরি সেবা ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ধারাবাহিকভাবে কমেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ইতিবাচক প্রবণতায় ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সাল থেকে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কিলডেয়ারের এম৯ মোটরওয়েতে সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে।
আয়ারল্যান্ডের সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (রোড সেইফটি অথরিটি-আরএসএ) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে ১৬০টি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় ১৭৪ জন নিহত হন। এর আগের বছর ২০২৩ সালে প্রাণহানি ছিল ১৮১ জন। ফলে ২০২৪ সালে মৃত্যুর সংখ্যা সামান্য কমলেও তা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। আর ২০২৫ সালে পরিস্থিতি আবারও অবনতির দিকে যায়। আরএসএ-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে ১৭৪টি প্রাণঘাতী সংঘর্ষে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংখ্যার বিচারে আয়ারল্যান্ড এখনো ইউরোপের তুলনামূলক নিরাপদ দেশগুলোর একটি হলেও সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা। ২০২৪ সালে দেশটির প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে সড়ক মৃত্যুর হার ছিল আনুমানিক ৩২ থেকে ৩৫ জন, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড়ের তুলনায় কম। তবু ভিশন জিরো অর্থাৎ ভবিষ্যতে সড়কে মৃত্যুহার শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য থেকে দেশটি এখনো অনেক দূরে।
২০২৫ সালের মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ছিলেন গাড়িচালক। মোট ১৮৫ জন নিহতের মধ্যে ৭৬ জন চালক, ৪১ জন পথচারী, ৩০ জন মোটরসাইকেল আরোহী, ২১ জন যাত্রী, ১৪ জন সাইকেল আরোহী এবং ৩ জন ই-স্কুটার ব্যবহারকারী ছিলেন। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, মোটরসাইকেল আরোহী ও সাইকেল চালকদের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আরএসএ জানিয়েছে, মোটরসাইকেল আরোহীদের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ এবং সাইকেল আরোহীদের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ।
প্রাণহানির পাশাপাশি আহতের সংখ্যাও কম নয়। আয়ারল্যান্ডের সেন্ট্রাল স্ট্যাটিস্টিকস অফিস-সিএসও এবং আরএসএ-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ বিভিন্ন মাত্রার আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। গুরুতর আহতদের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় ভোগেন। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পরিবার এবং অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়ারল্যান্ডে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত গতি, মাদক বা অ্যালকোহলের প্রভাবে গাড়ি চালানো, মোবাইল ফোন ব্যবহারজনিত মনোযোগ বিচ্যুতি, ক্লান্ত অবস্থায় ড্রাইভিং এবং বেপরোয়া আচরণ। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, কিছু চালক এখনো গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। স্থানীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনাগুলোতেও মোবাইল ফোন ব্যবহারকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যেও আয়ারল্যান্ডের সড়ক নিরাপত্তা অবকাঠামোকে ইউরোপের উন্নত ব্যবস্থাগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটির জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কে আধুনিক মোটরওয়ে, উন্নত সাইনেজ, কেন্দ্রীয় ব্যারিয়ার, রাউন্ডঅ্যাবাউট, স্পিড-ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা এবং উচ্চমানের সড়ক প্রকৌশল ব্যবহৃত হয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণ ও পুরনো সড়কের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণ করা হয়, যার লক্ষ্য হলো দুর্ঘটনা ঘটলেও যাতে প্রাণহানি বা গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কমানো যায়।
আয়ারল্যান্ডের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হলো রোড সেইফটি অথরিটি-আরএসএ। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা চালক প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং টেস্ট, জনসচেতনতা কার্যক্রম, গবেষণা, দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ এবং নিরাপত্তা নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে। টেলিভিশন, রেডিও এবং ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের পরিচালিত প্রচারণাগুলো আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত। বিশেষ করে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, সিটবেল্ট ব্যবহার এবং অতিরিক্ত গতির বিরুদ্ধে তাদের প্রচারণা জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
তবে আরএসএ সমালোচনারও মুখোমুখি হয়েছে। সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কিছু নাগরিক সংগঠন ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
আইন প্রয়োগ ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে গার্ডা (স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে গার্ডা বলা হয়)-এর রোডস পুলিসিং ইউনিট। এই ইউনিট সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ, মাতাল চালক শনাক্তকরণ, মোবাইল ফোন ব্যবহার রোধ, সিটবেল্ট আইন বাস্তবায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। গার্ডা জানিয়েছে, তারা সরকারের ২০২১-২০৩০ সড়ক নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়নে কাজ করছে, যার লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করা হয়েছে। ব্যাংক হলিডে ও উৎসবের সময় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। একাধিক অভিযানে কয়েক হাজার চালককে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর দায়ে জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে শতাধিক চালককে অ্যালকোহল বা মাদকের প্রভাবে গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং সিটবেল্ট না পরার বিরুদ্ধেও ব্যাপক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে তদারকি ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্য ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে আয়ারল্যান্ডে সড়ক পুলিশ সদস্যের সংখ্যা অতীতের তুলনায় কমেছে। ২০০৯ সালে যেখানে প্রায় ১ হাজার ৪৬ জন সদস্য সড়ক পুলিশিংয়ে নিয়োজিত ছিলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সেই সংখ্যা প্রায় ৬৫০-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দেশের বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্কে কার্যকর নজরদারি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় স্পিড ক্যামেরা, নাম্বারপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, ডিজিটাল জরিমানা ব্যবস্থা এবং তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ এখন সড়ক তদারকির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গার্ডা তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও পরীক্ষামূলকভাবে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ভিশন জিরো অর্থাৎ এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে কোনো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাবে না। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ ব্যবহারকারী এবং দ্রুত জরুরি সেবা, এই পাঁচটি স্তম্ভকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে স্কুলশিক্ষা থেকে শুরু করে অবকাঠামো উন্নয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
তবু বাস্তবতা হলো, কিলডেয়ারের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার মতো ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে যে উন্নত অবকাঠামো ও কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও মানবিক ভুল এখনও সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। ভুলপথে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত গতি, অসতর্কতা কিংবা মাদকাসক্ত অবস্থায় ড্রাইভিং এসব আচরণ মুহূর্তের মধ্যে বহু প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়ারল্যান্ডের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার শক্তি হলো এর সুসংগঠিত কাঠামো, আধুনিক অবকাঠামো এবং তথ্যভিত্তিক নীতি। কিন্তু দুর্বলতা হলো মানবিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত তদারকির ঘাটতি। তাই শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সংস্কৃতি ও চালকদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, আয়ারল্যান্ড সড়ক নিরাপত্তায় এখনো ইউরোপের অগ্রগামী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করায় নীতিনির্ধারক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিক সবাইকে নতুন করে সতর্ক হতে হচ্ছে। কারণ প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি হারিয়ে যাওয়া জীবন এবং একটি অপূরণীয় শূন্যতা।






