ফিফার দেশ সেরা ফুটবলার এখন স্পিকার

মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এখন জাতীয় সংসদের স্পিকার। ছবি: সংগৃহীত
তিনি রাজনীতিক। ছিলেন মন্ত্রীও। রণাঙ্গনের তুখোড় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও খ্যাতি আছে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের। তবে কাগজ-কলমে তিনিই বাংলাদেশের ইতিহাসেরই সেরা ফুটবলার। ফিফা বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের সেরা ফুটবলার হিসেবে সেন্টেনারি অর্ডার অব মেরিট সম্মাননা দিয়েছিল তাকে।
সেই মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এখন জাতীয় সংসদের স্পিকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে আজ স্পিকার পদে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভোলা–৩ আসনের এই সংসদ সদস্য। তিনি যে একসময় তুখোড় ফুটবলার ছিলেন, এমনকি দ্রুততম মানব হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের-সেই ইতিহাস অজানা অনেকের কাছেই।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ডাবল হ্যাটট্রিক তার
১৯৭৩ সালের ফুটবল লিগে ফায়ার সার্ভিসের বিপক্ষে মোহামেডানের হয়ে ৬ গোল করেছিলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। স্বাধীন বাংলাদেশে এই কীর্তি প্রথম তারই।
১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর আবাহনীর বিপক্ষে গোল করেছিলেন তিনি। আর সবমিলিয়ে আবাহনীর বিপক্ষে ১০ ম্যাচে করেছেন ৭ গোল। ১৯৭৫ সালে ৪-০ ব্যবধানে আবাহনীকে হারানোর ম্যাচে স্মরণীয় একটি গোল আছে তার।
মোহামেডানের অর্ধ থেকে বল নিয়ে শুরু করেন দৌড়। আবাহনীর দুজন ছিল তার পেছনে। গতিতে পেছনে ফেলেন দুজনকেই। এরপর গোলরক্ষকের সামনে গিয়ে তার মাথার ওপর দিয়ে চিপ করে বল জড়ান জালে।
ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় দলের অধিনায়ক
১৯৬৭ সালে প্রথমবার পাকিস্তান জাতীয় দলে সুযোগ পান হাফিজ উদ্দিন। বাঙালিদের মধ্যে অন্যরা এক টুর্নামেন্টে সুযোগ পেলে অন্যটিতে হয়তো পেত না। তবে তিনি খেলেছেন টানা চার বছর।
মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় দল সর্বশেষ যে ম্যাচ খেলে ইরানে, সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। অথচ যুদ্ধের পর প্রথম যে বাংলাদেশ দল হলো ১৯৭৩ সালের মারদেকা ট্রফির জন্য, সেখানে নাম ছিল না হাফিজের। দল ঘোষণার সময় লিগের দুই ম্যাচে করেছিলেন ৭ গোল। তবু ডাকা হয়নি জাতীয় দলে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে লাল সবুজ জার্সিতে খেলাই হয়নি আর।
১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। ছবি : সংগৃহীত
সিএসএস পরীক্ষা না দিয়ে ফুটবল খেলতে মিয়ানমারে
চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবার বড় হাফিজ উদ্দিন। তার বাবা মরহুম ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ ( ’৬২, ’৬৫, ’৭০ সালে তিনবারের সংসদ সদস্য) চেয়েছিলেন ছেলেকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানাতে। অন্তত যেন সিএসএস (সেন্ট্রাল সুপিরয়র সার্ভিস) পরীক্ষা ছেলে দেয় সেই চাওয়া ছিল তার। কিন্তু ১৯৬৭ সালে সিএসএস পরীক্ষা শুরুর দিন জাতীয় দলের হয়ে হাফিজ উদ্দিন খেলতে যান বার্মায় (মিয়ানমার)। তার বাবার জীবনে সবচেয়ে বড় দুঃখ ছিল এটি।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং ১৯৬৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ফুটবল খেলতেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান দলের হয়ে। সেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান দল থেকে চারজন পরে মন্ত্রী হয়েছেন! আওয়ামী লীগের আবদুর রাজ্জাক, জাতীয় পার্টির সাত্তার, বিএনপি থেকে নাজমুল হুদা আর হাফিজ উদ্দিন।
মোহামেডানে খেলেছেন বিনা টাকায়
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ১৯৬২ সালে হাফিজ উদ্দিন নাম লেখান ফায়ার সার্ভিস ফুটবল দলে। পরের বছর ওয়ারীতে, এরপর আবার ফেরেন ফায়ার সার্ভিসে। ১৯৬৬ সালে যান ওয়ান্ডারার্সে, সেবার তার দল হয় লিগ রানার্স-আপ। ’৬৭ সালে যো্গ দেন স্বপ্নের ক্লাব মোহামেডানে। সাদা-কালো জার্সি পরার পর আর কখনও অন্য ক্লাবে যাননি।
১৯৬৭ সালে যোগ দেওয়ার সময় বাঙালি খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক ছয় হাজার টাকা পেয়েছিলেন হাফিজ উদ্দিন। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর মোহামেডান থেকে আর কোনও টাকা নেননি। ’৭৮ সালে অবসর নেওয়া পর্যন্ত প্রিয় ক্লাবে খেলেছেন বিনা পয়সায়।
পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব
পূর্ব পাকিস্তান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপেও রেকর্ড গড়েছিলেন হাফিজ উদ্দিন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত দৌড়েছেন তিনি। ১০০ মিটারে স্পর্শ করেন তখনকার সেরা টাইমিং ১১ সেকেন্ড। ২০০ মিটারের পূর্ব পাকিস্তানের রেকর্ডটিও লিখেছিলেন নতুন করে।
ছিলেন ম্যারাডোনাকে নিষিদ্ধ করার কমিটিতে
১৯৮০ সালে মোহামেডানের ম্যানেজার ছিলেন হাফিজ উদ্দিন। ১৯৮২ সালে হন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক। চার বছর পর ১৯৮৬ সালে দায়িত্ব নেন বাফুফের প্রেসিডেন্ট হিসেবে। সে দায়িত্বেও ছিলেন চার বছর। তার সময়েই এএফসির সঙ্গে পরিচয় হয় বাংলাদেশের। নির্বাচন করে এএফসির নির্বাহী কমিটির সদস্য, পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট হন তিনি। গিয়েছেন ফিফা কংগ্রেসেও। ১৯৯৪ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে নিষিদ্ধ মাদক নেওয়ার দায়ে যেবার বহিষ্কার করা হয়, সেবার তিনি ছিলেন ফিফা ডিসিপ্লিনারি কমিটিতে। ছয় মহাদেশ থেকে ছয় প্রতিনিধির মধ্যে এশিয়া থেকে ছিলেন হাফিজ উদ্দিন।
ফিফার শতাব্দী সেরার স্বীকৃতি
২০০৪ সালে ফিফার একশ বছর পূর্তি হয়। তখন ফিফা বিশ্বের সব দেশের কাছে আহ্বান জানায়, নিজেদের দেশের শতাব্দীর সেরা ফুটবলারের নাম পাঠানোর। এরপর ফিফা সেটি যাচাই-বাছাই করে স্বীকৃতি দেয়।
বাংলাদেশ থেকে পাঠানো হয় হাফিজ উদ্দিনের নাম। ফিফা যাচাই করে সেই স্বীকৃতি দেয় তাকে। ফিফার তখনকার ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন হাম্মাম বাংলাদেশে এসে স্বীকৃতির সার্টিফিকেট দিয়ে যান হাফিজকে।
পেলের নামে ছেলের নাম
ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলের ভক্ত ছিলেন মোহাম্মদ হাফিজ। ফিফা কংগ্রেসে পেলের সঙ্গে দেখা হয়েছে কয়েকবার। তখন থেকেই বন্ধু দুজন। তিনি বড় ছেলের নাম রাখেন পেলের নাম। ছেলের ডাকনাম ডিকো, পেলেরও তাই।

