‘ও নিজেই শটটি নিতে চেয়েছিল’

ম্যাচ শেষে ব্রাজিলিয়ান সতীর্থ গ্যাব্রিয়েলকে স্বান্ত্বনা দিচ্ছেন পিএসজি অধিনায়ক মারকুইনহোস।
চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে টাইব্রেকার পর্বের তখন চরম মুহূর্ত। সাডেন ডেথের স্নায়ুচাপ যখন তুঙ্গে, তখন আর্সেনালের ডাগআউটে আলোচনা চলছিল- পরের পেনাল্টি শটটি কে নেবেন? বুকায়ো সাকা, মার্টিন ওডিগার্ড কিংবা কাই হাভার্টজের মতো নিয়মিত পেনাল্টি টেকাররা ততক্ষণে নিজেদের দায়িত্ব সেরে ফেলেছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বুক চিতিয়ে এগিয়ে এলেন এমন একজন, যিনি আর্সেনালের হয়ে এর আগে কখনো পেনাল্টি মারেননি। তিনি ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল ম্যাগালহেইস।
কোচ মিকেল আর্তেতা বারণ করেননি, কারণ শিষ্যের চোখে ছিল আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের শেষটা হলো চরম বিষাদে। গ্যাব্রিয়েলের নেওয়া শটটি পুসকাস অ্যারেনার গ্যালারিতে যখন আছড়ে পড়ল, তখন ইতিহাসে প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বপ্নও শেষ হয়ে গেল গানার্সদের। পিএসজি মেতে উঠল টানা দ্বিতীয়বার ইউরোপসেরা হওয়ার উল্লাসে।
ম্যাচ শেষে অবধারিতভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল, পেনাল্টির এমন মহাগুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েলের মতো একজন ডিফেন্ডারকে কেন পাঠানো হলো? সংবাদ সম্মেলনে কোচ মিকেল আর্তেতার সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘ও নিজেই শটটি নিতে চেয়েছিল। সাধারণ পরিস্থিতিতে বুকায়ো, মার্টিন এবং কাই আমাদের মূল পেনাল্টি টেকার। কিন্তু আমরা জানতাম ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে অন্য খেলোয়াড়দেরও সাহস করে সামনে এগিয়ে আসতে হবে। ও এই মুহূর্তটির জন্য অনুশীলনে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল, তাই আমি ওর ওপর ভরসা রেখেছিলাম।’
আর্তেতার সেই ভরসার প্রতিদান দিতে গিয়ে গ্যাব্রিয়েল উপহার দিলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক ট্র্যাজিক দৃশ্য। বল মিস করেই দুই হাতে মুখ ঢেকে যখন তিনি মাঠে বসে পড়লেন, ফুটবলপ্রেমীদের মনে পড়ে গেল ২০০৮ সালের মস্কোর ফাইনালের কথা। বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে সাবেক ডিফেন্ডার ম্যাট আপসন একে তুলনা করেছেন চেলসি কিংবদন্তি জন টেরির সেই বিখ্যাত পেনাল্টি মিসের সঙ্গে, ‘এটি পুরোপুরি জন টেরির সেই মুহূর্তটির মতোই নিষ্ঠুর রাত। একজন ডিফেন্ডার যখন ফাইনালে পেনাল্টি মিসের দায় মাথায় নিয়ে মাঠ ছাড়ে, তার চেয়ে কষ্টের আর কিছু হতে পারে না।’
অথচ টাইব্রেকারের আগপর্যন্ত এই ম্যাচটি হতে পারত গ্যাব্রিয়েলের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা রাত। ম্যাচের ৬ মিনিটে কাই হাভার্টজের গোলে আর্সেনাল এগিয়ে যাওয়ার পর পিএসজির বিশ্বসেরা আক্রমণভাগকে একাই সামলেছেন এই ব্রাজিলিয়ান। ওসমানে দেম্বেলে, খভিচা কভারাতসখেলিয়াদের একের পর এক আক্রমণ নসাৎ করে দিয়ে ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৩ বার বল ক্লিয়ার করেছেন তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধে দেম্বেলের পেনাল্টি গোলে পিএসজি সমতায় ফিরলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে এবং পরে টাইব্রেকারে। সেখানে আর্সেনালের এবারেশি এজে প্রথমে শট মিস করলেও গোলরক্ষক ডেভিড রায়া পিএসজির নুনো মেন্দেসের শট ঠেকিয়ে সমতা ফিরিয়েছিলেন। কিন্তু সাডেন ডেথের নাটকীয়তায় গ্যাব্রিয়েল যখন শট নিতে এলেন, তখন আর ভাগ্য সহায় হয়নি।
নিজের ইচ্ছায় শট নিতে গিয়ে খলনায়ক বনে গেলেও গ্যাব্রিয়েলের পাশে আছেন তার সতীর্থরা। ম্যাচ শেষে ডেক্লান রাইস বলেন, ‘চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে পেনাল্টি মিস করাটা অবশ্যই ভীষণ কষ্টের। তবে ও একা নয়, আমরা পুরো দল ওর পাশে আছি। গ্যাব্রিয়েলকে একজন মানুষ এবং খেলোয়াড় হিসেবে বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার জানা নেই। ও না থাকলে আমরা এবার প্রিমিয়ার লিগ জিততেই পারতাম না।’
সাবেক ফুটবলার নেদুম ওনোহাও পাশে দাঁড়িয়েছেন এই ডিফেন্ডারের, ‘অনুশীলনে পেনাল্টি নেওয়া আর চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে নেওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। গ্যাব্রিয়েল যে সাহস দেখিয়েছে, সেটাই বড় কথা। সে এবার পিএফএ প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার হওয়ার দৌড়ে আছে। সামনে ব্রাজিলের হয়ে বড় টুর্নামেন্ট রয়েছে, ও দ্রুতই এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠবে।’








