রোদে পুড়ছে ইউরোপের জলপাই, ফের আগুন ধরতে পারে অলিভ অয়েলের দামে
- স্পেনে খরা, গ্রিস-ইতালি-পর্তুগালে দাবানল; সবজি, শস্য ও আঙুরের ফলনেও বড় ধাক্কার আশঙ্কা

ছবি: রয়টার্স
গত দু’বছরের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলে অলিভ অয়েলের বাজার যখন কিছুটা স্থিতিশীল হচ্ছিল, তখনই ফের অশনি-সংকেত। ইউরোপজুড়ে তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলপাইবাগান। ফল ছোট হয়ে যাওয়া, আগাম ঝরে পড়া এবং বাগান পুড়ে যাওয়ায় চলতি শরৎ থেকেই আবার অলিভ অয়েলের দাম বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা।
অলিভ অয়েল উৎপাদক সংগঠন সিটিজেনস অব সয়েল-এর প্রতিষ্ঠাতা সারাহ ভ্যাশন ৪ আগস্ট প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলেছেন, দ্রুত আবহাওয়ার উন্নতি না হলে “শরতে দাম বাড়তে পারে”। তাঁর মতে, তেল তৈরির উপযোগী জলপাইয়ের পরিমাণ কমে যাওয়াই বাজারে নতুন চাপ তৈরি করবে।
বিশ্ববাজারে দাম আগের রেকর্ড উচ্চতা থেকে কিছুটা কমলেও ব্রিটেনে এক লিটার এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের গড় দাম এখনও সাত পাউন্ডের বেশি। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের আবহাওয়াই শেষ পর্যন্ত নতুন ফসল ও বাজারদরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
স্পেন ঘিরেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
বিশ্বের বৃহত্তম অলিভ অয়েল উৎপাদক স্পেন। গত ৭ জুলাই মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত খাতভিত্তিক বৈঠকে দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রায় ১২ লাখ ৯৮ হাজার টন অলিভ অয়েল উৎপাদিত হয়েছে। পরিমাণটি আগের মৌসুমের তুলনায় ৯ শতাংশ কম হলেও গত চার বছরের গড়ের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি।
তখন নতুন মৌসুম নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করা হলেও গ্রীষ্মের খরা ও তাপপ্রবাহ সেই পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একই সরকারি হিসাবে বিভিন্ন শ্রেণির অলিভ অয়েলের দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ইতিমধ্যেই ৫ দশমিক ১ থেকে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি ছিল।
অলিভ অয়েল ব্র্যান্ড ফিলিপ্পো বেরিয়োর যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান ওয়াল্টার জানরে বলেছেন, দীর্ঘ খরায় জলপাইগাছ নিজের সুরক্ষায় ফল ঝরিয়ে দিতে পারে। এতে আগাম ফসল সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে এবং আগামী বছরের উৎপাদন ও দাম–দুই ক্ষেত্রেই বড় প্রভাব পড়তে পারে।
দাবানলের আগুন, ছাইয়েরও ক্ষতি
গ্রিস, ইতালি ও পর্তুগালের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলে জলপাইবাগান পুড়েছে। তবে সরাসরি আগুন না লাগলেও ধোঁয়া, ছাই ও দূষিত বাতাস কাছাকাছি বাগানের ফলের বৃদ্ধি এবং গুণমান নষ্ট করছে। অতিরিক্ত গরমে কীটপতঙ্গ ও রোগের প্রকোপও বাড়ছে।
স্পেনের কৃষক সংগঠন আসাহা জানিয়েছে, জলপাইয়ের পাশাপাশি ফলের বাগান, আঙুরখেত, গ্রিনহাউস, টমেটো ও ভুট্টার জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন কমার সঙ্গে সেচ, শ্রম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াও বাজারের জন্য বড় উদ্বেগ।
ফ্রান্সে সবজি উৎপাদনে ‘ধস’
ফ্রান্সের সবজি উৎপাদকদের সংগঠন লেগুম দ্য ফ্রান্স জানিয়েছে, খরা ও তাপপ্রবাহে কয়েক হাজার টন কৃষিপণ্য নষ্ট হয়েছে। সালাদপাতা, গাজর, লিক, রসুন ও পেঁয়াজের মতো ফসলের উৎপাদন কোথাও কোথাও অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।
ফ্রান্সের কৃষিমন্ত্রী অ্যানি জেনেভার্ড ২ আগস্ট প্রকাশিত ল্য মঁদ-এর প্রতিবেদনে পরিস্থিতিকে সবজি উৎপাদনের “ধস” বলে বর্ণনা করেছেন। ব্রিটানি ও সঁত্র-ভাল দ্য লোয়ারসহ কয়েকটি অঞ্চলে ফুলকপি, ব্রোকলি, লেটুস ও শিমের সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
আগেই পাকছে আঙুর
ফ্রান্সের শ্যাম্পেন, বোর্দো ও বার্গান্ডি অঞ্চলেও তাপ ও পানির অভাবে আঙুরের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শ্যাম্পেনে ১৫ আগস্টের কাছাকাছি ফল সংগ্রহ শুরু হতে পারে–যা কয়েক দশক আগের স্বাভাবিক সময়ের প্রায় এক মাস আগে। উৎপাদকেরা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম ফলনের আশঙ্কা করছেন।
আগাম ফল পাকলে আঙুরে চিনির মাত্রা বেড়ে যায়। এতে মদের স্বাদ ও অ্যালকোহলের মাত্রাও বদলে যেতে পারে।
শস্য উৎপাদনেও বড় পতন
স্পেনের কৃষি মন্ত্রণালয় গত মাসের শস্যবিষয়ক বৈঠকের পর জানিয়েছিল, ২০২৬-২৭ মৌসুমে চাল বাদে দেশটির শস্য উৎপাদন ১৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনের সামান্য বেশি হতে পারে। আগের মৌসুমে তা ছিল ২৪ মিলিয়ন টনের বেশি।
ইউরোপীয় কমিশনের যৌথ গবেষণা কেন্দ্র বা জেআরসি ২৭ জুলাইয়ের মূল্যায়নে সূর্যমুখীর ফলন-পূর্বাভাস ৭ শতাংশ এবং দানাশস্য ভুট্টার পূর্বাভাস ৬ শতাংশ কমিয়েছে। আলু ও সয়াবিনের পূর্বাভাসও প্রায় ৩ শতাংশ করে নামানো হয়েছে।
খাদ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইউরোস্টার কমোডিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জেসন বুল বলেছেন, ইউরোপের শীতকালীন ফসলের অবস্থা অনেক দেশে এখনও গ্রহণযোগ্য হলেও গ্রীষ্মকালীন ফসল “অনেক বড় ঝুঁকিতে” রয়েছে। সেচনির্ভর জমি কিছুটা ভালো থাকলেও পানির ঘাটতি ও সম্ভাব্য সেচ-নিষেধাজ্ঞা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
তবে ইউরোপের সব দেশে পরিস্থিতি সমান নয়। বৃষ্টির কারণে রোমানিয়ার অবস্থা তুলনামূলক ভালো। ইতালিতে নরম গমের উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। শীতল ও আর্দ্র বসন্তের কারণে তুরস্কেও শস্যের ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোক্তার বোতলে ধাক্কা কবে
স্পেনের বর্তমান মজুত তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানোর মতো হওয়ায় এখনই বড় ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে না। কিন্তু নতুন ফসল কমে গেলে এবং সেচ, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে শরৎ থেকে পাইকারি বাজারে চাপ বাড়বে। পরে সেই ব্যয় গিয়ে পড়বে বোতলজাত অলিভ অয়েলের দামে।
ইউরোপের এই কৃষিসংকট তাই শুধু জলপাইয়ের নয়। একই তাপপ্রবাহ যখন রান্নার তেল, শস্য, সবজি, আলু ও আঙুরের উৎপাদনে আঘাত করছে, তখন প্রশ্ন উঠছে–ইউরোপের মাঠে বাড়তে থাকা তাপের মূল্য শেষ পর্যন্ত বিশ্বের ভোক্তাদের কতটা দিতে হবে?






