নিষিদ্ধ দলের পুনরুত্থান হবে না, এটা বলা যাবে না

একসময়ের দাপুটে মুসলিম লীগের অস্তিত্ব নেই। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর কোনো কার্যক্রম ছিল না, আজ তারা সংসদে বিরোধী দলের আসনে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। নব্য গঠিত এনসিপি এখনো দুর্বল। গত চার দশকে অনেক দল জন্ম নিয়ে মারা গেছে আঁতুড়ঘরেই। ভবিষ্যতে কে থাকবে, কে হারিয়ে যাবে বলা মুশকিল।
বাংলাদেশ অনেক পুরনো দেশ। অনেক উত্থান-পতনের সাক্ষী এ দেশের জনগণ। বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এবং সে প্রক্রিয়া শেষে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে আমরা স্বাধীন হয়েছি। আজ এ পর্যায়ে এসে আমরা যদি একটা হিসাব করি, গত সাড়ে পাঁচ দশকে কতটুকু এগিয়েছি; তাহলে কিন্তু আমাদের অর্জনের ঝুড়িতে হতাশার ঝোলাটাকেই মনে হয় অনেক বড়। আমরা ষাটের দশকে যে ধরনের স্লোগান দিতাম, সেগুলো এখন নতুন করে দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখছি উল্টো যাত্রা। এর মধ্যে রাজনীতিতেও অনেক পরিমাণগত এবং গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। যেমন, একসময় রাজনৈতিক দল ছিল মুসলিম লীগ। দলটির রাজনৈতিক ভূমিকাতেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে মুসলিম লীগ হয়েছে নিঃশেষ। ১৯৫৪ সালের পর মুসলিম লীগকে তেমন খুঁজে পাওয়া যায় না। আইয়ুব খান তার সামরিক শাসনের সময় মুসলিম লীগকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে নিজে তার একটি অংশের প্রেসিডেন্ট হয়ে যান। আইয়ুব খানের পতনের সঙ্গে সঙ্গে সেই মুসলিম লীগ কয়েক টুকরো হয়ে যায়, এখন হারিকেন দিয়ে খুঁজলেও সেই অংশটি পাওয়া যাবে না। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ভেঙে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলো। ১৯৬৭ সালে ন্যাপ প্রথমবারের মতো ভাঙে। স্বাধীনতার পর ন্যাপ (মুজাফ্ফর) বাকশালে বিলীন হয়ে যায় আর ন্যাপে (ভাসানী) ভাঙনের ঘটনা ঘটে একাধিকবার। কাজী জাফরের নেতৃত্বে তরুণ বামপন্থী অংশটি বেরিয়ে যায়। সর্বশেষ মশিউর রহমান যাদু মিয়ার নেতৃত্বাধীন যে অংশটি ছিল, জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলে সেটি বিলীন হয় বিএনপিতেই। এভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাপের দুই অংশের বিলোপ ঘটে। পরে মুজাফ্ফর আহমদ তার অংশটি পুনর্গঠিত করলেও সেটি আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি, সেখানেও বিভিন্ন সময় ভাঙন ঘটে— কেউ একতা পার্টি, কেউ গেছে গণফোরামে, কয়েকজন মিলে করেছে গণতন্ত্রী দল; এখন আর সে অর্থে মোজাফ্ফর অংশটি খুঁজে পাওয়া যায় না।
স্বাধীনতার পর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) আত্মপ্রকাশের ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে আলোচিত ও সাড়া জাগানো। ১৯৭২ সালে তরুণদের নিয়ে তৈরি হওয়া এই দল ১৯৭৫ সাল-পরবর্তী ভাঙন প্রক্রিয়ার মধ্যে যায়; জাসদ ভেঙে প্রথমে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) গঠিত হয়। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে জাসদ ও বাসদ কয়েক টুকরো হয়ে যায়। এখন আর এদের রাজনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব নেই বললেই চলে। সামরিক স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে জাতীয় পার্টি গঠন করেছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট রাজনীতিতে শামিল হয়। জাতীয় পার্টিও কয়েক টুকরো হয়েছে। এভাবেই একটার পর একটা দল নির্দিষ্ট সময়ের পর রাজনীতির আবর্ত থেকে পড়েছে ছিটকে।
মানুষ সামনের দিকে যেতে চায়, পেছনের দিকে যেতে চায় না। আর সামনের দিকে যেতে হলে, আগামী ২০ বা ৫০ বছর পর আমরা কোথায় গিয়ে পৌঁছাব সেই রূপরেখাটা, পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। আমরা দেখছি না
জামায়াতে ইসলামীও অনেক পুরনো দল। এ পর্যন্ত তিন-চারবার নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তাদের পুনরুত্থান ঘটেছে বারবার। আওয়ামী লীগও কয়েকবার নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং নির্বাচন থেকে তাদের বিরত রাখে। বিএনপি সরকারও তা বহাল রেখেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের পেছনে আছে একটা বড় সমর্থক গোষ্ঠী। সুতরাং আইন করে নিষিদ্ধ করার ফলে যে দলটির পুনরুত্থান হবে না এটা যাবে না বলা। যেভাবে জামায়াতে ইসলামীর হয়েছে, সেভাবে হতে পারে আওয়ামী লীগেরও, যতক্ষণ পর্যন্ত এর পেছনে জনসমর্থক থাকবে।
জামায়াতে ইসলামী এখন প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে। বিএনপি এবং জামায়াত ছিল একসময় পরস্পরের সহযোগী। একসঙ্গে করেছে সরকার গঠন। বর্তমানে আওয়ামী লীগবিহীন রাজনীতিতে তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল কারণ হচ্ছে, তারা নির্বাচনের রাজনীতিতে পরস্পরের প্রধান প্রতিপক্ষ। এ জন্যই আমরা প্রায়ই দেখি, তাদের মধ্যে শব্দযুদ্ধ হয়। এখন প্রধান দল এই দুটি। নতুন দল এনসিপি এখনো শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি সেভাবে। যদিও তারা সংসদে আছে কিন্তু প্রভাবশালী হয়ে উঠতে অপেক্ষা করতে হবে; কারণ, তাদের রাজনীতিটা এখনো জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। মানে তারা আসলে কোন দিক থেকে বিএনপির বা জামায়াতে ইসলামীর থেকে আলাদা, এটা জনগণ বুঝতে পারছে না এখনো।
একদা প্রভাবশালী কিন্তু এখন মৃত, তেমন নেতাদের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে এখনো রাজনৈতিক দলগুলো তর্ক-বিতর্ক চালু রেখেছে কিন্তু যারা জীবিত আছেন তারা ভবিষ্যতে কী করবেন, সেটা নিয়ে আলোচনা খুব কম।
বাংলাদেশকে যদি টিকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে কিছু সামাজিক উপযোগিতা লাগবে। সামাজিক উপযোগিতা হলো, একটা জনগোষ্ঠী যেটাকে প্রতিনিধিত্ব করে সেই জনগোষ্ঠীর চাহিদা রাষ্ট্রের পূরণ করা। এ চাহিদা পূরণ করতে পারলে রাষ্ট্র টিকবে, না পারলে রাষ্ট্র টিকবে না। মানুষ সামনের দিকে যেতে চায়, পেছনের দিকে যেতে চায় না। আর সামনের দিকে যেতে হলে, আগামী ২০ বা ৫০ বছর পর আমরা কোথায় গিয়ে পৌঁছাব— সেই রূপরেখাটা, পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। আমরা দেখছি না।
২০৫০ সালে আমাদের অবস্থানটা কী হবে এ প্রশ্ন শুধু আমাদের নয়, সারা বিশ্বই তো পাল্টাচ্ছে। সেই পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে এটা নিয়ে কোনো বার্তা বা পরিকল্পনা পাওয়া যাচ্ছে না। বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নির্বাচনের সময় একটা ইশতেহার প্রকাশ করে, সেই ইশতেহারে কিছু ভাসাভাসা কথা থাকে কিন্তু সেটার কোনো পথরেখা থাকে না। কোনো সরকার যদি একটি বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করে, সেটি যদি ওই সরকার তাদের মেয়াদকালে শেষ করে না পারে যেতে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরবর্তী সরকার সেটা বাতিল করে দেয়। ২০৫০ সালে আমরা কোথায় পৌঁছাতে চাই, তার একটা রূপকল্প থাকতে হবে এবং সেই রূপকল্পের জন্য কর্মসূচি, বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও সময়ের পথরেখা— এ তিনটি জিনিস লাগবেই। এ তিনটি জিনিস যতদিন না আসবে ততদিন যাই বলা হোক না কেন, কোনো লাভ হবে না। মানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে সর্বাগ্রে যে জিনিসটি দরকার সেটা হচ্ছে— জাতীয় ঐকমত্য। যাতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হলেও পরিকল্পনাটি এগিয়ে নেওয়া যায়। এ বিষয়ে সবাইকে হতে হবে আন্তরিক। সেজন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে একটা রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। আমাদের সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর; এ সংসদে যারা থাকেন, তারা একটা পরিকল্পনার ব্যাপারে যদি নিজেরা একমত হন এবং সংসদের বাইরে যে জনগোষ্ঠী আছে, নাগরিক সমাজ আছে, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরে আলোচনা করে যদি একটা ঐকমত্য তৈরি করতে পারেন, তাহলে কিছুটা আশার আলো দেখা দিতে পারে। যদি রাজনৈতিক ঐকমত্যটা না থাকে, তাহলে পূর্ববর্তী সরকার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে— অর্থাৎ পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই তা মুখ থুবড়ে পড়বে এবং সেটা কারোরই কাম্য নয়।
লেখক: লেখক ও গবেষক





