কয়েকটি সিদ্ধান্তই মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে উচ্চশিক্ষার

স্বাধীনতার আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৫টি, এখন আছে ১৭৫টি। কিন্তু উচ্চশিক্ষার মান পড়েছে ব্যাপকভাবে। অথচ এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে রিসার্চ কিংবা টিচিং হিসেবে শ্রেণিবিন্যস্ত করে কিছু পদক্ষেপ নিলেই উচ্চশিক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার গন্তব্য হতে পারে বাংলাদেশ
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০৫০-৫১ সেশনে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম চলছে। আগস্ট থেকেই নতুন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হবে ক্যাম্পাস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তির আবেদন করছে। বিশেষ করে রিসার্চ ফোকাস বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। দেশি-বিদেশি স্বনামধন্য অধ্যাপকরা তাদের ভর্তির জন্য ভর্তি কমিটির কাছে রেফারেন্স লেটার লিখেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাগারে কয়েকশ পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো কাজ করছে। হাজার দশেক পিএইচডি শিক্ষার্থী নতুন নতুন গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত। প্রতিদিন ল্যাবগুলো থেকে নতুন নতুন পেটেন্টের আবেদন জমা দিচ্ছে। ফাইজার বা স্পেসএক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার জন্য যোগাযোগ করছে অধ্যাপকদের সঙ্গে। অ্যাপল, স্যামসাং কিংবা মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠান নতুন নতুন পণ্য বাজারে নিয়ে আসার জন্য রিসার্চ ল্যাবগুলোতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রতিবছর কয়েক হাজার শিক্ষার্থী বাংলাদেশে আসছে অনার্সে ভর্তির জন্য।
টাইম ম্যাগাজিনের এপ্রিল ২০৫০ সংখ্যায় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার এ অগ্রযাত্রা নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপিয়েছে। তারা বলছে, ‘২৫ বছর আগের কয়েকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার। সরকার জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দিয়ে উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিদেশি অধ্যাপকদের নিয়োগের দ্বার করেছে উন্মুক্ত। যথাযথ কাজের ব্যবস্থা করে বিদেশে চলে যাওয়া মেধাবীদের ৩৫ শতাংশ দেশে ফিরিয়ে এনেছে। তাদের হাত ধরে বাংলাদেশে চালু হয়েছে কয়েক হাজার স্টার্ট-আপ।
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বাংলাদেশি অধ্যাপকদের বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ল্যাব প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ হয়েছে লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি। মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোর্স-কারিকুলামে। যুগোপযোগী নতুন নতুন বিভাগ খুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকে রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে বিবেচনা না করে বিবেচনা করেছে শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রস্থল হিসেবে। গত বছর (২০৪৯ সালে) তারা উচ্চশিক্ষা খাতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি, পেটেন্ট ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোলাবরেশন থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। উচ্চশিক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ডেস্টিনেশন— ‘বাংলাদেশ’।
জিডিপির ২ শতাংশ উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে ইন্ডাস্ট্রির। তবেই গবেষণার ফল মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়-ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপের মাধ্যমে অর্থ প্রাপ্তির সুযোগও বাড়ানো যেতে পারে
ওপরে উল্লেখ করা ২০৫০ সালের বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভাবনাটা পুরোটাই কাল্পনিক। সম্প্রতি আমেরিকান এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের (AERA) বার্ষিক কনফারেন্সে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের উপস্থাপনা দেখতে দেখতেই মাথায় এমন ভাবনা আসে। তবে আমার অ্যাকাডেমিক ট্রেনিং ও কাজের অভিজ্ঞতায় এটাও বুঝি: ‘যতই নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়া হোক, প্রকৃত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব নয়।’
স্বাধীনতার আগে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা ১৭৫টি (৫৭টি পাবলিক, ১১৬টি প্রাইভেট ও ২টি আন্তর্জাতিক)। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। প্রায় ৩৩ হাজার শিক্ষক কর্মরত এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এ অগ্রযাত্রাকে দেখেন ভিন্নভাবে। তবে আমি দেখি একে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই। কারণ, আমি যে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখি, তা এই ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েই। আসল কাজ হচ্ছে, এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। এ অবস্থায় সবার আগে যে কাজটি করা দরকার তা হলো— এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে রিসার্চ ইউনিভার্সিটি বা টিচিং ইউনিভার্সিটি হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করে তাদের কর্মপরিসর ও কর্মপন্থা নির্ধারণ করা। নির্দিষ্ট মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করা।
রিসার্চ ইউনিভার্সিটিগুলোর গবেষণার মান উন্নয়নে নতুন ল্যাব প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিকমানের অধ্যাপকদের নিয়োগ দেওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার ধারণা স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নে এর বিকল্প নেই। গত কয়েক বছর বিভিন্ন কনফারেন্সে দেখলাম, সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি আমেরিকান গ্র্যাজুয়েটদের তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি হিসেবে নিয়োগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজন করছে চাকরি মেলার। হংকংয়ের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও করছে একই কাজ। তারা চায় আন্তর্জাতিকমানের অধ্যাপকরা আসুক তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাজ্যের পত্রিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাপা হতো। তখন পশ্চিমা বিশ্ব থেকে পূর্ব বাংলায় অনেকেই অধ্যাপনা করতে এসেছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে বিদেশি অধ্যাপক নিয়োগের ওই সুযোগ বন্ধ করে দেয়।
শিক্ষা-গবেষণা এক ধরনের বিশেষায়িত জ্ঞান। ক্রিকেটের বিশেষ জ্ঞান শেখাতে যেমন বিদেশি বিশেষায়িত কোচ দরকার, তেমনি শিক্ষা-গবেষণার বিশেষায়িত বিষয়গুলো শেখাতেও বিশেষায়িত অধ্যাপক জরুরি। এসব অধ্যাপক শুধু নতুন বিষয় শেখাবেনই না, তারা নতুন নতুন বিনিয়োগও নিয়ে আসবেন। ফলে তাদের হাত ধরেই অনেক নতুন ল্যাব বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে টিচিং ইউনিভার্সিটির কাজ উচ্চ মানসম্পন্ন অনার্স ডিগ্রি প্রদান করা। তাদের মূল কাজ হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম পরিচালনা করা। চাকরির বাজারের জন্য প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করা।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকা দেশের উচ্চশিক্ষাকে নিয়ে গেছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শিক্ষা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনার বাইরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসকের অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে তার পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মতামত বিবেচনা করা উচিত। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় শিল্পকারখানার মালিক, অ্যালামনাই, স্থানীয় নেতা, বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের কীভাবে সংযোগ ঘটাবেন, নিয়োগ কমিটির কাছে তার সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা তুলে ধরবেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসক।
প্রশাসকদের অন্যতম কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেবা সহজ করতে প্রশাসনিক কার্যক্রম অটোমেশন করা। যাতে শিক্ষার্থীরা বিড়ম্বনা ছাড়া সেবা পেতে পারে। আমরা যদি যোগ্য প্রশাসকদের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব তুলে দিতে পারি, তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঘুরে দাঁড়াবে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন নতুন বিষয়: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, নিউরো টেকনোলজি, ব্রেইন সায়েন্স, লানিং অ্যানালিটিকস ও অ্যাপ্লাইড ডেটা সায়েন্সের মতো বিষয় অফার করা জরুরি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের কোর্স-কারিকুলাম পরিমার্জন ও পরিবর্ধন জরুরি। শ্রেণিকক্ষে এসব বিষয় শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ওই বিষয়ে গবেষণার ল্যাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অধ্যাপকদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করা দরকার।
অধ্যাপকরা যদি তার নিজ বিষয়ভিত্তিক গবেষণার পদ্ধতিগত (ম্যাথোডলোজিক্যাল) বিষয়ে দক্ষ হন, তারা যদি তাদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে খুশি থাকেন এবং তাদের গবেষণা কাজের প্রতি নিজ থেকে আগ্রহী হন, তবে তারা গবেষণায় সফল হবেন। তারা সফল হলে বিশ্ববিদ্যালয়ও সফল হবে। তাদের গবেষণা দেখেই বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী হবে। বিশ্বের টপ র্যাংক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন ইন্টারডিসিপ্লিনারি গবেষণার দিকে জোর দিচ্ছে। তারা এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে এডুকেশন, হেলথ, ব্রেন সায়েন্স, কিংবা রোবোটিকসের মতো বিষয়গুলোর সমন্বয় করে গবেষণা করছে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা জরুরি।
২০৫০ সালের যেই স্বপ্নের কথা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, তা বাস্তবায়নে যা করতে হবে-
প্রথমত, জিডিপির ২ শতাংশ উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দের পাশাপাশি ৬ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির যোগাযোগ বাড়াতে হবে। তবেই গবেষণার ফল মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়-ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপের মাধ্যমে অর্থ প্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।
তৃতীয়ত, অ্যালামনাইদের সঙ্গে সংযোগ। বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর তাদের সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিশাল অঙ্কের ডোনেশন পায় এই যোগাযোগের মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে। কে কীভাবে সাহায্য করতে পারে, তা জানতে চায়। এভাবেও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে এরই মধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি লন্ডনে অবস্থানকালে খুব কাছ থেকেই হয়তো তার মেয়ের উচ্চশিক্ষার যাত্রাপথটি লক্ষ করেছেন। দেখেছেন বিশ্বের টপ ইউনিভার্সিটিগুলো কীভাবে কাজ করে। তিনি নিশ্চয়ই বোঝেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়তে হলে উচ্চশিক্ষার সংস্কারের বিকল্প নেই। তিনি কি আমাদের স্বপ্নের সারথি হবেন? তিনিই কি হবেন সেই নেতা, যার কথা ২৫ বছর পর আন্তর্জাতিক মিডিয়া স্মরণ করবে।
লেখক: অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর (উচ্চশিক্ষা), পার্ডু ইউনিভার্সিটি , ওয়েস্ট লাফিয়াত, ইন্ডিয়ানা, যুক্তরাষ্ট্র





