থমকে গেছে বিক্ষোভ, থমথমে ফ্রান্স

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্যারিসের ল্যুভরে আজও পতাকা উঁচিয়ে ব্যারিকেড পেরিয়ে এগিয়ে চলেছেন এক নারী। পায়ের নিচে মৃতদেহ। চারপাশে ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপ। ফরাসি চিত্রশিল্পী ইউজিন দ্যলাক্রোয়ার বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘জনগণকে পথ দেখাচ্ছে স্বাধীনতা’। প্রায় দুই শতাব্দী আগের সেই ছবির সঙ্গে আজকের ফ্রান্সের অস্বস্তিকর মিল। তবে এবার ক্যানভাসে নয়, বাস্তবের রাজপথে। প্যারিসের পথে পথে পোড়া গাড়ির কঙ্কাল। ঝলসানো মোটরসাইকেল, টায়ারের ছাই আর ভাঙা দোকানের কাচ। দেয়ালে দেয়ালে ক্ষোভের চিহ্ন। সেই ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। পাহারা দিচ্ছে পুলিশ। আগুন আপাতত স্তিমিত। ক্ষোভ নয়। সেই ক্ষোভ সামলাতেই এবার ‘কারফিউ’ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে ইমানুয়েল মাখোঁর সরকার।
শনিবারের ভয়াবহ সহিংসতার পর বড় বিক্ষোভ আপাতত স্তিমিত। তবে ফ্রান্সের একাধিক শহর থমথমে। গতকাল সোমবারও প্যারিসের কয়েকটি স্থানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও অবরোধ চলেছে। বাদ যায়নি খোদ ল্যুভর এলাকাও। এরই মধ্যে ২৪ অক্টোবর ফের বিক্ষোভের ডাক এসেছে। নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় সতর্ক নিরাপত্তা বাহিনী।
তবে এই অস্থিরতার মধ্যেই ধীরে ধীরে ফিরছে চেনা জীবনের ছন্দ। গত রবিবার সকাল থেকে প্যারিসের রাস্তায় সাধারণ মানুষের চলাচল বাড়তে দেখা যায়। সেন নদীর তীরে হাঁটাহাঁটি ও শরীরচর্চায় বের হন অনেকে। আইফেল টাওয়ার ও ল্যুভর জাদুঘরের সামনে আবার সারি দেন পর্যটকরা। ক্যাফের খোলা চত্বরে ফিরে আসে আড্ডা। রাতেও কোথাও কোথাও পানশালা ও খাবারের দোকানে মানুষের আনাগোনা ছিল। অথচ কয়েক কদম দূরেই তখনো চলছিল ভাঙচুর আর লুটপাট। একদিকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা, অন্যদিকে সহিংসতার রেশ আর নতুন করে অশান্তির আশঙ্কা। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মোঁদের গতকালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্যারিসের এই বিপরীত চিত্র।
গতকাল রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরুরি বৈঠকের পর নির্দিষ্ট এলাকায় আংশিক কারফিউ কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। তবে পুরো প্যারিসে কারফিউ জারি করা হচ্ছে না। প্রয়োজন হলে জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। লেকর্নু বলেছেন, ‘শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমার সংকল্প অটল।’ সহিংসতার জন্য কট্টর বামপন্থী গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেছেন তিনি। লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন।
এরই মধ্যে উত্তর ফ্রান্সের দেনাঁ শহরে রাতের কারফিউ কার্যকর হয়েছে। গতকাল তা সংশোধন করে নির্দিষ্ট এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সীমিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, মার্সেইতে গতকাল দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
সহিংসতার সবচেয়ে স্পষ্ট ক্ষত প্যারিসের রাজপথে। গত রবিবার বিবিসি ও ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পোড়া গাড়ি, দগ্ধ সাইকেল আর ভাঙা দোকানের সারি। বিক্ষোভের সময় রাস্তায় গাড়ি, সাইকেল ও আবর্জনার স্তূপে আগুন দেওয়া হয়। কোথাও ছড়িয়ে ছিল পোড়া টায়ার। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় সড়ক। রিপাবলিক চত্বরের আশপাশে ভাঙচুর হয় দোকানপাট। লুট হয় মূল্যবান পণ্য। রেহাই পায়নি বিলাসবহুল বিপণিবিতানও।
শুধু প্যারিস নয়, মার্সেই ও লিয়ঁতেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে আগুনে পুড়ে প্রায় ধ্বংস হয়েছে উনিশ শতকের ঐতিহাসিক নগর ভবন। ধসে পড়েছে ছাদ। লিয়ঁতে পুড়েছে পর্যটন দপ্তর। ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবে, দেশ জুড়ে প্রায় তিন হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্যারিসেই ভাঙচুর হয়েছে অন্তত তিনশ থেকে চারশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। প্যারিস, মার্সেই ও লিয়ঁর মেয়ররা অভিযোগ করেছেন, শনিবার তাদের শহরের বিস্তীর্ণ অংশ কার্যত নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছিল।
অথচ এই আন্দোলনের শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের দাবি থেকে। শিক্ষক সংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও অপর্যাপ্ত বরাদ্দের প্রতিবাদে পথে নামেন তারা। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির চড়া দাম ও সরকারি সেবার অবনতি নিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন। শনিবার সরকারি হিসাবে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি, সংখ্যাটি আট লাখের কাছাকাছি।
অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও একপর্যায়ে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের দিকে ছোড়া হয় নানা বস্তু। পাল্টা কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনী। রয়টার্স জানিয়েছে, প্রায় ২ হাজার ৪০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
সহিংসতা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগের প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রেসিডেন্ট মাখোঁ। নিরাপত্তা বাহিনীর নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। নুনিয়েজ নিজেই স্বীকার করেছেন, কয়েকটি শহরে পুলিশ ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল’। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও আগাম প্রস্তুতির ব্যর্থতা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন মাখোঁ।
এর মধ্যেই নতুন বিক্ষোভের ডাক এসেছে। গতকাল স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪৩ মিনিটে প্রকাশিত ফরাসি সংবাদমাধ্যম টিএফ ওয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলনের সমন্বয়করা আগামী শনিবার আবার দেশ জুড়ে বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছেন। ৩১ অক্টোবরও কর্মসূচি রয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো ৫ নভেম্বর ধর্মঘট ও সমাবেশের ডাক দিয়েছে।
রাজপথের এই অস্থিরতার মধ্যেই গভীর হচ্ছে রাজনৈতিক সংকট। প্রায় ছয় মাস পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ প্রান্তে মাখোঁ। বিবিসির বিশ্লেষণে তাকে কার্যত ‘ক্ষমতাহীন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত পার্লামেন্টও অচলাবস্থায়। কট্টর ডানপন্থী মারিন ল্য পেন এবং বামপন্থী জঁ-লুক মেলঁশোঁ রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে মরিয়া।
অর্থনীতিতেও পড়েছে অস্থিরতার প্রভাব। গতকাল ফরাসি শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে। বেড়েছে সরকারি ঋণের সুদ। এর মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে উপসাগরীয় দেশ সফরে গেছেন মাখোঁ। প্যারিসের রাস্তায় এখন পোড়া গাড়ি সরানো হচ্ছে। ভাঙা কাচও পরিষ্কার হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের ক্ষোভ কে সরাবে? ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভের ডাক সেই প্রশ্নই আরও প্রকট করেছে। আগুন আপাতত নিভেছে। কিন্তু যে ক্ষোভ থেকে তার জন্ম, তা এখনো জ্বলছে ফ্রান্সের ভেতরে।



