স্মরণীয় ১০ ম্যাচ

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এর অন্য নাম ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। চার বছর পরপর এই মঞ্চে জন্ম নেয় নতুন নায়ক, ভেঙে যায় পুরনো রেকর্ড, আবার কখনো কোনো একটি ম্যাচ ছাপিয়ে যায় পুরো আসরকেই।
২০২২ আসরের ফাইনালকে ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচ ধরা হয়। যে রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে ছড়িয়েছিল উত্তেজনা। শ্বাসরুদ্ধকর সেই ফাইনালের রাত দুহাত ভরিয়ে দিয়েছিল লিওনেল মেসির। ফুটবল ইতিহাসে এমন অনেক ম্যাচ আছে, যা আকর্ষণের মাপকাঠিতে ছাড়িয়ে যায় একটির চেয়ে অন্যটিকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি ম্যাচের তালিকা করলে সেখানে নিশ্চিতভাবে জায়গা পাবে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, পেলের রাজত্ব কিংবা ব্রাজিলের লজ্জার হার। মহাগুরুত্বপূর্ণ সেই ম্যাচগুলো নিয়ে িখেছেন ফাহিম মাশরুর
১. ব্রাজিল ৪-১ ইতালি (ফাইনাল, ১৯৭০)
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা দলগুলোর একটি বলা হয় ১৯৭০ সালের ব্রাজিলকে। মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ইতালিকে ৪-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে সাম্বার প্রতিনিধিরা। পেলে, জাইরজিনহো, রিভেলিনো ও কার্লোস আলবার্তোদের নৈপুণ্যে ফুটবল যেন শিল্পে পরিণত হয়েছিল ওই আসরে। বিশেষ করে কার্লোস আলবার্তোর ব্রাজিলের হয়ে করা ম্যাচের শেষ গোলটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা দলীয় গোল হিসেবে বিবেচিত। টানা ৩০ টাচে ব্রাজিল দলের সবার পায়ের ছোঁয়া ছিল এই গোলের বিল্ডআপে। এ ছাড়া রঙিন টিভিতে প্রথমবার দেখানো হয়েছিল এই ফাইনাল।
২. ব্রাজিল ১-২ উরুগুয়ে (চূড়ান্ত পর্ব, ১৯৫০)
ফুটবল অভিধানে ‘মারাকানাজো’ শব্দটির জন্ম এই ম্যাচ থেকেই। রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় ২ লাখ দর্শকের সামনে ব্রাজিলের শুধু ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত ছিল। কিন্তু উরুগুয়ে সবাইকে স্তব্ধ করে ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয় বিশ্বকাপ। আলসিদেস গিগিয়ার জয়সূচক গোলের পর পুরো ব্রাজিল যেন শোকে ডুবে গিয়েছিল। এটি এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন হিসেবে পরিচিত।
৩. আর্জেন্টিনা ৩-৩ ফ্রান্স (ফাইনাল, ২০২২)
সম্ভবত আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে নাটকীয় ফাইনাল। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল। এরপর কিলিয়ান এমবাপ্পের দুই গোল ম্যাচ ফিরিয়ে আনে সমতায়। অতিরিক্ত সময়ে লিওনেল মেসি আবার এগিয়ে নেন আর্জেন্টিনাকে, কিন্তু এমবাপ্পে হ্যাটট্রিক পূরণ করে ম্যাচ গড়ান টাইব্রেকারে। সেখানেও আর্জেন্টিনা ছিল স্নায়ুযুদ্ধের পরীক্ষায় সফল। ৪-২ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতে অবশেষে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলেন মেসি। দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ম্যাচের পরতে পরতে বাঁকবদল। শ্বাসরুদ্ধকর নাটকীয়তায় ভরা ম্যাচটি অনেকের চোখে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা ফাইনাল।
৪. আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড (কোয়ার্টার ফাইনাল, ১৯৮৬)
একটি ম্যাচ, দুটি গোল আর দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প। মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে করেন বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। কয়েক মিনিট পরই মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে ইংল্যান্ডের প্রায় পুরো রক্ষণভাগকে কাটিয়ে করেন ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। একই ম্যাচে ফুটবলের বিতর্ক ও সৌন্দর্যকে এমনভাবে আর কোনো খেলোয়াড় তুলে ধরতে পারেননি।
৫. ব্রাজিল ১-৭ জার্মানি (সেমিফাইনাল, ২০১৪)
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য স্কোরলাইনগুলোর একটি। নিজ দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিল মাত্র ২৯ মিনিটেই ৫ গোল হজম করে। জার্মানির দ্রুতগতির আক্রমণের সামনে অসহায় দেখাচ্ছিল ব্রাজিলকে। শেষ পর্যন্ত ৭-১ গোলের এই হার শুধু একটি পরাজয় নয়, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। যে ক্ষতের ব্যথা আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে ব্রাজিল ফুটবলকে। এই ম্যাচে হেরে নিজেদের মাঠে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নেরও মৃত্যু হয় ব্রাজিলের।
৬. সুইডেন ২-৫ ব্রাজিল (ফাইনাল, ১৯৫৮)
১৭ বছর বয়সী এক কিশোর এই ম্যাচে বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ফুটবলের ভবিষ্যৎ তার হাতে। সেই কিশোরের নাম পেলে। ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনকে ৫-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল। পেলের ২ গোল, বিশেষ করে ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে বল তুলে নেওয়ার পর করা গোলটি আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন।
৭. পশ্চিম জার্মানি ২-১ নেদারল্যান্ডস (ফাইনাল, ১৯৭৪)
‘টোটাল ফুটবল’-এর জন্য বিখ্যাত নেদারল্যান্ডসকে অনেকেই সেই সময়ের সেরা দল মনে করতেন। ম্যাচের প্রথম মিনিটেই ইয়োহান ক্রুইফদের দল পেনাল্টি থেকে এগিয়ে যায়। কিন্তু পশ্চিম জার্মানি ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। কৌশলের দিক থেকে জার্মানদের ম্যাচে ফেরা। নিজেদের ফুটবলশৈলীর প্রদর্শন করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। সব মিলিয়ে ওই সময় ফুটবলকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া সব ট্যাকটিকস দেখিয়েছিলেন জার্মানরা। তাই এই ম্যাচের গুরুত্ব ফুটবল ইতিহাসে কম নয়।
৮. উরুগুয়ে ৪-২ আর্জেন্টিনা (ফাইনাল, ১৯৩০)
বিশ্বকাপের প্রথম ফাইনাল। মন্টেভিডিওতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে দারুণ প্রত্যাবর্তন করে উরুগুয়ে। ৪-২ ব্যবধানে জিতে তারা হয়ে যায় ইতিহাসের প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। সেই ম্যাচই বিশ্বকাপের কিংবদন্তি যাত্রার সূচনা করে।
৯. পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি (ফাইনাল, ১৯৫৪)
‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে পরিচিত এই ম্যাচ। ফেরেঙ্ক পুসকাসের দুর্দান্ত হাঙ্গেরি দল টুর্নামেন্ট জুড়ে ছিল অপ্রতিরোধ্য। ফাইনালে তারা দ্রুত ২-০ ব্যবধানে এগিয়েও যায়। কিন্তু পশ্চিম জার্মানি অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। এই ম্যাচকে অনেকেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম বড় রূপকথা বলে মনে করেন।
১০. ইতালি ৩-২ ব্রাজিল (দ্বিতীয় পর্ব, ১৯৮২)
ফাইনাল না হয়েও বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচের মর্যাদা পেয়েছে এটি। ব্রাজিলের জিকো, সক্রাতেস, ফ্যালকাওদের দলকে সেই সময় প্রায় অপরাজেয় মনে করা হতো। কিন্তু ইতালির পাওলো রোসি একাই করেন হ্যাটট্রিক। তার নৈপুণ্যে ৩-২ গোলের জয় পায় ইতালি এবং বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দল হয়েও ব্রাজিলকে বিদায় নিতে হয় শিরোপাহীন অবস্থায়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে রোমাঞ্চে ঠাঁসা অসংখ্য ম্যাচ হয়েছে। কিন্তু কিছু ম্যাচ শুধু ফলাফলের জন্য নয়, তাদের নাটকীয়তা, আবেগ, নায়কোচিত পারফরম্যান্স কিংবা অঘটনের জন্য সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন এখন একটাই— এ তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার মতো আর কয়টি মহাকাব্যিক ম্যাচ ফুটবল বিশ্বের জন্য অপেক্ষা করছে?
প্রাইজমানি
- মেটলাইফের মঞ্চে সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরা চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ৫ কোটি ডলার।
- রানার্সআপ পাবে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
- এ ছাড়া তৃতীয়, চতুর্থ ও কোয়ার্টার ফাইনালিস্টরা পাবে যথাক্রমে ২ কোটি ৯০ লাখ, ২ কোটি ৭০ লাখ এবং ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার করে।
- নতুন চালু হওয়া শেষ ৩২ থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলো পাবে ১ কোটি ১০ লাখ ডলার।
- গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলোর পকেটে যাবে ৯০ লাখ ডলার।
- ৪৮টি দেশের প্রত্যেকে প্রস্তুতি খরচ পেয়েছে ১৫ লাখ ডলার।
- সম্প্রচার অধিকার ও স্পন্সরশিপ থেকে ফিফার প্রত্যাশিত আয় ১ হাজার ৯০ কোটি ডলার। শুধু মিডিয়া রাইটস থেকেই আসবে ৪২০ কোটি ডলার, গ্লোবাল স্পন্সর থেকে তারা পাবে ২৮০ কোটি ডলার।





