ফুটপাত থেকে বিশ্বকাপের ম্যাচসেরা

তেহরানের ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে সহজে ঘুম আসে না। মাথার ওপরে ছাদ নেই, পেটে তীব্র ক্ষুধা। আগামীকাল কী হবে, তারও নেই নিশ্চয়তা। অনিশ্চিত এই জীবনেও আলিরেজা বেইরানভান্দ দেখেছেন ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে খেলার স্বপ্ন। ৩৩ বছর বয়সী এই ইরানি কিপারই এখন বিশ্বকাপের নায়ক।
জন্ম তার লোরেস্তান প্রদেশে যাযাবর ভেড়াপালক পরিবারে। ভেড়া চুরির ভয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে পালিয়ে যেতেন আলিরেজারা। তার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নকে অবশ্য সমর্থন করেননি তার বাবা।
আলিরেজার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কাছে হার মানে বাবার বাধা। গ্রাম ছেড়ে শত মাইল দূরের তেহরান শহরে পাড়ি জমান ফুটবলার হওয়ার নেশায়। ছিল না থাকার জায়গা, পকেটে নেই টাকাও। কখনো মসজিদে, কখনো বা ফুটপাতে, খোলা আকাশের নিচেই কাটত তার রাত।
একবার তো ঘুম থেকে উঠে দেখেন, কিছু মানুষ তাকে ভিক্ষুক ভেবে টাকাও রেখে গেছেন! বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন কাজ করেছেন ইরানি কিপার। গাড়ি ধোয়া থেকে শুরু করে রাস্তা পরিষ্কার পর্যন্ত, একই সঙ্গে চালিয়ে গেছেন ফুটবল ক্যারিয়ার।
যে স্বপ্ন নিয়ে তেহরানে এসেছিলেন, পূরণ হয়েছে সেটি। ক্লাব ফুটবল থেকে জায়গা করে নিয়েছেন জাতীয় দলে। ২০১৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেক। আলিরেজা পাদপ্রদীপের আলোতে আসেন ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি ঠেকিয়ে।
এই বিশ্বকাপে আলিরেজা আছেন দুর্দান্ত ফর্মে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে তার অবিশ্বাস্য কিপিং দলকে এনে দিয়েছে মহামূল্যবান পয়েন্ট। দারুণ সব সেভে ম্যাচসেরাও হয়েছেন বেইরানভান্দ। তার কারণেই ইরানের জালে বল প্রবেশ করাতে পারেননি কেভিন ডি ব্রুইনারা।
এদিকে বেলজিয়ামের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার সময় ড্রেসিংরুমে ইরান রেখে গেল আবেগঘন এক চিঠি। কয়েকটি লাইনের সেই বার্তা যেন শুধু স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষের জন্য নয়, ছিল পুরো বিশ্বের উদ্দেশে।
ইরান ফুটবল ফেডারেশন সেই চিঠির একটি ছবি প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায়, চিঠিতে তারা লিখেছে, ‘হাজার হাজার বছর আগের প্রাচীন পারস্য থেকে আজকের সভ্য ইরান পর্যন্ত, ইরানের চেতনা জীবন্ত ও অটল রয়েছে।’
চিঠিতে ভেন্যু কর্তৃপক্ষ ও সমর্থকদের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে ইরান, ‘ধন্যবাদ লস অ্যাঞ্জেলেস, আপনাদের আতিথেয়তার জন্য। আমরা লস অ্যাঞ্জেলেসে এসেছিলাম গর্ব নিয়ে, সম্মানের সঙ্গে লড়েছি এবং এখন মর্যাদা নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছি।’
সমর্থকদের কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি বিশ্বের সব দেশে শান্তি বজায় রাখার বার্তাও রয়েছে ইরানের চিঠিতে, ‘প্রত্যেক ইরানিয়ানকে ধন্যবাদ, যারা তাদের হৃদয়, আওয়াজ এবং প্রাণ দিয়ে ১৮০ মিনিট আমাদের সমর্থন দিয়েছে। প্রত্যেক দেশের মধ্যে শান্তি, সম্মান এবং বন্ধুত্ব বজায় থাকুক।’
নীল কালিতে লেখা ওই চিঠিতে লাল কালিতে ‘৭৬৮’ এবং ‘মিনাব’ নামে দুটি শব্দ উল্লেখ করেছে ইরান। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের একটি স্কুল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ১৬৮ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছিল।
ইরান ফুটবল দলের এই বার্তা কি বিশ্ব বিবেকের কাছে পৌঁছাবে?




