পিএসজি-আর্সেনালের মাঠ ও মগজের লড়াই

চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে মুখোমুখি পিএসজি-আর্সেনাল। ছবি: সংগৃহীত
ফেভারিট হয়েই চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে আর্সেনালের মুখোমুখি হবে পিএসজি। বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা কোচ লুইস এনরিকের ট্যাকটিক্সে প্রতিপক্ষকে চমকে দিয়েছে বারবার। মিকেল আর্তেতাও নিজের ফুটবল ফুটবল মস্তিষ্কে ভড়কে দেন প্রতিপক্ষকে। ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগের শিরোপাও জিতিয়েছেন আর্সেনালকে। আজকের ফাইনালে দুই দলের মাঠের পাশাপাশি মগজের লড়াইটাও তাই হতে যাচ্ছে উপভোগ্য।
অন্য রকম নাম্বার নাইন
গত মৌসুমে দুই দলের ম্যাচে আর্সেনাল হারলেও মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনোকে নাম্বার নাইন হিসেবে ব্যবহার করাটা নজর কেড়েছিল বেশ।
পিএসজি পরিচিত ম্যান-টু-ম্যান প্রেসিং করার ক্ষমতার জন্য। তারা পেছন থেকে খেলা গড়ে তোলার চেষ্টায় আর্সেনালের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। আর পজিশনাল প্লে-র একটি মূল নীতি হলো ফাঁকা থাকা খেলোয়াড়কে খুঁজে বের করা। যখন প্রতিপক্ষরা ম্যান-টু-ম্যান চাপ প্রয়োগ করে, তখন একজন ফাঁকা খেলোয়াড় খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যায়।
মেরিনো সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে বেশ নিচে নেমে আসায়, পিএসজির সেন্টার-ব্যাক উইলিয়ান পাচো তাকে অনুসরণ করছিলেন না, যা ফরাসি দলটিকে রক্ষণভাগে একজন অতিরিক্ত খেলোয়াড় রাখার সুযোগ করে দেয়।
তবে, স্ট্রাইকার না থাকায় আর্সেনালের মিডফিল্ডে একজন অতিরিক্ত খেলোয়াড় ছিল। আর্সেনালের তিনজন মিডফিল্ডারের ব্যাপারে সতর্ক থেকে পিএসজির তিনজন মিডফিল্ডার মাঝে মাঝে মেরিনোর দিকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু এতে আর্সেনালের আরেকজন মিডফিল্ডার ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিলেন, যা গানারদের আক্রমণে উঠতে সাহায্য করছিল। আর্তেতা আজকের ফাইনালেও নিতে পারেন একই রকম কৌশল।
ছোট জায়গায় খেলার সাহস
গত মৌসুমে, আর্সেনাল পিএসজির বিপক্ষে গোল করতে হিমশিম খেয়েছে, যার কারণ ছিল প্রায়শই জিয়ানলুইজি দোনারুম্মার অসাধারণ পারফরম্যান্স। পিএসজি এই মৌসুমে খুব বেশি গোল হজম করেনি, কিন্তু চেলসি, লঁস এবং বায়ার্ন মিউনিখ সবাই তাদের বিপক্ষে আক্রমণ করেছে অনায়াসে।
খেলোয়াড়দের একে অপরের কাছাকাছি রেখে, ঐ দলগুলো পিএসজি এবং তাদের ম্যান-মার্কারদের মাঠের উপরের দিকে ভিড়ের মধ্যে টেনে এনেছিল। তাতে মাঠের অন্যান্য অংশে খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমে যায়।
এই ভিড়ের জায়গাগুলো থেকে বলকে আরও খোলা জায়গায় ছেড়ে দেওয়া এমন একটি কৌশল যা দলগুলোকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পিএসজির রক্ষণ ভাঙতে সাহায্য করেছে, বিশেষ করে মাঝখান দিয়ে আক্রমণ করার সময়।
আর্সেনাল সাধারণত মাঝখান দিয়ে খেলা এড়িয়ে চলে, তারা নিরাপদ আক্রমণাত্মক খেলা এবং ক্রসের উপর বেশি মনোযোগ দেয়, কারণ মাঝখানে বল হারালে পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কিন্তু লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ড, হাভার্টজ, বুকায়ো সাকা, মার্টিন জুবিমেন্দি এবং এবেরেচি এজের মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে এই ঝুঁকিটা তারা নিতেও পারে, যারা চাপের মুখে কাছাকাছি খেলতে সক্ষম এবং যাদের সঙ্গে এমন খেলোয়াড়ও আছেন যারা মাঝখান থেকে আক্রমণ শেষ করতে পারেন।
পিএসজির সাবলীল আক্রমণ থামানো
পিএসজি খেলার পুরোটা সময় মাঠের কিছু নির্দিষ্ট জায়গা দখল করে রাখতে চায়, যার মধ্যে রয়েছে দুটি সেন্টার-ব্যাক পজিশন, দুই উইং এবং সেন্টার-ফরোয়ার্ড পজিশন। এই পজিশনগুলোতে কে যাচ্ছে, তা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই জায়গাগুলোতে বিভিন্ন খেলোয়াড়ের ঘন ঘন রোটেশন পিএসজিকে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের কাঠামো ভেঙে দিতে সাহায্য করে।
খিচা কাভারাস্কেইয়া স্বাভাবিকভাবেই বাম টাচলাইনের কাছে থাকেন। এখান থেকে, বল ছাড়া তার মুভমেন্ট চোখে পড়ে। বায়ার্নের বিপক্ষে প্রথম লেগে, দেজেরি দুয়ে আক্রমণভাগ থেকে বেশ নিচে নেমে এসেছিলেন – এটি একটি সাধারণ মুভমেন্ট। বায়ার্নের দায়োত উপামেকানো টাচলাইনের খুব কাছাকাছি না থাকায়, দুয়ে বল নিয়ে যথেষ্ট সময় পেয়েছিলেন। খিচা কাভারাস্কেইয়া পেছনে দৌড়ানোর ভান করেন, তারপর সামনে এগিয়ে আসেন, এরপর আবার পেছনে দৌড়ানোর চেষ্টা করেন, আবারও সামনে এগিয়ে আসেন এবং অবশেষে পেছনে দৌড়ে যান।
এই মুভমেন্টগুলো বায়ার্নের ফুল-ব্যাককে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এবং দুয়ে পেছন থেকে একটি পাস বাড়িয়ে দেন, যা পেয়ে তার সতীর্থ ভেতরে ঢুকে গোল করেন। পিএসজিকে নিষ্ক্রিয় করতে নির্দিষ্ট কৌশলে অটল থাকতে হবে আর্সেনালের। জিততে হলে খিচা কাভারাস্কেইয়াকে আটকাতে হবে আর্সেনালের। তিনি একাই গড়ে দিতে পারেন ম্যাচের ভাগ্য।
এর একটি উপায় হতে পারে, যারা পেছনে নেমে আসে তাদের খুব কড়া নজরে রাখা, যাতে তারা পেছনে দৌড়ে আসা খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করার সময় না পায়। অথবা তারা পেছনে সরে আসতে পারে, যার ফলে পিএসজি নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় বল পাবে কিন্তু তাদের রক্ষণভাগের পেছনের ফাঁকা জায়গা কমে যাবে।
গত মৌসুমে সেই প্রথম লেগে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর আর্তেতা তার দলের রক্ষণাত্মক কৌশলে পরিবর্তন এনেছিলেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি সমস্যা ছিল যা আমরা ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে সমাধান করে ফেলি, এবং তাতেই খেলার মোড় ঘুরে যায়।’
মাঠের উপরের দিকে প্রেসিংয়ে মার্টিন ওডেগার্ডের ভূমিকা বদলে যাওয়ায় পিএসজির পক্ষে তাদের মিডফিল্ডারদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল দেম্বেলের ওপর উইলিয়াম সালিবার বাড়তি চাপ ও মনোযোগ। দেম্বেলে অনেক পেছনে নেমে এলেও তিনি ম্যান-টু-ম্যান মার্কিং করছিলেন।
সেট পিস
পিএসজি এই মৌসুমে লিগে মাত্র ২৯টি গোল হজম করেছে, কিন্তু তার মধ্যে ছয়টি এসেছে পেনাল্টি ছাড়া সেট-পিস থেকে। এটি একটি সুস্পষ্ট দুর্বলতার জায়গা।
টটেনহাম এই মৌসুমে পিএসজির কাছে ৫-৩ গোলে হেরেছে। টটেনহামের তিন গোলের একটি এসেছিল কর্নার থেকে। আগস্টে উয়েফা সুপার কাপেও তারা পেনাল্টিতে হেরেছিল, যেখানে ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে ক্রস করা ফ্রি-কিক থেকে দুটি গোলই করেছিল টটেনহাম।
সেট-পিস থেকে করা তিনটি গোলের ক্ষেত্রেই, টটেনহাম প্রথমে ব্যাক পোস্টে বল পাঠিয়ে হেড করে কোনো সতীর্থের দিকে অথবা সরাসরি গোলের দিকে পাঠিয়েছে।
পিএসজি যখন রক্ষণাত্মকভাবে এগোয়, তখন তাদের মাথার উপর দিয়ে ভেসে আসা ক্রসগুলো সামলাতে অস্বস্তিতে পড়ে। এটা আর্সেনালকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনালের করা গোলগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশই এসেছে সেট-পিস থেকে।
চলতি টুর্নামেন্টে আর্সেনাল এখন পর্যন্ত অপরাজিত, তারা গোল খেয়েছে মাত্র ৬টি। গোলরক্ষক দাভিদ রায়া ৯ ম্যাচে কোনো গোল না খেয়ে (ক্লিন শিট) সর্বকালের রেকর্ড ছুঁয়েছেন। রক্ষণে তার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গ্যাব্রিয়েল ও উইলিয়াম সালিবা জুটি। টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জিততে এই রক্ষণ ভাঙ্গার কৌশল খুঁজে বের করতে হবে পিএসজিকে।






