হিটলারের জন্মস্থান এখন পুলিশ স্টেশন

হিটলারের জন্ম হয় এই বাড়িতে। ছবি: রয়টার্স
যে বাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন ইতিহাসের কুখ্যাত স্বৈরশাসক অ্যাডলফ হিটলার, সেই বাড়িতেই এখন বসেছে পুলিশ স্টেশন। নব্য-নাৎসিদের সমাগম ঠেকাতে এই ভবনটিকেই এবার পুলিশ স্টেশনে রূপান্তর করেছে অস্ট্রিয়া। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে ইতিহাস, স্মৃতি ও রাজনীতির বিতর্ক। বিবিসি ,রয়টার্স।
বুধবার অস্ট্রিয়ার ছোট শহর ব্রাউনাউ আম ইন-এ অবস্থিত হিটলারের জন্মভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় পুলিশ স্টেশন হিসেবে। জার্মান সীমান্তবর্তী এই শহরের ১৭শ শতাব্দীর ভবনটিতেই হিটলার জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল।
দীর্ঘদিন ধরে ভবনটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে চলছিল বিতর্ক। ভবনটি নব্য-নাৎসি ও উগ্র ডানপন্থীদের জন্য এক ধরনের প্রতীক বা তীর্থস্থানে পরিণত হতে পারে, শঙ্কা ছিল অস্ট্রিয়ার কর্তৃপক্ষে। সেই আশঙ্কা থেকেই নেওয়া হয় এই রুপান্তরের সিদ্ধান্ত।
প্রায় ২ কোটি ইউরো ব্যয়ে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে ভবনটির। আগের হলুদ রঙের দেয়াল এখন রাঙ্গানো হয়েছে সাদায়; প্রবেশপথে লাগানো হয়েছে পুলিশের চিহ্ন। ফলে অনেকটাই বদলে গেছে ভবনটির আগের চেহারা। তবে ভবনটির সঙ্গে হিটলারের ইতিহাসের একমাত্র দৃশ্যমান সংযোগ হলো বাইরে থাকা একটি স্মৃতিফলক, যা ১৯৮৯ সালে স্থাপন করা হয়। মাউথাউজেনের সাবেক নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের পাথর দিয়ে তৈরি ওই স্মৃতিফলকে লেখা আছে: ‘শান্তি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য, আর কখনো ফ্যাসিবাদ নয়। লাখো নিহত মানুষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির দখলে থাকা অস্ট্রিয়ায় নিহত হন প্রায় ৬৫ হাজার ইহুদি; দেশ ছাড়তে বাধ্য হন আরও প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার মানুষ। এই ইতিহাসের কারণেই হিটলারের জন্মস্থান কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক চলে বহু বছর ধরে ।
১৯১২ সাল থেকে ভবনটি একটি পরিবারের মালিকানায় ছিল। ১৯৭২ সালে লিজ দেওয়া হয়েছিল অস্ট্রীয় সরকারের কাছে। সে সময় এটি ব্যবহৃত হতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা কেন্দ্র হিসেবে। ভবনটির শেষ ব্যক্তিমালিক গারলিন্ডে পোমার দীর্ঘদিন বিরোধিতা করেন ভবনটির পুনর্ব্যবহার ও সরকারি অধিগ্রহণের। পরে ২০১৬ সালে আইন পাসের পর আদালতের অনুমোদনে প্রায় ৮ লাখ ১০ হাজার ইউরোর বিনিময়ে ভবনটি অধিগ্রহণ করে নেয় সরকার।
ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, ভবনটি ধ্বংস করে দেওয়া কোনো সমাধান হতো না। বরং ইতিহাসের দায় স্বীকার করে এমন ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল, যাতে এটি কোনোভাবেই নাৎসিবাদের প্রতীক হয়ে উঠতে না পারে। সেই বিবেচনায় বিশেষজ্ঞ কমিটি সুপারিশ করে ভবনটিকে পুলিশ স্টেশনে রূপান্তরের।
অস্ট্রীয় সরকারের দাবি, পুলিশের স্থায়ী উপস্থিতি স্পষ্ট বার্তা দেবে- নাৎসিবাদ বা ফ্যাসিবাদকে মহিমান্বিত করার কোনো সুযোগ সেখানে নেই। এভাবে ভবনটিকে একটি নিরপেক্ষ সরকারি স্থাপনায় পরিণত করা সম্ভব হবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েও রয়েছে সমালোচনা। মাউথাউসেন কমিটি অস্ট্রিয়ার মুখপাত্র রবার্ট আইটার এএফপিকে জানালেন, মানুষ কখনো ভুলবে না যে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যাকারীর জন্ম হয়েছিল এখানেই। শুধু ভবনের ব্যবহার বদলালেই নব্য-নাৎসিদের সমাগম পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না বলেও মন্তব্য করছিলেন তিনি।
এদিকে ভবনটিকে নাৎসি অতীত নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত ছিল বলেও মত দেন অনেকে। তবে স্থানীয় ইতিহাসবিদ ফ্লোরিয়ান কোটানকো চান, আগের সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানটিই সেখানে ফিরে আসুক।
ভবনটির অতীত ইতিহাস কখনো পুরোপুরি মুছে যাবে না উল্লেখ করে তার ভাষ্য, ‘এটি নিয়ে আমাদের দায়িত্বশীল ও খোলামেলা উপায়ে কাজ করতে হবে। এটি গর্বের বিষয় নয়, বরং ইতিহাসের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়।’
সব মিলিয়ে, হিটলারের জন্মস্থানকে পুলিশ স্টেশনে রূপান্তরের এই উদ্যোগ শুধু একটি ভবনের ব্যবহার বদলের ঘটনা নয়; বরং ইতিহাসের স্মৃতি সংরক্ষণ, উগ্রবাদ মোকাবিলা এবং অতীতের দায় স্বীকারের প্রশ্নেও অস্ট্রিয়ার অবস্থানকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।




