পুঁজিবাজার শক্তিশালী হলে করপোরেট সুশাসন বাড়ে

অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অবস্থা শোচনীয়। অথচ শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। গবেষকরা পুঁজিবাজারের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন এরই মধ্যে, বাতলে দিয়েছেন সমাধানের পথ। এখন দরকার শুধু বাস্তবায়ন
বাংলাদেশে পুঁজিবাজার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছে। কখনো এই বাজার বিনিয়োগকারীদের আঘাত দিয়েছে, আবার কখনো কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, গত ১৫ বছরে কার্যত সংকুচিত হয়ে গেছে পুঁজিবাজার।
এই সংকোচনের একটি বড় সূচক হলো মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন, যা উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মানও কমেছে। আগে যেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীরা সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ করতেন, বিশেষ করে ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো— সেগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে, অর্থাৎ বিনিয়োগের উপযোগিতা হারিয়েছে।
খাতভিত্তিক চিত্রও উদ্বেগজনক। বিদ্যুৎ খাত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, ব্যাংক খাতে প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যাংকের শেয়ারে কার্যত লেনদেন নেই আর বীমা খাতের প্রায় ৫০ শতাংশ কোম্পানি প্রায় অচল অবস্থায় রয়েছে। সব মিলিয়ে বাজারে একটি গভীর আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।
এই আস্থাহীনতার পেছনে রয়েছে নানা অনিয়ম। কিছু কোম্পানির উদ্যোক্তা (স্পনসর) শেয়ার বিক্রি করে বিদেশে চলে গেছেন, অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে— এমন উদাহরণও কম নয়। আবার আইপিওতে অতিমূল্যায়ন (ওভারভ্যালুয়েশন), কৃত্রিম ভ্যালুয়েশন, বিভিন্ন ধরনের কারসাজি— এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যদিও সব কোম্পানি এমন নয়, তবে কিছু ঘটনার কারণে পুরো বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে।
ফলে পুঁজিবাজার অর্থনীতিকে প্রত্যাশিতভাবে কিছু দিতে পারেনি। অতীতে কিছু অবদান থাকলেও বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা হতে পারেননি আশ্বস্ত। এতে বাজারে এক ধরনের ভীতি-অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার পুঁজিবাজার নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এ সরকারকে সময় দিতে হবে; চার, পাঁচ বা ছয় মাসে দৃশ্যমান পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তবে ইতিবাচক দিক হলো অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থমন্ত্রী— সবাই এখন পুঁজিবাজার সম্পর্কে সচেতন এবং বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছেন। অর্থমন্ত্রী নিজেও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হওয়ায় বিষয়টি ভালো বোঝেন।
এরই মধ্যে একজন বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করছেন এবং বিদেশে বিনিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রমে যুক্ত আছেন। অর্থ উপদেষ্টাও অর্থনীতির মানুষ; তিনি বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে লেখালেখি ও সেমিনারে মতামত দিয়েছেন। ফলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জ্ঞানের ঘাটতি নেই।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে পুঁজিবাজারকে সম্প্রসারণ (এক্সপান্ড), অংশগ্রহণমূলক করা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা। এটি সময়সাপেক্ষ হলেও সঠিক পদক্ষেপ নিলে অগ্রগতি সম্ভব।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে পুঁজিবাজারকে সম্প্রসারণ, অংশগ্রহণমূলক করা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা। এটি সময়সাপেক্ষ হলেও সঠিক পদক্ষেপ নিলে অগ্রগতি সম্ভব
ভালো কোম্পানি বাজারে আনার জন্য এরই মধ্যে লাভজনক সরকারি কোম্পানিগুলোকে সরাসরি তালিকাভুক্ত (ডাইরেক্ট লিস্টিং) করার কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি এমন অনেক বিদেশি কোম্পানি রয়েছে, যারা বিদেশে বা ভারতে তালিকাভুক্ত কিন্তু বাংলাদেশে নয়; তাদেরও তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিষয়গুলো আগেও আলোচনায় ছিল কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমান সরকার বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছে। এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন।
এ ছাড়া ‘সুকুক’ ও বন্ডভিত্তিক সিকিউরিটাইজেশনের বিষয়টি সামনে এসেছে। পদ্মা সেতু, ঢাকা বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বিপরীতে সিকিউরিটি ইস্যু করে দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা গেলে সরকার বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। এতে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা সহজ হবে।
বর্তমানে এসব প্রকল্প থেকে যে টোল আদায় হচ্ছে, তা মূলত রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমে আগাম অর্থ সংগ্রহ করলে তা উন্নয়ন ব্যয়ে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট পণ্য দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে এটি সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি ক্যাশ ফ্লোভিত্তিক বন্ড বা সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
বর্তমানে বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা খুবই সীমিত— ৩০ থেকে ৫০টির বেশি নয়, যদিও তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৩০০-এর বেশি। ফলে প্রকৃত বিনিয়োগের সুযোগ খুব কম। এ কারণে বাজারে অনেক সময় ‘জাঙ্ক’ বা নিম্নমানের শেয়ারে লেনদেন বাড়ে, যা প্রকৃত বাজার নয়— এক ধরনের কৃত্রিম কার্যক্রম।
তাই বড় করপোরেট হাউজগুলো বাজারে আনা জরুরি। কিন্তু তারা সহজে আসতে চায় না। কারণ তারা অনেক সময় হিসাব গোপন করে ও কর ফাঁকি দেয়। পাশাপাশি পারিবারিক কাঠামোয় ব্যবসা পরিচালনা করে। তবে এই পারিবারিক ব্যবসার একটি বড় দুর্বলতা হলো— প্রতিষ্ঠাতা মারা গেলে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তৈরি হয় দ্বন্দ্ব এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসা।
অন্যদিকে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে শেয়ারহোল্ডার ডেমোক্রেসি তৈরি হয়। শেয়ারহোল্ডাররাই তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা হন এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে। বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলো এখন আর প্রতিষ্ঠাতাদের হাতে নেই— বিভিন্ন ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ও শেয়ারহোল্ডারদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনতে হলে কর-প্রণোদনা (ইনসেনটিভ) দিতে হবে। প্রয়োজনে ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক’ নীতি অনুসরণ করতে হবে, অর্থাৎ তালিকাভুক্ত হলে সুবিধা, না হলে অতিরিক্ত করের চাপ। অতীতে, বিশেষ করে ২০০৮ সালের আগে এ ধরনের কর-সুবিধা ছিল। পরে তা তুলে নেওয়া হয়েছে। এই সুবিধাগুলো পুনর্বহাল করা হলে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হবে।
পুঁজিবাজার শক্তিশালী হলে করপোরেট সুশাসন বাড়ে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং কর আদায়ও বৃদ্ধি পায়। মানুষকে অংশীদারত্বের সুযোগ দেওয়া যায়, যা অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে।
বর্তমানে বাজারের দৈনিক লেনদেন ৭০০–৮০০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা আগে আরও কমে গিয়েছিল। তবে সঠিক নীতি গ্রহণ করলে এটি ২ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। তখন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন এবং শিল্প-বাণিজ্যে অর্থের প্রবাহ বাড়বে।
অনেক বড় ব্যবসায়ী এখনো মনে করেন, পুঁজিবাজারে গেলে তাদের লাভ কী। কারণ, তারা পারিবারিক কাঠামোয় অভ্যস্ত। এই মানসিকতা পরিবর্তন করাও জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, পুঁজিবাজার ছাড়া শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ৬ শতাংশ বা তার বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে পুঁজিবাজার কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।
আসন্ন বাজেটে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে কর-প্রণোদনা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে বাজার সম্প্রসারিত হবে, অংশগ্রহণ বাড়বে এবং পুঁজিবাজার দেশের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।
লেখক: চেয়ারম্যান, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)





