চীনের জন্য উত্তর কোরিয়া মিত্র নাকি মাথাব্যথা?

কিম জং উন ও শি জিনপিং— রয়টার্স
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য উত্তর কোরিয়া এমন এক প্রতিবেশী, যাকে চীন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না, আবার হারানোর ঝুঁকিও নিতে পারে না। দুই দেশ প্রায়ই তাদের সম্পর্ককে ‘রক্তে গড়া বন্ধন’ বলে বর্ণনা করে, যা কোরীয় যুদ্ধের সময়কার সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারস্পরিক অবিশ্বাসে এই সম্পর্কের টানাপড়েন বেড়েছে। এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনিশ্চিত এই মিত্রের ওপর আবারও প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বেইজিং।
এই সপ্তাহে শির পিয়ংইয়ং সফর মূলত বন্ধুত্বের চেয়ে প্রভাব ধরে রাখার প্রচেষ্টাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। চীন সীমান্তে স্থিতিশীলতা ও উত্তর কোরিয়ায় নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে চায়, তবে পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে সৃষ্ট সংকটে জড়িয়ে পড়তে চায় না। পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ক্রমেই অস্বস্তিতে পড়ছে বেইজিং।
২০২৪ সালেই বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কের শীতলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫তম বার্ষিকী দুই দেশই প্রায় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই পার করে। উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে চীনের রাষ্ট্রদূত অংশ নেননি এবং পুরো বছর জুড়ে হয়নি কোনো উচ্চপর্যায়ের সফরও।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে মস্কোর সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের বাড়তে থাকা ঘনিষ্ঠতা নিয়ে চীন উদ্বিগ্ন। ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়া সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে পুতিনের পিয়ংইয়ং সফরে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে লড়তে গিয়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে তেল ও সহায়তার বিনিময়ে রাশিয়াকে গোলাবারুদ সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্টের গবেষক অঙ্কিত পান্ডা বিবিসিকে বলছিলেন, ‘মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের দ্রুত ঘনিষ্ঠতার সময়ে উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে চায় চীন।’
চীনের একমাত্র আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে। তবে বেইজিং চায় না, পিয়ংইয়ংয়ে রাশিয়া প্রধান প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হোক।
সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হিসেবে গত বছর কিম জং উনকে বেইজিংয়ের সামরিক কুচকাওয়াজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন শি। তিনি দুই দেশকে ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের বন্ধনে আবদ্ধ ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু ও ভালো কমরেড’ বলেও বর্ণনা করেন।
তবে চীন সরাসরি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির বিরোধিতা এড়িয়ে চলে। বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত চাপ দিলে পিয়ংইয়ং আরও বেশি মস্কোর দিকে ঝুঁকে যেতে পারে।
অন্যদিকে কিম জং উনও চীনকে দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারেন না। কারণ উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় সহায়তাদাতা দেশ চীনই।
গত বছর উত্তর কোরিয়ায় চীনের রপ্তানি বেড়ে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ছয় বছর বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয়েছে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও।
শি ও কিমের সম্পর্ক শুরু থেকেই জটিল ছিল। ক্ষমতায় এসে কিম উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে নেন। প্রথম ছয় বছরে তিনি প্রায় ৯০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং চারটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের তত্ত্বাবধান করেন।
কিমের চাচা জাং সং থায়েককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনাও বেইজিংকে উদ্বিগ্ন করেছিল। চীন তাকে উত্তর কোরিয়ায় স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখত।
আজও উত্তর কোরিয়া চীনের জন্য একই সঙ্গে একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী ও বোঝা।
কিম চীনের সুরক্ষা চান, কিন্তু চীনের নিয়ন্ত্রণ চান না। আর বেইজিং চায় প্রভাব বজায় রাখতে, তবে অস্থিতিশীলতা নয়।
দুই পক্ষই পুরোপুরি একে অপরকে বিশ্বাস করে না, কিন্তু এখনো উভয়ই মনে করে তারা একে অপরকে প্রয়োজন।




