কাঁটাতার পেরিয়ে এবার নতুন ঠিকানা
সেউতার ৫০০ শিশুকে মূল ভূখণ্ডে আশ্রয় দেবে স্পেন
- সিউতায় আটকে থাকা প্রায় ৫০০ সঙ্গীহীন শিশুকে সরানোর জরুরি পরিকল্পনা
- ৩০ জুলাইয়ের নজিরবিহীন ঢলের পর এখনও হাজারো মানুষ শহরে
- বিরোধীদের দাবি: ফিরিয়ে দেওয়া হোক মরক্কোতেই

সাম্প্রতিক অভিবাসী ঢলের পর সিউতার অস্থায়ী শিবির ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারী ও মেয়েদের যৌন হয়রানি ও হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে।
সামনে ভূমধ্যসাগর, পেছনে মরক্কোর সীমান্ত, মাঝখানে স্পেনের ছোট্ট ভূখণ্ড সেউতা। গত ৩০ জুলাই সেই সীমান্ত পেরিয়ে হঠাৎ ঢুকে পড়েছিলেন প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। অধিকাংশ পরে মরক্কোয় ফিরে গেলেও থেকে গেছে বহু সঙ্গীহীন শিশু। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে, কেউ অস্থায়ী ব্যবস্থায়, কারও দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়। এবার তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনকে সেউতা থেকে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাদ্রিদ। অথচ কিছুদিন আগেও সরকারের অবস্থান ছিল, অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের মরক্কোয় ফেরত পাঠানোই অগ্রাধিকার। সেই জায়গা থেকেই বুধবারের এই সিদ্ধান্তকে স্পেনের অভিবাসন নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইউ-টার্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উত্তর আফ্রিকার মরক্কো লাগোয়া সেউতা স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। ভৌগোলিকভাবে আফ্রিকায় হলেও রাজনৈতিকভাবে এটি স্পেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ। গত ৩০ ও ৩১ জুলাই মরক্কো থেকে প্রায় ৭০ হাজারের বেশি মানুষ স্থল ও সমুদ্রপথে সেখানে ঢুকে পড়েন। স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের পরবর্তী হিসাবে সংখ্যাটি প্রায় ৭২ হাজার। বেশির ভাগই পরে মরক্কোয় ফিরে যান, কিন্তু হাজারো মানুষ থেকে যান সেউতায়। ১৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার অভিবাসী শহরটিতে ছিলেন এবং ১ হাজার ৮৯৮ অপ্রাপ্তবয়স্ককে শনাক্ত করা হয়েছিল।
সবচেয়ে আগে নজর ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের দিকে
স্পেনের যুব ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এখন একটি জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এর আওতায় প্রায় ৫০০ সঙ্গীহীন অপ্রাপ্তবয়স্ককে মূল ভূখণ্ডের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হতে পারে। বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে মেয়েশিশু ও অন্য ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে প্রায় ৫০০ মেয়েশিশুকে দ্রুত সরানোর পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চূড়ান্ত সংখ্যা যাচাই ও স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে বদলাতে পারে।
পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিশুদের মূল ভূখণ্ডে নেওয়া হলেও তাদের আইনি অভিভাবকত্ব অবিলম্বে অন্য আঞ্চলিক সরকারের হাতে তুলে দিতে হবে, এমন নয়। শিশু সুরক্ষা সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে দিয়ে বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনার ব্যবস্থা করা হতে পারে। পরিবারে রাখার সুযোগ থাকলে ‘ফস্টার কেয়ার’-ও বিবেচনায় রয়েছে।
যুব ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী সিরা রেগো এর আগে জানিয়েছিলেন, প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে তার ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ বিবেচনা করে আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিবার কোথায় আছে, তা জানা গেলে প্রথম অগ্রাধিকার হবে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন৷ সেটি মরক্কোয়, স্পেনের অন্য অঞ্চলে কিংবা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে হতে পারে। কিন্তু পরিবার না থাকলে বা ফেরত পাঠানো শিশুর জন্য নিরাপদ না হলে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষকেই তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
তাহলে ইউ-টার্ন কেন?
এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ সেউতায় অভিবাসীদের ঢল নামার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা প্রকাশ্যে মরক্কোর সঙ্গে সমন্বয় করে অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর ওপর জোর দিয়েছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশও স্পেনের ওপর সীমান্ত কঠোর রাখা এবং ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করার চাপ সৃষ্টি করে।
কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি অন্য। স্পেনের বিদ্যমান শিশু সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, সঙ্গীহীন কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ককে শুধু ‘অনিয়মিত অভিবাসী’ হিসেবে বিবেচনা করে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ফেরত পাঠানো যায় না। তার বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা এবং কোথায় গেলে শিশুটির স্বার্থ সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত হবে, এসব যাচাই করতে হয়। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সঙ্গীহীন শিশুদের সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এই আইনি বাস্তবতাই সরকারের আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার অন্যতম কারণ।
স্পেনে বর্তমানে ২১ হাজারের বেশি শিশু ও কিশোর রাষ্ট্রীয় অভিভাবকত্বে রয়েছে; তাদের প্রায় অর্ধেকই মরক্কোর নাগরিক বলে জানিয়েছে স্পেন সরকার। ফলে সিউতার নতুন ৫০০ শিশুকে কোথায় রাখা হবে, কে দেখভাল করবে এবং ব্যয় কে বহন করবে, সেটিও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল প্রশ্ন।
সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় ডানপন্থীরা
সরকারের নতুন পরিকল্পনায় সবচেয়ে জোরালো আপত্তি এসেছে রক্ষণশীল পিপলস পার্টি বা পিপি এবং অভিবাসনবিরোধী কট্টর ডানপন্থী শিবির থেকে।
পিপি নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইহো বুধবার সেউতা সফরে গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। তার যুক্তি, শিশুদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই সমাধান হওয়া উচিত। সেউতার স্থানীয় সরকারও কেন্দ্রীয় সরকারের ৫০০ শিশুকে মূল ভূখণ্ডে পাঠানোর পরিকল্পনায় আপত্তি জানিয়েছে এবং মরক্কোর সঙ্গে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা কার্যকর করার দাবি তুলেছে।
সমস্যা হলো, শিশুদের মূল ভূখণ্ডে নিলে তাদের জায়গা দিতে হবে স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে। অথচ রক্ষণশীল ও কট্টর ডানপন্থী দল পরিচালিত কয়েকটি আঞ্চলিক সরকার আগেই অতিরিক্ত অভিবাসী শিশু নেওয়ার বিরোধিতা করেছে। এই বাধা এড়াতেই মাদ্রিদ এমন ব্যবস্থা খুঁজছে, যাতে শিশু সুরক্ষা সংস্থার মাধ্যমে তাদের মূল ভূখণ্ডে রাখা যায়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ওপর পূর্ণ অভিভাবকত্ব চাপিয়ে দিতে না হয়।
সেউতায় মেয়েশিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
সরকারের তাড়াহুড়োর আরেকটি কারণ নিরাপত্তা। সাম্প্রতিক অভিবাসী ঢলের পর সিউতার অস্থায়ী শিবির ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারী ও মেয়েদের যৌন হয়রানি ও হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। ১৮ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ১৫টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে, যার বেশ কয়েকটিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগী রয়েছে। কয়েকজন নারী চিকিৎসাও নিয়েছেন। জনাকীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্র, সৈকত ও খোলা জায়গায় রাত কাটানোর কারণে নারী ও শিশুরা বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
ইউনিসেফও বলেছে, বহু শিশুর পরিচয় যাচাই, খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ আশ্রয়ের জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। ফলে তাদের সেউতায় দীর্ঘদিন আটকে রাখার বদলে দ্রুত শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আনার চাপ বাড়ছে।
একটি সীমান্ত-সংকট, ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক ঢেউ
সেউতার ঘটনাটি এখন আর শুধু স্পেন-মরক্কো সীমান্তের সমস্যা নয়। জুলাইয়ের নজিরবিহীন প্রবেশের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহির্সীমা কতটা সুরক্ষিত, অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব কার এবং শিশুদের ক্ষেত্রে মানবিক আইন কোথায় প্রাধান্য পাবে, এসব প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি বড় অংশ সীমান্ত কঠোর করার পক্ষে; আবার স্প্যানিশ শিশু সুরক্ষা আইন সরকারকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে আলাদা পথে হাঁটতে বাধ্য করছে।
এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই সিউতার শিশুদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে। গত ৩০ জুলাই তারা সীমান্ত পেরিয়েছিল ইউরোপে নতুন জীবনের আশায়। কয়েক সপ্তাহ পরও অনেকের জানা নেই, পরের রাতটি কোথায় কাটবে। মাদ্রিদের নতুন সিদ্ধান্ত অন্তত ৫০০ শিশুর সামনে সেউতার গাদাগাদি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ খুলতে পারে।
অভিবাসনের রাজনীতিতে তাদের পরিচয় হল ‘সংখ্যা’; ৭০ হাজার, ৫ হাজার, ৫০০। কিন্তু সীমান্তের কাঁটাতারের এ পাশে এসে দাঁড়ানো প্রতিটি অপ্রাপ্তবয়স্কের গল্প আলাদা। স্পেনের সামনে এখন পরীক্ষাটা তাই শুধু সীমান্ত রক্ষার নয়; একজন শিশু সীমান্ত পেরোলেই কি তার অধিকারও সীমান্তে থেমে যাবে, সেই প্রশ্নেরও।






