শাকিরার সুর আর ফুটবলের ফুল

বিক্ষোভ, বিদ্রোহে উত্তাল ছিল পুরো মেক্সিকো সিটি। দেশটির সরকারের বিপক্ষে নানা দাবি তুলে ধরতে বিশ্বকাপকেই বেছে নিয়েছেন তারা। এর মধ্যেই শাকিরার কণ্ঠের জাদুতে মোহাচ্ছন্ন পুরো মেক্সিকো সিটি। শুধু কি মেক্সিকো, যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যেও শাকিরা যেন ‘দাই দাই’ গানে ছড়িয়ে দিতে চাইলেন সাম্যের বার্তা। সব ভুলে মাসখানেক সময় বিশ্বকাপে ডুবে থাকার আমন্ত্রণই ছিল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগে থেকে ভিড় জমতে শুরু করে মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে, যা বিশ্বব্যাপী পরিচিত আজতেকা নামে। হলুদ সবুজ জার্সি আর পতাকা নিয়ে সোল্লাসে স্টেডিয়ামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার সমর্থকরা। অন্য প্রান্ত থেকে এগিয়ে আসছিলেন সাদা-সবুজ জার্সি পরা মেক্সিকো সমর্থকরা। তাদের নাচগান, ঢাকঢোলের শব্দেই স্পষ্ট হয়ে যায়, বিশ্বকাপ শুরু হতে আর দেরি নেই।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল মেক্সিকো সরকার। ছুটি ছিল স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও। ছুটির দিনে সবাই মিলেছিলেন যেন এক মোহনায়। বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে প্রচুর বিতর্ক থাকলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাতিয়ে দিল মেক্সিকো। দেওয়া হলো ঐক্যের বার্তা, দেওয়া হলো সাম্যের বার্তাও। ফুটবলই যে দুনিয়াকে এক করতে পারে, সেই বার্তা উঠে এলো বারে বারে।
১৯৯৪ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রে প্রয়াত কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ডায়ানা রসের পেনাল্টি কিক বেশ সাড়া ফেলেছিল। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে রিকি মার্টিনের গাওয়া ‘ওলে ওলে’তে মজে ছিল একটি প্রজন্ম। ২০০৬ বিশ্বকাপে ‘হিপস ডোন্ট লাই’-এর ‘ব্যাম্বু রিমিক্স’ ভার্সনে খালি পায়ে নেচে মাতিয়েছিলেন শাকিরা। এরপর ২০১০ বিশ্বকাপে শাকিরার গাওয়া ‘ওয়াকা ওয়াকা’ এখনো মাতিয়ে তোলে ফুটবলপ্রেমীদের। এখনো এই ‘অফিসিয়াল সং’ রেটিংয়ে এক নম্বরে। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালেও এই কলম্বিয়ান গায়িকা ‘লা লা লা’ দিয়ে মাতান আবেদনময়ী সাজপোশাকে।
গতকালের গান নিয়ে তিনি চারটি বিশ্বকাপে পারফর্ম করেছেন। শাকিরার কণ্ঠে গানের কথাগুলো এমন, ‘নিউ ফ্রম দ্য ডে ইউ ওয়ার বর্ন/হিয়ার ইন দিস প্লেস, ইউ বিলং/ইউ’ভ বিন দিস ব্রেভ অল অ্যালং/হোয়াট ব্রোক ইউ ওয়ানস মেড ইউ স্ট্রং।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন বার্না বয়। আরও ছিলেন অফিসিয়াল বিশ্বকাপ অ্যালবামের শিল্পী জে বালভিন, বেলিন্ডা, আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ, ড্যানি ওশান, লিলা ডাউনস, লস অ্যাঞ্জেলেস আজুলস, মানারা।
মেক্সিকোর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে তুলে ধরা ছিল এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। মেক্সিকোর স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা, লোক সংস্কৃতি এবং বিখ্যাত ‘পাপেল পিকাডো’ শিল্পকলার মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয় দেশটির বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিচয়।
এবারই প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিন দেশে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও হবে আলাদা তিনটি। মেক্সিকোর পর কানাডার টরন্টোয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকবেন বাংলাদেশি শিল্পী সঞ্জয়ও। তার সঙ্গে থাকবেন অ্যালানিস মরিসেট, মাইকেল বুবলে, আলেসিয়া ক্যারা, নোরা ফাতেহি, উইলিয়াম প্রিন্স ও এলিয়ানারা। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে পারফর্ম করবেন কেটি পেরি, অ্যানিত্তা, ফিউচার, লিসা, রেমা ও টাইলাররা।
উদ্বোধনেই অবশ্য ইতিহাস গড়েছে বিশ্বকাপের ইতিহাসের অংশ আজতেকা স্টেডিয়াম। এবারই প্রথম তিন তিনটি বিশ্বকাপের ম্যাচ গড়িয়েছে কোনো ভেন্যুতে। মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ শুরু হতেই তাই অমরত্ব পেয়ে যায় এই স্টেডিয়াম।
১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলে, গারসন, রিভেলিনো, জায়ারজিনহো, তোস্তাওদের দলের অমরত্ব এই স্টেডিয়ামেই। ফাইনালে এই স্টেডিয়ামেই ইতালিকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে নিজেদের ইতিহাসের তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার শতাব্দীসেরা গোল আর ‘ঈশ্বরের হাতের’ গোলের কীর্তি এই স্টেডিয়ামে। এরপর ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ও এখানে।
এবার আজতেকায় ফাইনাল নেই। তবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর এখানেই হয়েছে মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ম্যাচ।




