বিক্ষোভ দমনে কারফিউ, ফ্রান্স যাচ্ছে কোন পথে

বিক্ষোভকারীদের আগুনে পুড়ে যাওয়া জিনিস সরাচ্ছেন ফ্রান্সের এক জরুরি সেবার কর্মী। ছবি : রয়টার্স
ফ্রান্সে ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর হচ্ছে ফ্রান্স সরকার। শনিবার সহিংসতায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একইসঙ্গে রাজধানী প্যারিসসহ কয়েকটি এলাকায় আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার দুরবস্থা নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে ক্ষুব্ধ জনতা রাজপথে নেমে আসলে আন্দোলন ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এ অস্থিরতার পর আপাতত ফ্রান্সের রাস্তায় শান্তি ফিরেছে। তবে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক আসায় উদ্বেগ কাটেনি। আগামী শনিবার (২৪ অক্টোবর) আবার বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ। শ্রমিক সংগঠনগুলো ৫ নভেম্বর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
সহিংসতায় বড় ক্ষতি
শনিবার দেশজুড়ে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। বেশির ভাগ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও বিভিন্ন শহরে একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু হয়।
মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক নগর ভবনে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে ভবনটির ছাদ ও ঘড়ির টাওয়ার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকারের হিসাবে, দেশজুড়ে ৩ হাজারের বেশি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুট অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সহিংসতায় প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। একজন বিক্ষোভকারীও মারা গেছেন।
সহিংসতার ভিডিও ও ছবি পরীক্ষা করছে পুলিশ। এসবের মাধ্যমে লুটপাট ও হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
কারফিউ, বাড়ছে নিরাপত্তা
নতুন করে সহিংসতা ঠেকাতে কিছু এলাকায় স্থানীয়ভাবে কারফিউ দেওয়া হচ্ছে। প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আল এলাকায় সোমবার রাত ১১টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাত ৮টার পর সেখানে বিক্ষোভও নিষিদ্ধ করা হয়।
লিল ও নিসসহ আরও কয়েকটি শহরেও স্থানীয়ভাবে কারফিউ দেওয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, আবার বড় বিক্ষোভ হলে আগামী সপ্তাহান্তে রাস্তায় পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হবে। তবে কত অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে, তা জানানো হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ তা গ্রহণ করেননি। বরং সহিংসতার আগে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও পুলিশের প্রস্তুতিতে কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের হাত ধরে
বর্তমান আন্দোলনের শুরু গত মাসে প্যারিসের শ্রমজীবী মানুষের বসবাস বেশি এমন উত্তরাঞ্চলীয় শহরতলির উচ্চবিদ্যালয়গুলোতে। শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রথমে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন।
পরে জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি সেবার দুরবস্থা ও মজুরিসহ বিভিন্ন ইস্যু এতে যুক্ত হয়। শ্রমিক সংগঠন এবং ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কিছু সদস্যও বিক্ষোভে যোগ দেন।
শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় পুরোপুরি যোগ্যতা অর্জন করেও এখনো কাজে যোগ না দেওয়া প্রায় ৩ হাজার শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। তবে শিক্ষা খাতে বড় ধরনের অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর ঘোষণা এখনো আসেনি।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তা
সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করছে সরকার। কর্মী ছাঁটাই এড়াতে রাষ্ট্রের অর্থায়নে সাময়িক কর্মবিরতি সহায়তা দেওয়া হবে।
তাৎক্ষণিক অর্থসংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও তহবিল রাখা হচ্ছে। তবে কত অর্থ দেওয়া হবে এবং কীভাবে তা বিতরণ করা হবে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ক্ষতির একটি অংশ বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোও বহন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিতে নতুন চাপ
এ অস্থিরতা এমন সময়ে শুরু হয়েছে, যখন ফ্রান্সের সরকারি অর্থব্যবস্থা আগে থেকেই চাপে রয়েছে। বড় সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বড় অঙ্কের নতুন সহায়তা দেওয়ার সুযোগ সরকারের হাতে সীমিত।
ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদ প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে। ফরাসি ও জার্মান ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের ব্যবধান ১৪৬ বেসিস পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ।
রাজনৈতিকভাবে চাপে ম্যাখোঁ
আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এক দশক ক্ষমতায় থাকার পর সরে দাঁড়াবেন ম্যাখোঁ। তার মেয়াদের শেষ সময়ে এ অস্থিরতা সরকারকে আরও চাপে ফেলেছে।
কট্টর ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেন ইতোমধ্যে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন। বর্তমান সহিংসতা তার আইনশৃঙ্খলাকেন্দ্রিক প্রচারকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষক, জেলে ও পরিবহন খাতকে সহায়তা দিতে সরকারকে এ বছর আগেই জরুরি ব্যয় বাড়াতে হয়েছে।
অস্থিরতার প্রভাব আর্থিক বাজারেও পড়েছে। সোমবার ফরাসি শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে এবং ইউরো দুর্বল হয়েছে।
অন্যদিকে কট্টর বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন এবং সরকারের সমালোচনা করলেও সহিংসতার স্পষ্ট নিন্দা না করায় চাপের মুখে পড়েছেন।
ফ্রান্স ভ্রমণে সতর্কতা
অস্থিরতার মধ্যে বিদেশি পর্যটক আহত হওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং চীন ও মালয়েশিয়া তাদের নাগরিকদের সতর্ক করেছে। বড় জমায়েত ও বিক্ষোভ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় ফ্রান্স ভ্রমণ পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
ফ্রান্সের বাইরেও একই ধরনের অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবা নিয়ে বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। আলবেনিয়ায় দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব ও শিক্ষার মান নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন। স্পেন ও পর্তুগালেও আবাসন সংকট নিয়ে আন্দোলন চলছে।
ফ্রান্সে আপাতত বড় ধরনের সংঘর্ষ থামলেও সংকট শেষ হয়নি। নতুন বিক্ষোভের ডাক, দুর্বল অর্থনীতি এবং আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন—সব মিলিয়ে সরকারের সামনে এখন একসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আন্দোলনের মূল দাবিগুলো সামাল দেওয়ার চাপ।
সূত্র : রয়টার্স









