ইতালির পথেই কি জার্মানি!

ইউলিয়ান নাগেলসমান, জার্মান কোচ
জার্মানদের বলা হতো যন্ত্র। সেই যন্ত্র আর কাজ করছে না। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা স্নায়ুর চাপ ধরে রেখে যেকোনো সময় ম্যাচের ফল বদলে দেওয়ার জন্য বিখ্যাত থাকলেও সেসব এখন সোনালি অতীত। ২০১৪ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর চাপের মুখে বারবার ভেঙে পড়েছে জার্মানি। টানা দুই বিশ্বকাপে তারা ছিটকে গেছে গ্রুপ পর্ব থেকে।
এবার কুরাসাওকে ৭-১ গোলে হারিয়ে শুরু করলেও টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, ততই বিবর্ণ হয়েছে তারা। প্যারাগুয়ের কাছে তো হেরেই গেল টাইব্রেকারে। অথচ বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এর আগে কখনোই টাইব্রেকারে হারেনি তারা। তাই প্রশ্ন উঠছে, চারবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালির পথেই হাঁটছে না তো জার্মানি? টানা তিনবার বিশ্বকাপেই জায়গা পায়নি ইতালি। জার্মানির ফুটবল আকাশে সেই শঙ্কার মেঘ কি জমতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে?
জার্মান সাবেক মিডফিল্ডার থমাস হিৎজলসপার্গার বিবিসি স্পোর্টসকে বলেই ফেলেছেন, ‘একটা সময় ছিল যখন অন্য দলগুলো জার্মানিকে ভয় পেত। মাঠে আমাদের একটা আলাদা দাপট ছিল। প্রতিপক্ষ এখন আমাদের সমীহ করে ঠিকই, কিন্তু কেউ আর ভয় পায় না। আমরা মাঠে সেই শারীরিক ফুটবল ও আগ্রাসন হারিয়ে ফেলেছি, যা আমাদের চেনা জার্মানি বানিয়েছিল।’
আমি এখানে কাজ করতে এসেছি আর ডিএফবি যদি অন্য কিছু ভাবে, তবে তাদের আমাকে জানানো উচিত। আমি মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো মানুষ নই -ইউলিয়ান নাগেলসমান, জার্মান কোচ
দলের ব্যর্থতায় জার্মান দৈনিক ‘বিল্ড’ প্রধান শিরোনামে লিখেছে, ‘জার্মান ফুটবলের আরেকটি দুঃস্বপ্ন’।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে দলের এমন পারফরম্যান্সের তীব্র সমালোচনা করে পত্রিকাটি আরও লিখেছে, ‘এটি বিপর্যয়কর পারফরম্যান্স। ধীরগতির, বিরক্তিকর আর নিস্তেজ।’
ম্যাচ শেষে কাই হাভার্টজের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, জার্মানি কি দ্বিতীয় সারির দলে পরিণত হয়েছে? তার জবাব, ‘হ্যাঁ, এখন তো নিশ্চিতভাবে সেটাই মনে হচ্ছে।’ জার্মানির এই বিদায়ের পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। কয়েকটা তুলে ধরা যাক।
খেলোয়াড়দের ব্যর্থতা: খেলোয়াড়রা মাঠে নিজেদের মেলে ধরতে পারেননি। অধিনায়ক জশুয়া কিমিচ ছিলেন নিষ্প্রভ। ফ্লেরিয়ান ভির্টস ক্লাবের বাজে ফর্ম জাতীয় দলেও টেনে এনেছেন। জামাল মুসিয়ালাকে দেখে মনে হচ্ছিল, দীর্ঘদিনের ইনজুরি কাটিয়ে তিনি এখনো ছন্দ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। দলের একতা ধরে রাখার জন্য যাদের পারফর্ম করা জরুরি ছিল, হতাশ করেছেন প্রায় সবাই।
রক্ষণে দুর্বলতা: দলগতভাবে জার্মানির রক্ষণভাগ ছিল ভঙ্গুর আর আক্রমণভাগে ছিল ধার ও কার্যকারিতার অভাব। এই টুর্নামেন্টে একটি ম্যাচেও তারা গোল না খেয়ে মাঠ ছাড়তে পারেনি। কুরাসাওয়ের বিপক্ষের ম্যাচটি ছাড়া বাকি ম্যাচগুলোয় ভালো খেলেও তারা ম্যাচ নিজেদের পক্ষে আনতে পারেনি।
ইনজুরির ছোবল: ইনজুরিও বড় একটা ধাক্কা ছিল। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই সার্জ জিনাব্রির ছিটকে যাওয়া ছিল বড় ধাক্কা। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে শিকাগোতে বায়ার্নের তরুণ তুর্কি লেনার্ট কার্ল গুরুতর ইনজুরিতে পড়েন, যিনি ডানপ্রান্তে ঝড় তোলার অপেক্ষায় ছিলেন। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয় আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে নিকো শ্লোটারবেক চোটে পড়ায়। কয়েক মাসের জন্য ছিটকে গেছেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের এই ডিফেন্ডার, যিনি জার্মানির আক্রমণ তৈরির অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন।
কোচের সিদ্ধান্ত: দায় আছে খোদ কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমানেরও। ৪০ বছর বয়সী মানুয়েল নয়ারকে দলে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তটি টাইব্রেকারে একটি সেভ করা ছাড়া কোনো জাদুকরী ভূমিকা রাখেনি। তার খেলোয়াড় বদলের সিদ্ধান্তগুলো দেখে মনে হচ্ছিল— তিনি নিজেই এখনো তার সেরা একাদশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ইকুয়েডরের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শীর্ষস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর তার আনা পরিবর্তনগুলো দলের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় এবং নকআউট পর্বের আগে দলের ছন্দ কেড়ে নেয়। এই জার্মান দলটিকে শিরোপার দাবিদার মনে করা হলেও নাগেলসমান এই স্কোয়াড থেকে সেরাটা বের করে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন।
নাগেলসমান কি বরখাস্ত হবেন?
নাগেলসমানের ভবিষ্যৎ কী, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। মাঠের পারফরম্যান্স বলছে তিনি বেশ ঝুঁকিতে আছেন, তবে সাম্প্রতিক ইতিহাস ইঙ্গিত দেয়, তিনি ২০২৮ ইউরো পর্যন্ত টিকে যেতে পারেন। হানসি ফ্লিক ও জোয়াকিম লো, দুজনই অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি সময় দায়িত্বে ছিলেন।
তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিলে তা জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জন্য ব্যয়বহুল হবে। কারণ, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেই নাগেলসমানের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। পরপর দুটি বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শুরু করা একটি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জন্য মাঠের এই বিপর্যয় এবং নতুন করে কোচ বরখাস্ত করার খরচ, বছরের শেষে তাদের হিসাবের খাতা মেলানো কঠিন করে তুলবে।




