রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা
হুতিদের বিরুদ্ধে যোগ দিতে পারে ওয়াশিংটন, আরও যা জানা গেল

সংগৃহীত ছবি
সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আছেন দুই বাংলাদেশি। হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত হুতিদের দায়ী করেছে সৌদি জোট। একই সঙ্গে হামলার চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে তারা। অন্যদিকে, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির সঙ্গে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এ ঘটনায় রিয়াদের স্কুলগুলোতে এক সপ্তাহের জন্য অনলাইন বা দূরশিক্ষণ চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও স্পেনের দূতাবাসগুলো তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দরটি এড়িয়ে চলার সতর্কতা জারি করেছে। এ ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিমানবন্দরে কী ঘটেছিল
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় নিহতদের মধ্যে চার সৌদি নাগরিক, দুই বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে এ হামলা চালানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, ক্ষেপণাস্ত্রটি বিমানবন্দরের ৩ ও ৪ নম্বর টার্মিনাল নিয়ে গঠিত একটি কমপ্লেক্সে আঘাত হানে। কমপ্লেক্সটি মূলত অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা হয়।
হামলার সময় অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের কাছে ছিলেন এক যাত্রী। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘আমি ৪০৩ নম্বর গেটে ছিলাম। ৪০১ নম্বর গেটে আঘাত হানতে দেখেছি। আমার চোখের সামনে আহতদের দেখেছি। সবাই দৌড়াদৌড়ি করছিল।’
হামলার পর ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের জন্য বিমানবন্দরের সব কার্যক্রম স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ফ্লাইটরাডার২৪ জানিয়েছে, বিমানবন্দর বন্ধ রাখার সময় পরবর্তী সময়ে রবিবার রাত ৯টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মে মাসের পর সৌদি আরবের ভূখণ্ডে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। ওই বছরের মে মাসে কাতিফের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২১ মুসল্লি নিহত হন। ইসলামিক স্টেট (আইএস) ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
সৌদি অভিযানে যোগ দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, হুতিদের ওপর সৌদি বিমান হামলায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যোগ দিতেও পারি।’
তিনি জানান, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলবেন। সৌদি আরবে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেও বর্ণনা করেন তিনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন, নিহতদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়ে সৌদি আরবের আগের অনুরোধগুলো প্রত্যাখ্যানের কথা উঠে এসেছে।
স্কুল, ফ্লাইট ও ভ্রমণব্যবস্থায় প্রভাব
সৌদি আরবের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, রিয়াদের স্কুলগুলো আগামী এক সপ্তাহের জন্য দূরশিক্ষণ বা অনলাইন ক্লাসে ফিরে গেছে।
এএফপির দেখা তথ্য অনুযায়ী, রবিবার অভিভাবকদের কাছে পাঠানো এক ইমেইলে মন্ত্রণালয়ের আদেশের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, ‘রিয়াদের সব স্কুল পুরো সপ্তাহের জন্য দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে চলে যাবে।’ এক মাসের কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো এ ধরনের নির্দেশ জারি করা হলো।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও স্পেনের দূতাবাসগুলো তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দরটি এড়িয়ে চলার সতর্কতা দিয়েছে। এএফপিকে এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন, কয়েকটি দূতাবাস আগামী এক সপ্তাহের জন্য তাদের কর্মীদের এই বিমানবন্দর ব্যবহার করতে নিষেধ করেছে।
১১ অক্টোবরের এক নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন মিশন সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল, আকাশসীমা বন্ধ এবং ভ্রমণ বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যকার রুটে ফ্লাইট বাতিল এবং সময়সূচি পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে এমিরেটস, ইতিহাদ এয়ারওয়েজ, ফ্লাইদুবাই ও এয়ার অ্যারাবিয়া। যাত্রীদের ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের মাধ্যমে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হামলার নিন্দা বিভিন্ন দেশের
রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা জানিয়েছে বেশ কয়েকটি দেশ। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে তারা।
আজ রবিবার ইউরোপীয় নেতারা রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে। কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লিয়েন সৌদি আরবের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে সংহতি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইরানের প্রক্সিগুলোর এই হামলা অঞ্চলটিকে সহিংসতার এক ঘূর্ণিপাকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পরিবহন ও জ্বালানি কেন্দ্রগুলো অস্থিতিশীল হচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ ‘জঘন্য হামলার’ নিন্দা জানিয়েছেন। পাশাপাশি দুই দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি ইসলামাবাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
ভারতও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশটির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।
কাতার হুতিদের এ হামলাকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে। দেশটির মতে, এ হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।
জর্ডান হামলাটিকে সৌদি সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন ও বিপজ্জনক উসকানি হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির ভাষ্য, এ হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন।
মিসরও বিমানবন্দরে হামলাসহ সৌদি আরবের ওপর অব্যাহত হামলার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটি এসব ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং বিভিন্ন জাতীয়তার বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি অনাদর হিসেবে উল্লেখ করেছে।







