মেসির জাদুকরী গল্পের প্রথম নায়ক হোর্হে মেসি

হোর্হে মেসির মনে তখন কী ছিল? স্বপ্ন নাকি ভয়? ছেলেকে বড় ফুটবলার বানানোর স্বপ্ন নাকি ছেলের হরমোন চিকিৎসা নিয়ে ভয়?
ছেলে অসুস্থ, ব্যয়বহুল তার চিকিৎসা। এমন অবস্থায় কোনো বাবার পক্ষে বড় স্বপ্ন দেখা সম্ভব নয়। আগে তার চিকিৎসা, তারপর ছেলে যা হওয়ার হবে। তবে হোর্হে মেসি একটু অন্যভাবেই যেন ভেবেছিলেন। ছেলের পায়ে ফুটবল প্রতিভার ঝলক দেখে কেউ যদি তার হরমোন চিকিৎসার ভার নেয়। তার এই ভাবনাতেই ফুটবল শিল্পী মেসির জাদুকরী গল্পের শুরু। আর এই গল্পের প্রথম নায়ক লিওনেল মেসি নন; তার বাবা হোর্হে মেসি।
ছোট্ট মেসি তখন রোজারিওর মাঠে ফুটবল নিয়ে ছুটে বেড়ান। পায়ের সঙ্গে বলের অদ্ভুত এক বন্ধুত্ব, যা বিস্মিত করেছিল সবাইকে। কিন্তু সেই ছোট্ট শরীরেই ধরা পড়ল গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। প্রয়োজন চিকিৎসার। কিন্তু সেই চিকিৎসা ছিল ব্যয়বহুল। হোর্হে মেসিও সাধারণ এক চাকুরে, দীর্ঘদিন সন্তানের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে।
তিনি ছেলের ফুটবল প্রতিভাকে সামনে নিয়ে আসেন। কড়া নাড়েন বার্সেলোনার দরজায়। তার ভাবনাটা ছিল খুব সরল—যদি এই প্রতিভাবান ছেলেটির ফুটবল প্রশিক্ষণের সঙ্গে চিকিৎসাটাও চলতে পারে, তাহলে হয়তো মেসির ভবিষ্যৎটা বাঁচানো যাবে।
বার্সেলোনা এফসিও রাজি হয়ে যায়। ২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছরের ছেলেকে নিয়ে হোর্হে পাড়ি জমালেন বার্সেলোনায়। সেদিন হয়তো বাবার চোখে ছিল না ব্যালন ডি’অর। ছিল না বিশ্বকাপ। তিনি জানতেন না, এই ছোট্ট ছেলেটি একদিন ফুটবল নামের খেলাটির সংজ্ঞাই বদলে দেবে। শুধু জানতেন, তার ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে।
চিকিৎসার পাশাপাশি লা মাসিয়ায় ফুটবল প্রশিক্ষণও চলতে থাকে। হোর্হে আর্জেন্টিনা ছেড়ে চলে আসেন স্পেনে, থাকলেন ছেলের পাশে।
পরের গল্পটা যেন নিয়তির লেখা। রোজারিও’র ছোট্ট মাঠ থেকে বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্প। সেখান থেকে বিশ্ব ফুটবলের রাজমুকুট। একের পর এক রেকর্ড, অসংখ্য ট্রফি, আটটি ব্যালন ডি’অর, আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ—লিওনেল মেসি হয়ে উঠলেন এমন এক নাম, যার সঙ্গে ফুটবলের ইতিহাসকে আলাদা করে ভাবা কঠিন।
সবচেয়ে বড় কথা চিকিৎসা খরচ জোগাতে ছুটে চলা হোর্হে জানতেন না, একদিন এই ছেলে কোটি কোটি মানুষের স্বপ্নের নায়ক হয়ে উঠবে। তাই মেসির প্রতিটি অর্জনের আড়ালে, প্রতিটি উল্লাসের নেপথ্যে, প্রতিটি ট্রফির ঝলকে দেখা যায় একজন বাবার মুখ। বিশ্বকাপ চলাকালে সেই বাবার অসুস্থতা বেড়ে গেলে মেসি অঝোরে কাঁদেন। ‘পরিবারের কঠিন সময়ের’ কথা বলে অস্থির হয়ে উঠেন।
এই বাবাকে আজ কীভাবে বিদায় জানাবেন লিওনেল মেসি! তার শৈশবের ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ শোক বার্তায় লিখেছে, ‘হোর্হে ছিলেন এমনই এক স্তম্ভ, যিনি তার স্ত্রী সেলিয়াকে কুচিত্তিনিকে নিয়ে দূরদৃষ্টি ও ভালোবাসায় সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের পাশে ছিলেন।’
স্ত্রী সেলিয়া কুচিত্তিনির সঙ্গে মিলে তিনি শুধু একজন সন্তানের বেড়ে ওঠার সঙ্গী হননি। তিনি ছিলেন এমন এক স্বপ্নের নেপথ্য কারিগর, যে স্বপ্ন একদিন ছাপিয়ে গেছে ফুটবল নামের খেলাটিকেও।




