আনোয়ার ইব্রাহিম
তাইওয়ান চীনের অংশ
- মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে ক্ষুব্ধ তাইপে, প্রশংসায় চীন

মালয়েশিয়া গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সরকারকে ‘চীনের একমাত্র বৈধ সরকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে বেইজিং যে অবস্থান সেটি স্বীকার করে।
তাইওয়ান নিয়ে এমন সোজাসাপ্টা অবস্থান সচরাচর শোনা যায় না দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনও নেতার মুখে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, “আমি তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবেই দেখি, ব্যস।” শুধু তা-ই নয়, শান্তিপূর্ণ ভাবে একত্রীকরণ সম্ভব না হলে চীনের বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নে নিজের দেশের উদাহরণ টেনে জানালেন, মালয়েশিয়ার কোনও প্রদেশ বিচ্ছিন্ন হতে চাইলে দেশের ঐক্য রক্ষায় তিনিও শক্তি প্রয়োগ করবেন। তার এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ তাইওয়ান। অপর দিকে আনোয়ারের অবস্থানকে প্রকাশ্যেই ‘সাধুবাদ’ জানিয়েছে চীন।
সোমবার আল জাজিরায় প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তাইওয়ান প্রশ্নে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন আনোয়ার। তাকে বলা হয়েছিল, তাইওয়ানের জনমতের একটি বড় অংশ বেইজিংয়ের শাসনের অধীনে যেতে চায় না; গণতন্ত্র ও মানুষের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে কথা বলা নেতা হিসেবে সেই ইচ্ছাকে তিনি কী ভাবে দেখেন? জবাবে ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে আনোয়ার বলেন, তাইওয়ান চীনেরই অংশ এবং বিষয়টিকে ‘এক চীন’ কাঠামোর মধ্যেই দেখতে হবে।
এর পরেই আসে আরও স্পর্শকাতর প্রশ্ন। শান্তিপূর্ণ একত্রীকরণ ব্যর্থ হলে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের অধিকার কখনও ত্যাগ করেনি বেইজিং। এমন পরিস্থিতিতে চীনকে তিনি নিন্দা করবেন কি না, জানতে চাওয়া হলে আনোয়ার মালয়েশিয়ার উদাহরণ দেন। তার বক্তব্য, দেশের কোনও একটি প্রদেশ যদি আলাদা হয়ে যেতে চায়, তবে রাষ্ট্রের অখন্ডতা ও ঐক্য রক্ষা করা তার দায়িত্ব। সরাসরি জানতে চাওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে তিনি শক্তি প্রয়োগ করবেন? আনোয়ারের উত্তরে বলেছেন, হ্যাঁ৷ তা না হলে দেশ খণ্ডিত হয়ে যাবে।
আনোয়ারের মন্তব্যে মঙ্গলবারই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের অভিযোগ, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তাইওয়ানকে চীনের একটি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রদেশ’ হিসেবে দেখিয়ে বেইজিংয়ের শক্তি প্রয়োগের অবস্থানকে যুক্তিসঙ্গত করার চেষ্টা করেছেন। তাইপে আরও সতর্ক করে বলেছে, এমন বক্তব্য মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাইওয়ানি ব্যবসায়ীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কিন্তু তাইওয়ানের সেই প্রতিবাদের পরদিনই আনোয়ারের পাশে দাঁড়ায় চীন। বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, ‘এক চীন’ নীতির প্রতি আনোয়ারের দৃঢ় অবস্থানকে বেইজিং সাধুবাদ জানায়। তার দাবি, বিশ্বে একটিই চীন এবং তাইওয়ান তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। চীনের একত্রীকরণ ঠেকানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি
তাইপের আপত্তির পরও নিজের বক্তব্য থেকে সরেননি আনোয়ার। বৃহস্পতিবার তিনি বলেছেন, এটি তার ব্যক্তিগত কোনও নতুন অবস্থান নয়; মালয়েশিয়া বহু দশক ধরেই ‘এক চীন’ নীতি অনুসরণ করছে। একই সঙ্গে অবশ্য তিনি জোর দিয়েছেন, সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানই চায় কুয়ালালামপুর। আনোয়ারের কথায়, দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী আবদুল রাজাক হুসেইনের সময় থেকে যে নীতি চলে আসছে, তিনি কেবল সেই ধারাবাহিক অবস্থানই তুলে ধরেছেন।
ইতিহাসও তার সেই দাবিকে সমর্থন করে। ৩১ মে ১৯৭৪ আবদুল রাজাক ও চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। তখনই মালয়েশিয়া গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সরকারকে ‘চীনের একমাত্র বৈধ সরকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে বেইজিং যে অবস্থান সেটি স্বীকার করে। মালয়েশিয়া তখন তাইপেতে নিজেদের কনস্যুলেটও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয় গত বছরের চীন-মালয়েশিয়া যৌথ বিবৃতিতে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মালয়েশিয়া সফরের সময় প্রকাশিত বিবৃতিতে কুয়ালালামপুর আবারও জানায়, তারা ‘এক চীন’ নীতিতে অটল, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনই দেশটির একমাত্র বৈধ সরকার এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার কোনও দাবিকে মালয়েশিয়া সমর্থন করবে না।
তবে এখানেই বর্তমান বিতর্কের সূক্ষ্ম পার্থক্য। ‘এক চীন’ নীতি মেনে চলা মালয়েশিয়ার বহু দিনের কূটনৈতিক অবস্থান। কিন্তু তাইওয়ান প্রশ্নে সম্ভাব্য বলপ্রয়োগ নিয়ে এত সরাসরি মন্তব্য করাতেই আনোয়ারের বক্তব্য আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নীতিগত অবস্থান বদলায়নি, কিন্তু তার ভাষা কুয়ালালামপুরের প্রচলিত কূটনৈতিক ভাষার তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট, আর সেটিই বেইজিংকে সন্তুষ্ট এবং তাইপেকে ক্ষুব্ধ করেছে।
বুধবার মালয়েশিয়ার সরকারি মুখপাত্র ও যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল জানিয়েছেন, আনোয়ারের মন্তব্য নিয়ে সাপ্তাহিক মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোনও আলোচনা হয়নি। অন্য দিকে তাইওয়ানের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ নিয়ে সতর্কবার্তা আসায় বিষয়টি শুধু কূটনীতির মধ্যেও আটকে নেই। মালয়েশিয়ার ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে তাইওয়ানি প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য আগ্রহ রয়েছে, ফলে রাজনৈতিক কথার অভিঘাত ব্যবসাতেও পড়ে কি না, সেই দিকেও নজর থাকবে।
তাইওয়ান বর্তমানে নিজস্ব সরকার, সামরিক বাহিনী ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হলেও বেইজিং দ্বীপটিকে চীনের অংশ বলে দাবি করে। প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগের পথও খোলা রেখেছে চীন; যদিও তাদের ঘোষিত অগ্রাধিকার ‘শান্তিপূর্ণ একত্রীকরণ’। তাইপের বর্তমান সরকার তাইওয়ানের ওপর বেইজিংয়ের কর্তৃত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
ফলে আনোয়ারের কয়েকটি বাক্যেই ফের সামনে এসেছে এশিয়ার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক বিরোধগুলোর একটি। তাইওয়ানের আপত্তির পরও অবস্থান বদলাননি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী; উল্টো সেই অবস্থানকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছে চীন। এক দিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে কুয়ালালামপুরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অন্য দিকে তাইওয়ানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক যোগ, আনোয়ারের মন্তব্যের রেশ তাই শুধু কূটনৈতিক বিবৃতিতেই থামছে না।






