তিকিতাকার সঙ্গে ফ্লিকের খুনে মেজাজে অপূর্ব বার্সা

লা লিগা শিরোপা জেতার পর এভাবেই হান্সি ফ্লিককে সম্মান জানান বার্সেলোনার খেলোয়াড়রা। ছবি: সংগৃহীত
নিভে গেল ক্যাম্প ন্যুর আলো। জ্বলে উঠল গ্যালারির হাজারো ক্যামেরার লাইট। আকাশ আলোকিত করছিল তখন রঙিন আতশবাজি। গোটা বার্সেলোনা হয়ে উঠল উৎসবের নগরী।
এমন সুখের দিন প্রায় শতবর্ষেও পাওয়া হয়নি কাতালানদের। রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়েই শিরোপা উদযাপন— আপনি ইউরোপিয়ান ফুটবলের টুকটাক খবর রাখা ব্যক্তি হলেও জানেন বার্সেলোনার কাছে এ রাতের মাহাত্ম্য কতটা। বছরের পর বছর ধরে শিরোপার যুদ্ধ যাদের সঙ্গে, রাজনৈতিক সমীকরণে চাপা উত্তেজনা যেখানে বিরাজ করে সবসময়, ফুটবল মাঠে যাদের আখ্যা দেওয়া হয় ‘চিরশ্রত্রু’— সেই রিয়ালের সামনেই শিরোপার আনন্দে কাতালুনিয়ার ক্লাবের ভেসে যাওয়া।
শিরোপা উৎসবে আলো-আঁধারের এ খেলার মাঝেই ক্যামেরা খুঁজে নিল একটি মুখ। তার নীলরঙা চোখ আতশবাজির আলোয় মিলেমিশে একাকার। জাদুর কাঠি হাতে ন্যু ক্যাম্পে এসে যিনি বদলে দিয়েছেন কাতালানদের ফুটবল-ভাগ্য। আর্থিক সংকট ও মাঠের ফুটবলের ব্যর্থতায় কোমায় যাওয়া বার্সেলোনায় দিয়েছেন অক্সিজেন সরবরাহ। তিনি হান্সি ফ্লিক।
এক জার্মান ম্যাজিশিয়ান
জার্মান ট্যাকটিশিয়ানের বার্সেলোনার কোচ হওয়ার খবর অনেকেই পারেননি হজম করতে। বার্সেলোনার ডিএনএ’র সঙ্গে কি তার ফুটবল-দর্শন যায়? ইয়োহান ক্রুইফ থেকে পেপ গার্দিওলা হয়ে পরের সময়টায় তিতিতাকা ফুটবলেই সাফল্য খুঁজেছে কাতালান ক্লাবটি। সেখানে ফ্লিকের পছন্দ আগ্রাসী ও ডিরেক্ট ফুটবল। আসলে কয়েক মৌসুমে সব হারানো বার্সেলোনা সাফল্য পেতে নিজেদের ফুটবল-দর্শন বিসর্জন দিতেও ছিল প্রস্তুত!
ফ্লিক তা করেননি। বার্সেলোনার ডিএনএ ধারণ করেই সাজিয়েছেন তার কৌশল। দায়িত্ব নিয়েই জানিয়েছিলেন ক্রুইফ ও গার্দিওলার কত বড় ভক্ত তিনি। তাদের ফুটবল-দর্শন ঠিক রেখেই গুছিয়ে নেবেন দলকে। ফ্লিকের ফুটবলে সেটাই ফুটে উঠতে থাকল। লা মাসিয়ার শক্তি কাজে লাগিয়ে তারুণ্যনির্ভর একটা দল গড়ে তুললেন। ডিরেক্ট ফুটবলে বার্সেলোনার অ্যাটাকিং মাইন্ড ধরে রেখে স্প্যানিশ ফুটবলে ফিরিয়ে আনলেন দলের হারানো গৌরব।
দায়িত্বের দুই মৌসুমেই ফ্লিক সফল। এ সময়ে ঘরোয়া ফুটবলের সম্ভাব্য ছয় শিরোপার পাঁচটিই জিতিয়েছেন বার্সাকে। সর্বশেষ এলো এবারের লা লিগা ট্রফি।
অপ্রতিরোধ্য বার্সেলোনা
লা লিগাকে ডাকা হয় ‘তিন রেসের ঘোড়া’। মূলত লড়াই হয় বার্সেলোনা ও রিয়ালের, সেখানে মাঝেমধ্যে উঁকি দেয় আতলেতিকো মাদ্রিদ। এবারের লা লিগায় কি কথাটা বলার সুযোগ আছে? না কোনো নাটক, না শেষের অপেক্ষা, না হলো পা হড়কানোর ঘটনা— রিয়ালকে ২-০ গোলে হারিয়ে ১৪ পয়েন্টে এগিয়ে থেকে শিরোপা নিশ্চিত করল কাতালানরা।
গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু ফ্লিকের দলের দাপট। টানা ১১ ম্যাচ জিতে লা লিগা ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে তারা। ঘরের মাঠে তো আরও দুর্বার। শতভাগ জয়ের রেকর্ড গড়ে শিরোপা উদযাপন। কোপা দেল রে’র সেমিফাইনাল থেকে বিদায় কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ছিটকে গেলেও লা লিগার নিয়ন্ত্রণ ছিল সবসময়। হিসাব বলছে, চলতি মৌসুমে বার্সেলোনা ৫৩ ম্যাচের ৪২টিতে জিতেছে। জয়ের হার ৭৯ শতাংশ। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে তাদের চেয়ে বেশি জয়ের হার শুধু বায়ার্ন মিউনিখের (৮৩ শতাংশ)।
ফ্লিকের বার্সেলোনা শুধু পয়েন্ট টেবিলেই দাপট দেখায়নি, পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপটেও প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। ফ্লিক যখন কাতালানদের কোচ হলেন, রিয়াল তখন সবে চ্যাম্পিয়নস লিগ ও লা লিগার শিরোপা উৎসব সেরে দলে যোগ করেছে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে। তারকাখচিত রিয়ালের সামনে বার্সেলোনার আরও কঠিন পরীক্ষায় পড়ার কথা। কিন্তু হলো উল্টো। রিয়ালের দাপট থামিয়ে উড়ে চলছে ফ্লিকের বার্সা।
ইয়ামালদের ওপর ফ্লিকের প্রভাব
কাতালানদের সাফল্যযাত্রায় সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে লা মাসিয়া। গার্দিওলার সেই সোনালি সময়ে একঝাঁক ‘লা মাসিয়ান’ যেভাবে ইতিহাস লিখেছিল, ফ্লিকের বার্সেলোনার কাণ্ডারিও দলটির এই একাডেমি। এখানে নিঃসন্দেহে সবার আগে আসবে লামিন ইয়ামালের নাম।
জার্মান কোচ ১৮ বছর বয়সী এ তরুণের ওপর ভরসা রেখেছেন। ফ্লিক এমনভাবে ট্যাকটিকস সাজিয়েছেন, যাতে করে ওয়ান টু ওয়ান পরিস্থিতিতে ইয়ামাল তার ড্রিবলিং ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজে লাগাতে পারেন।
মাঝমাঠ করেছেন আরও শানিত। শারীরিক শক্তির খেলায় বার্সেলোনাকে নিয়ে গেছেন অন্য পর্যায়ে। খেলোয়াড়দের তৈরি করেছেন সব পজিশনে খেলার জন্য। প্রয়োজনে যাতে ব্যবহার করা যায়।
সব মিলিয়ে বার্সায় এখন সুখের সংসার। সবাই একসুতোয় বাঁধা। যে সুতোর লাটাই হান্সি ফ্লিক।




