রিয়াদ দাম্মামের তিন স্থাপনায় হামলার হুঁশিয়ারি ইয়েমেনের
- টার্গেট আরামকোর প্রধান কার্যালয়, রিয়াদের তেল শোধনাগার এবং কিং খালেদ বিমানবন্দর
- আকাশ প্রতিরক্ষা সংকটে সৌদি আরব
- কঠোর জবাবের হুমকি সৌদি মন্ত্রীর

ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের আঁচ লেগেছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। সে আগুনে জ্বলছে সৌদি আরব- ইয়েমেনও। বন্দুক-বোমা, ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র আর বিমান হামলায় ভেঙে খান খান হয়ে গেছে দুই দেশের চার বছর আগের ভঙ্গুর শান্তিচুক্তি। সৌদির সুউচ্চ প্রাসাদ আর ঝলমলে বিমানবন্দরগুলোর আকাশে উড়ছে হুতি হামলার বারুদ। ইয়েমেনের সানায় ধেয়ে যাচ্ছে সৌদি জোটের বোমারু বিমান। পাল্টাপাল্টি হামলায় রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে মরুভূমির তেলসমৃদ্ধ দুই প্রতিবেশী ভূখণ্ড। চলতি বছরের ১৩ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে নতুন এ সংঘাত। সেই থেকেই চলছে। থেমে নেই কোনো পক্ষই। গতকাল মঙ্গলবারও সৌদি আরবে আরও বড় হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। বরাবরের মতো এদিনও তিনটি স্থাপনার নাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছে গোষ্ঠীটি। আরামকোর প্রধান কার্যালয়, রিয়াদের একটি তেল শোধনাগার এবং কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। রয়টার্স, বিবিসি, আরব নিউজ। হুতি ঘাঁটি ইয়েমেনের রাজধানী সানার এক তেলকেন্দ্র থেকে সাধারণ নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। সেখানে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ছিল এ আলটিমেটাম। দুপুর ১২টার দিকে জোটের যৌথ বাহিনী কমান্ডের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে মানচিত্রের মাধ্যমে ওই স্থানটি চিহ্নিত করা হয়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থেই তাদের দ্রুত ওই এলাকা ত্যাগ করতে বলা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১২টার দিকে সানার জ্বালানি স্থাপনায় বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব। হামলার পর জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, ইয়েমেনে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য হুতিদের ব্যবহৃত ‘গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ’ লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
সৌদি প্রেস এজেন্সিতে (এসপিএ) প্রকাশিত বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন, এ সম্পদগুলোর মধ্যে রয়েছে সানার আল-সাবাহা কেন্দ্রীয় স্টেশন, ভূগর্ভস্থ জ্বালানি মজুদ এবং হোদেইদাহ, সানা ও ধামার অঞ্চলে অবস্থিত জ্বালানি ট্যাংক ও টার্মিনাল। ‘ইয়েমেন অয়েল কোম্পানি’র সাবাহ সেন্ট্রাল স্টেশনে হামলার হুঁশিয়ারির পরপরই পাল্টা হুমকি দিয়েছিল হুতিরাও। তাদের স্পষ্ট বার্তা— আকাশে যদি সৌদির আগ্রাসন না থামে, তবে রিয়াদের আরামকো তেল খনি কিংবা বিলাসী বিমানবন্দরগুলো পরিণত হবে ধ্বংসস্তূপে। পরে জোটের এই হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে গোষ্ঠীটি। একই সঙ্গে ওই তিন স্থাপনা থেকে নাগরিকদের সরে যাওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছে।
গতকাল ভোরেও রিয়াদে হামলা চালিয়েছে হুতি গোষ্ঠী। বিমান হামলার সাইরেন বেজেছে। বিস্ফোরণের শব্দও শুনেছে স্থানীয়রা। সৌদি জোট তাদের এক্স বিবৃতিতে জানিয়েছে, রিয়াদের উত্তরে তিনটি ড্রোন প্রতিহত করেছে দেশটি। একই অভিযোগ হুতি গোষ্ঠীরও। বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, গতকালও দিনের শুরুর দিকে সৌদি আরবে তাদের দখলে থাকা এলাকায় ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়েছে। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, তারা সৌদির একটি ‘নজরদারি ড্রোন’ গুলি করে ভূপাতিত করেছেন।
হামলার ‘কঠোর জবাব’র হুমকি সৌদি মন্ত্রীর
হুতিদের প্রাণঘাতী হামলার ‘কঠোর জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদে অনুষ্ঠিত ডব্লিউপিসি এনার্জি কংগ্রেসে তিনি বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত গুরুতর। তাই আমাদের জবাবও হতে হবে সমানভাবে কঠোর।’ দেশটির কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, হুতি গোষ্ঠীর টানা হামলায় আকাশ প্রতিরক্ষা সংকটের মুখে পড়েছে সৌদি আরব। কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে গত সোমবার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর অব্যাহত হামলা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ কমে আসছে সৌদি আরবের। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ গত আগস্টে একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় সৌদি আরব ও পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের প্রতিরক্ষা মজুদ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব তার ২ হাজার ৮০০টি ‘প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩’ প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৮৬ শতাংশই ব্যবহার করে ফেলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধারণা করা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রায় ৬৫ শতাংশ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। যুদ্ধের আগে থাকা প্রায় ২ হাজার ৩৩০টি ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ নাগাদ নেমে এসেছে ৭৫৯টিতে। সৌদি আরবের নিজস্ব সামরিক-শিল্প সক্ষমতা সীমিত। ফলে অত্যাধুনিক অস্ত্র আমদানির পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। ঐতিহাসিকভাবেই নিজেদের সামরিক বাহিনীকে সহায়তা ও শক্তিশালী করার জন্য তারা নির্ভর করে এসেছে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী, ঠিকাদার ও প্রশিক্ষকের ওপর। সম্প্রতি সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে তা প্রশমনের আহ্বান বাংলাদেশের। ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ বিন জাফর আবিয়াহ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এ আহ্বান জানান। গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ হয়।
চাপ বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর
মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতার এ নতুন বিস্তার ট্রাম্পের জন্য এসেছে অত্যন্ত অসময়ে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। এতে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি এমনিতেই কঠিন পরিস্থিতির মুখে রয়েছে। সৌদি জ্বালানি স্থাপনার পাশাপাশি লোহিতসাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজে হুতিদের হামলায় জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের সহযোগী গবেষক নাতাশা হল সোমবার ব্লুমবার্গ টেলিভিশনকে বলেছেন, ‘এখানে ট্রাম্প কঠিন অবস্থানে রয়েছেন। কারণ, সৌদি আরবের সত্যিই সহায়তা প্রয়োজন। তারাও সম্ভবত জানে, সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট একপ্রকার আটকে আছেন। পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, সৌদিরা কৌশলগতভাবে নিজেদের পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে।’



