ইউরো বেচে ইয়েন ক্রয়
জাপানি মুদ্রার পতন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কেন

ছবি: রয়টার্স
ইয়েনের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে পড়ে যাওয়ার পর তা ঠেকাতে বিরল এক যৌথ হস্তক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। দুই দেশের সরকার সপ্তাহান্তে এ পদক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে গুরুত্বপূর্ণ এক মিত্রের প্রতি ‘বন্ধুত্বের নিদর্শন’ বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এ পদক্ষেপ বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষাতেও সহায়ক।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠকের সময় অসাবধানতাবশত হাতে লেখা একটি করণীয় তালিকা সবার সামনে রেখে দেওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ওই তালিকায় লেখা ছিল, ‘জাপানি ইয়েন (জেপিওয়াই) ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের কিনতে হবে।’ পরে নিশ্চিত করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ইউরো বিক্রি করে ইয়েন কিনেছে। এতে প্রথমে অনিচ্ছাকৃতভাবে ফাঁস হওয়া তথ্যটি সত্য বলে নিশ্চিত হয়।
এ হস্তক্ষেপ ছিল প্রয়োজনের তাগিদে নেওয়া সিদ্ধান্ত। কারণ, ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার ১৬৩-এরও নিচে নেমে যায়, যা ১৯৮০-এর দশকের শুরুর পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান। এক বছর আগে এ হার ছিল প্রায় ১৪৭। এ পতনের পেছনে একাধিক কারণ ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সুদের হারের ব্যাপক ব্যবধান। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সুদের হার ছিল ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে, জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সালের জুনে তাদের প্রধান সুদের হার বাড়িয়ে মাত্র ১ শতাংশে উন্নীত করে। এ ব্যবধানের কারণে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ইয়েনের আকর্ষণ কমে যায়। ফলে তারা বেশি মুনাফা পাওয়া যায় এমন ডলারভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও জাপানের সংকট আরও বাড়িয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ডলারে নির্ধারিত হওয়ায় জ্বালানি আমদানিনির্ভর জাপান দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়ে। একদিকে জ্বালানির দাম বেড়েছে, অন্যদিকে ডলার কিনতে দুর্বল হয়ে পড়া ইয়েনের আরও বেশি পরিমাণ প্রয়োজন হয়েছে। এতে আমদানি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, যা পরিবারের ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির জনপ্রিয়তা কমিয়ে দেয়।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনেরও উদ্বেগের কারণ ছিল। দুর্বল ইয়েনের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যায়। অতিমূল্যায়িত ডলারের সমালোচনা করতে গিয়ে ট্রাম্প একাধিকবার এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি উভয় দেশই আশঙ্কা করছিল, ইয়েন এবং জাপানের সরকারি বন্ডের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব বৈশ্বিক বাজারেও পড়তে পারে। এতে মার্কিন সরকারি বন্ডের মুনাফার হার বেড়ে গিয়ে ওয়াশিংটনের ঋণ গ্রহণের ব্যয়ও বাড়তে পারে।
এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ অত্যন্ত বিরল। সাধারণত বড় অর্থনীতিগুলো বাজারের ওপরই বিনিময় হার নির্ধারণের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়। কেবল চরম অস্থিরতার সময় সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হয়। ২০১১ সালের পর এই প্রথম ওয়াশিংটন ও টোকিও যৌথভাবে এমন পদক্ষেপ নিল। তবে সে সময় লক্ষ্য ছিল উল্টো। তখন ভূমিকম্প ও সুনামির পর রপ্তানিনির্ভর জাপানের অর্থনীতিকে সহায়তা করতে জি-৭ দেশগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইয়েনকে দুর্বল করার উদ্যোগ নিয়েছিল। আর ইয়েনকে শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হস্তক্ষেপ ছিল ১৯৯৮ সালে।
এ হস্তক্ষেপের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে পড়ে। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর একপর্যায়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে তিন মাসের সর্বোচ্চ ১৫৫ দশমিক ২০-এ পৌঁছে যায়। এর আগে টানা দুই কার্যদিবসে ইয়েনের মূল্য ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছিল। পরে বিনিময় হার প্রায় ১৫৭-এ স্থিতিশীল হয়। ইয়েন কেনার চাপের কারণে ডলারের দর কমে যায় এবং ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডসহ অন্যান্য প্রধান মুদ্রার মূল্য বাড়ে। তবে শক্তিশালী ইয়েনের প্রভাব পড়ে জাপানের শেয়ারবাজারে। আগের সপ্তাহের উত্থানের পর নিক্কেই সূচক কিছুটা কমে যায়। যদিও বছরের হিসাবে সূচকটি এখনও প্রায় ৩০ শতাংশ ওপরে রয়েছে। এ প্রভাব শুধু জাপানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের মুদ্রা ওনের দর ধরে রাখতে বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে, যা ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দুই দেশই আবারও প্রয়োজন হলে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। স্কট বেসেন্ট এবং জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাটায়ামা বলেছেন, প্রয়োজনে তারা ‘একটুও দ্বিধা করবেন না’। বিশ্লেষকদের ধারণা, মুদ্রা নিয়ে জল্পনাকারীদের নিরুৎসাহিত করতে মাঝেমধ্যেই এমন হস্তক্ষেপ দেখা যেতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ‘শুধু সময় কিনে দেয়’; একে দিয়ে ইয়েনের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য সুদের হারের ব্যবধান কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতার দুর্বলতা এবং জনসংখ্যার কর্মক্ষম অংশ সংকুচিত হওয়ার মতো কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে হবে।
দ্য উইক থেকে অনূদিত।






