নিয়তি হেলে আছে কার দিকে

এ দেশে কারণে-অকারণে জোর লড়াই হয় আকাশি ও হলুদে। বিশ্বকাপ এলে প্রবল রূপ নেয় এটি। বলছি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের কথা। ওই দুই দেশের মানুষও এতটা প্রতিপক্ষভাবাপন্ন নয়, যেটা এখানে হয়। সেই একপক্ষের নাকি কপাল পুড়তে পারে এবার কোয়ার্টার ফাইনালেই! তা-ও আবার চিরশত্রুর আঘাতে! বিশ্বকাপের রোডম্যাপ অনুযায়ী দুই দলকে সম্ভাব্য গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ধরে এগোলে এবং শেষ ৩২ পর্যন্ত কোনো অঘটন না ঘটলে কোয়ার্টার ফাইনালেই দেখা হয়ে যায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের। নিখাদ ফুটবলপ্রেমীরা ম্যাচটিকে ভীষণ উপভোগের হিসেবে নিলেও এই ম্যাচে এ দেশের বিশ্বকাপ অর্ধেকটা শেষ হয়ে যাবে নিশ্চিত।
দুই দল বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মুখোমুখি হয়েছে চারবার। দুটি জিতেছে ব্রাজিল, একটি ড্র এবং অন্যটি জিতেছে আর্জেন্টিনা। আকাশিদের ওই জায়টাও ছিল ’৯০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। পুরো ম্যাচটি খেলল ব্রাজিল, কিন্তু কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘ম্যাজিকাল’ অ্যাসিস্টে ক্যানিজিয়ার গোলে থেমে যায় সেলেসাওদের বিশ্বকাপ।
এবারও সেই শেষ ষোলোতেই দুপক্ষের দেখা এবং ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে মেসি যদি জাদুকরী কিছু করে বসেন! তার আগে দেখি এবারের আর্জেন্টিনা দলটি কেমন, তার শক্তি কোথায়। ফুটবল পণ্ডিতরা দেখছেন চ্যাম্পিয়নদের সর্বাঙ্গে ফুটবলীয় শক্তির আস্ফালন। গতবারের বিশ্বকাপজয়ী দলটির দুই-তৃতীয়াংশ খেলোয়াড়ই রয়ে গেছেন এই দলে। আবারও আক্রমণের নেতৃত্ব দেবেন লিওনেল মেসি। ‘বুড়ো‘ হাড়ের ভেলকি এখনো অটুট। তার সঙ্গী হবেন হুলিয়ান আলভারেস, লাউতারো মার্তিনেস ও থিয়াগো আলমাদা, যিনি এই বিশ্বকাপের অন্যতম চমক হতে পারেন।
আর্জেন্টিনা আবার চমকালেও তার কৃতিত্ব দিতে হবে লিওনেল স্কালোনিকে। মেসির জাদুকরী কিংবা অন্যদের প্রতিভাকে সবুজ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার আসল কাজটি করেছেন এই কোচ। একটি অর্কেস্ট্রায় অনেক বড় এবং ভিন্ন ঘরানার গুণী শিল্পী থাকেন। লিওনেল মেসি নামের ‘সুরসম্রাট’ থাকার পরও আর্জেন্টিনা দলটির বাকি সুরগুলো ঠিকঠাক মিলছিল না আগে। স্কালোনি এসে প্রতিটি ফুটবলারকে তার নিজস্ব জায়গায় এমনভাবে বসিয়েছেন, সুবাদে সম্মিলিত পারফরম্যান্স রূপ নিয়েছে এক নিখুঁত সুরে। এই ‘সুরকার’-এর হাতেই রচিত হয়েছে আলবিসেলেস্তেদের ফুটবলের জয়গান। প্রায় আট বছরে একটি বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকা জিতে স্কালোনি এখন সিজার মিনোত্তি বা কার্লোস বিলার্দোর কাতারে।
এই সফল কোচের হাতে দলটির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি দেখে অনেকেই আর্জেন্টিনাকে আবার শিরোপার দাবিদার মানছেন। তবে বিনয়ী স্কালোনি বলছেন, ‘এটি খুবই জটিল এবং কঠিন একটি বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। এজন্য আমাদের খেলোয়াড়দের প্রস্তুত হতে হবে। কারণ সামনে যা আসছে, তা কঠিন। তবে সবসময় জয়ী হওয়া যায় না।’ তিনি যতই সমর্থকদের সতর্কবার্তা দিক, সবাই আর্জেন্টিনাকে রাখছে ‘সেরা তিনে’। ফ্রান্স ও স্পেনের সঙ্গে গতবারের চ্যাম্পিয়নরা।
প্রস্তুতির আলোয় ঝলমল করছে সব দল, স্বপ্নে ভরে উঠছে ফুটবলারদের চোখ। তবু বিশ্বকাপ এমন এক গল্প, যার শেষ অধ্যায় আগে থেকে কেউ পড়তে পারে না। ট্রফিটি কার হাতে উঠবে, সেই সিদ্ধান্ত যেন লেখা থাকে নিয়তির গোপন খাতায়
তাহলে কোয়ার্টার ফাইনালে এই চ্যাম্পিয়নদের হাতেই ব্রাজিল-বধ! সত্যি বললে, কারও কোনো ভবিষ্যদ্বাণীতে শিরোপা মিলছে না পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের। হাঙর, সুপার কম্পিউটার বা অর্থনীতিবিদের শিরোপা তথ্যে নেই আনচেলত্তির ব্রাজিল।
তা ছাড়া বিশ্বকাপের ইতিহাসেরও কিছু শিক্ষা আছে। আছে তার অদ্ভুত প্রথা। আগের ২২টি আসরে শিক্ষা হচ্ছে, কোনো দল বিদেশি কোচ দিয়ে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। এখনো পর্যন্ত আটটি দল শিরোপা জিতেছে, যেখানে সর্বোচ্চ পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল এবং দেশি কোচ দিয়েই। এই দলটিই এবার দেশি কোচ বাদ দিয়ে ক্লাব ফুটবলের সফল বিদেশি কোচকে নিয়েছে দলে। গত ২৪ বছর টানা ব্যর্থতার পর ইতালিয়ান ট্যাকটিশিয়ান কার্লো আনচেলত্তির হাত ধরেই এবার হেক্সা মিশন সফলের স্বপ্ন দেখছেন ব্রাজিলিয়ানরা। কিন্তু ইতিহাসের ওই প্রথা যে বাতিলের খাতায় ফেলে দিচ্ছে সেলেসাওদের বিদেশি কোচকে!
যার হাতে ইতিহাসের জন্ম, সেই তিনিই-বা কেন মন খারাপ করবেন বিশ্বকাপের পুরনো ধারা নিয়ে। তিনিই ক্লাব ফুটবলের একমাত্র কোচ, যার আছে পাঁচটি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার রেকর্ড। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগ জেতার রেকর্ডও একমাত্র তার। সুতরাং কার্লোর হাতেই সৃষ্টি হতে পারে নতুন ধারা। তিনি বিশ্বকাপে কোনো সুস্পষ্ট ফেভারিট দল দেখেন না, ‘প্রতিটি দলেরই সমস্যা ও দুর্বলতা আছে। শেষ পর্যন্ত যারা মানসিক দৃঢ়তা দেখাতে পারবে তারাই জিতবে বিশ্বকাপ।’ অর্থাৎ কাউকে তিনি এগিয়ে-পিছিয়ে রাখছেন না। আনচেলত্তির বিশ্বাস, শুধু প্রতিভা দিয়েই বড় অর্জন হয় না। সেলেসাও ফুটবলে প্রতিভার সঙ্গে ঠিকঠাক শৃঙ্খলা ও পরিশ্রম যোগ করে এই কোচ শীর্ষ ছোঁয়ার চেষ্টা করছেন।
দলটির ফরোয়ার্ড লাইন তারকা-খচিত হলেও রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠে অনেক খুঁত দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। চোটগ্রস্ত নেইমার দলে থাকলেও কতটুকু কী করতে পারবেন, বলা মুশকিল। কয়েক দিন পরপর ডাক্তার আপডেট দিচ্ছেন তার চোটের। এই মহাতারকা না থাকলে কী হতে পারে, তারও পরীক্ষা-নিরীক্ষা একরকম হয়ে গেছে ব্রাজিলের। দেশের মাঠে পানামাকে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপযাত্রা শুরু করে আরেক প্রস্তুতি ম্যাচে মিসরকেও হারিয়েছে ২-১ গোলে। হোক না প্রস্তুতি ম্যাচ, তারও আবেদন আছে। খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরছে, আশার সঞ্চার হচ্ছে সমর্থকদের মধ্যে। সব মিলিয়ে নেইমারহীন দলেও জেতার অভ্যাস তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে জনপ্রিয় ‘আকাশি-হলুদ’ ছেড়ে ইউরোপে চোখ রাখলে ফ্রান্স আর স্পেনকেই বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। ফ্রান্সের প্রথম একাদশ ও বেঞ্চ— দুটিই শক্তিশালী। এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, দেজিরে দুয়ে, চুয়ামেনি, মার্কুস থুরাম ও রায়ান শেরকি— এত প্রতিভাবান ফুটবলার একসঙ্গে দেখা যায় না কোনো দলে। কাতার বিশ্বকাপে অল্পের জন্য তাদের শিরোপা হাতছাড়া হয়েছিল। টানা দুই বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলা দলটিকে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। তাদের আছে ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী কোচ ও তারকারা। তবে একটা সংশয় হলো, ২০২৪ ইউরোতে তারা ছয় ম্যাচে করেছিল মাত্র ৪ গোল। আর অধিনায়ক ও তারকা এমবাপ্পের ওপর চাপ অনেক বেশি। আধুনিক যুগে সেরা ফুটবলারদের একজন হিসেবে নিজের অবস্থানকে পোক্ত করতে হলে এই ফরাসি স্ট্রাইকারকে চাপ-তাপ সরিয়ে ‘গোল মেশিন’ হয়ে উঠতে হবে।
এই ফ্রান্সের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়তে পারে স্পেন। এই দলে কোনো বড় দুর্বলতা নেই, টুর্নামেন্ট জেতার অভিজ্ঞতা আছে এবং কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানোর পথও তুলনামূলক সহজ। লা ফুয়েন্তের অধীনে স্প্যানিশ ফুটবল অর্কেস্ট্রা ঐকতানে বাজছে। তাদের ১১ জন খেলে নিঃস্বার্থভাবে, বল দখলে রেখে বার্সেলোনার মতো পাসিং ফুটবলটা খেলে পৌঁছে যায় গোলের লক্ষ্যে। গোলটা আসবে, তবে কার পা থেকে আসবে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। দুই উইংয়ে নিকো উইলিয়ামস ও ইয়ামাল তছনছ করে দেন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ।
মজাটা হলো, গোল ও অ্যাসিস্টে চমৎকার মৌসুম কাটানো হালের সেনসেশন ইয়ামালকে রেখে অনেকে পেদ্রির মধ্যে খুঁজছেন স্পেনের সম্ভাব্য বিশ্বজয়ের রহস্য। ইয়ামালের ড্রিবলটা হয়তো বেশি চোখে পড়ে, তবে পেদ্রির ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ও রক্ষণভেদি পাস হতে পারে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। কে জানে, ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারই হয়তো নিজের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের মঞ্চ বানাবেন ২০২৬ বিশ্বকাপকে।
নতুন প্রজন্মের আগমনে মঞ্চ বদলাচ্ছে, কিন্তু ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো এখনো থামেননি। যেন ভিনগ্রহের এক যোদ্ধা, সব জয় করেও যার তৃষ্ণা মেটেনি। বিশ্বকাপের অপূর্ণ স্বপ্নই এখনো তাকে লড়াইয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে।
এই পর্তুগিজ মহাতারকার মতো প্রতিবার ইংলিশরাও স্বপ্ন দেখেন, ‘ফুটবলের ঘরে ফেরা’র গান ধরে। এবারও গাইছেন সমস্বরে। কেইনের পায়ে গোল আছে, সাকার পায়ে জাদু আর বেলিংহামের চোখে ভবিষ্যতের আলো। থমাস টুখেলও জানেন পথ হারানো দলকে গন্তব্য চেনাতে। সবকিছুই যেন প্রস্তুত— নায়ক থেকে পার্শ্বনায়ক, পথপ্রদর্শক সবাই। কিন্তু ভাগ্য যে লুকোচুরি খেলছে, সে কি এবার হাত বাড়াবে? নাকি আরেকটি গ্রীষ্ম শেষে ইংল্যান্ড আবারও ফিরে তাকাবে আক্ষেপভরা চোখে!
প্রস্তুতির আলোয় ঝলমল করছে সব দল, স্বপ্নে ভরে উঠছে ফুটবলারদের চোখ। তবু বিশ্বকাপ এমন এক গল্প, যার শেষ অধ্যায় আগে থেকে কেউ পড়তে পারে না। ট্রফিটি কার হাতে উঠবে, সেই সিদ্ধান্ত যেন লেখা থাকে নিয়তির গোপন খাতায়।
লেখক: ক্রীড়া সম্পাদক, আগামীর সময়





