নেতাজি সুভাষ, রহস্যে ভরা যে মৃত্যু

অনেক ভারতীয় বিশ্বাস করেননি সুভাষ চন্দ্র বসু মারা গেছেন
উপমহাদেশের অবিসংবাদিত নেতা সুভাষ চন্দ্র বসু। নেতাজি নামেই তিনি পরিচিত। ভারত সরকারের কাগজপত্রে আজ তার মৃত্যুদিন। কিন্তু তার মৃত্যু নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। জাপানের সরকারি নিউজ এজেন্সি ডোমেই (Dōmei) প্রথম নেতাজির মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করে। ১৯৪৫ সালের ২৩ আগস্ট ডোমেই জানায়, Subhas Chandra Bose died at a Japanese military hospital at Taihoku (Taipei) on 18 August 1945 as a result of injuries sustained in an air crash.
১৮ আগস্টের বিমান দুর্ঘটনার সংবাদ পাঁচদিন পর প্রকাশ করায় সন্দেহের জন্ম দেয়। সংবাদে আরও বলা হয়, ‘Mr. Bose, head of the Provisional Government of Azad Hind, left Singapore on August 10, by air for Tokyo for talks with the Japanese Government. He was seriously injured when his plane crashed at Taihoku air field at 2 P. M. on August 18. He was given treatment in hospital in Japan where he died at midnight.
এই সংবাদের বরাত দিয়ে কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান, অমৃতবাজার পত্রিকা, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড ২৪ আগস্ট খবর প্রচার করে। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউ ইয়র্ক টাইম, রয়টার্সসহ বিশ্বের তাবৎ গণমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা সংবাদটি প্রচার করে। নেতাজির মৃত্যু সংবাদ শুনে মহাত্মা গান্ধী বিশ্বাস করেননি। কংগ্রেস সংবাদটি গ্রহণ করে। এদিকে জাতিসংঘ নেতাজির নাম যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। জাতিসংঘের তালিকায় নেতাজির নাম থাকায় প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি সুভাষ বেঁচে আছেন?
সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্ম ২৩ জানুয়ারি ১৮৯৭। বেঁচে থাকলে এখন তার বয়স হত ১২৯ বছর। মানুষ এতদিন বাঁচে না। শ্রীমঙ্গলের দুর্গম সীমান্ত এলাকা মেকানিছড়ার বাসিন্দা রাম সিং গড় সবচেয়ে বেশিদিন বেঁচেছেন। তার বয়স হয়েছিল ১১৯ বছর। সুভাষের যুদ্ধাপরাধীর মেয়াদ ২০২১ সালের পর জাতিসংঘ আর বাড়ায়নি। প্রথমে মেয়াদ ছিল ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত। পরে তা বাড়িয়ে ২০২১ সাল করা হয়। জাতিসংঘ জানিয়েছিল, ওই সময়ের মধ্যে নেতাজিকে যেখানে যে অবস্থায় পাওয়া যাবে, সেই অবস্থায় জাতিসংঘের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে তার কোনো লেখা বা গোপন দলিল ভারত সরকার বা কেউ প্রকাশ করতে পারবে না। এ বিষয়ে ভারত সরকারের কোনো বক্তব্য নেই। এমনকি ভারতের কোনো রাজ্য থেকেও আপত্তি তোলা হয়নি। ২০২১ সালের পর মেয়াদ না বাড়ায় ধরে নেওয়া যায় নেতাজি মারা গেছেন।
১৯৪২ সালেও একবার নেতাজির মৃত্যু হয়েছিল। ওই বছরের মার্চ মাসে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বার্লিন থেকে টোকিও যাওয়ার পথে সুভাষ বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। রয়টার্সের এ সংবাদ ভারতবাসীর মাঝে কোনো সাড়া ফেলতে পারেনি। কারণ যুদ্ধকালে অনেক ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচার করা হয়। সেগুলো মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এ সংবাদের জবাবে আনন্দবাজার পত্রিকা সম্পাদকীয় কলামে লেখে, ‘রয়টার্স পরকীয় সংবাদের ওপর নির্ভর করিয়া সুভাষচন্দ্রের মৃত্যু-সংবাদ ঘোষণা করিয়াছে। আমরা শোক-লিখন লিখিব না। সুভাষচন্দ্র দীর্ঘজীবী হউন।’ ওই মৃত্যু সংবাদের পর সুভাষ ঠিকই জীবিত ছিলেন। কিন্তু ১৯৪৫ সালের পর তিনি জীবিত ছিলেন কি না, সেই বিতর্কের শেষ হলো না আজও।
রয়টার্সের সংবাদ অসত্য প্রমাণ হলেও নেতাজি ঠিকই ওই সময় বার্লিন থেকে জাপান পৌঁছান। তখন বিমানপথ, নৌপথ জুড়ে ব্রিটিশ বাহিনীর দোর্দণ্ড প্রতাপ। সে বিষয়ে নেতাজি সজাগ ছিলেন। বার্লিন গিয়েছিলেন কলকাতার এলগিন রোডের বাড়িতে অন্তরীণ অবস্থা থেকে। দেশে তিনি মুক্ত থাকলে ব্রিটিশদের বিপদ হবে, তাই তাকে অন্তরীণ করা হয়। ৬১ জন গোয়েন্দার চোখ ফাঁকি দিয়ে ১৯৪১ সালের ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে বাড়ি থেকে বের হন। ভাইপোকে নিয়ে সড়কপথে গোমে স্টেশন। সেখান থেকে রেলপথে পেশোয়ার। তারপর পাহাড়ি দুর্গম ও বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যান কাবুল। কাবুল গিয়ে ইতালির পাসপোর্ট নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে ২৮ মার্চ পৌঁছে যান বার্লিন।
গোলাপী এখন সড়কে ...
১৮ আগস্ট ২০২৬
অন্তরীণ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় নয়, নেতাজি জার্মানি গিয়েছিলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভারতকে স্বাধীন করতে। জার্মানিতে গিয়ে হিটলারের সাথে আলাপ করেন। যুদ্ধে জার্মানির হাতে বন্দি ব্রিটিশ সৈন্যদের মধ্য থেকে ভারতীয়দের নিয়ে গড়ে তোলেন আজাদ হিন্দ বাহিনী, স্থাপন করেন আজাদ হিন্দ রেডিও-বার্লিন। রেডিওতে ভারতবাসীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। এই ঘোষণায় ব্রিটিশরা বুঝতে পারে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সুভাষ এখন বার্লিনে। সুভাষ পরিকল্পনা করেন আজাদ হিন্দ বাহিনী নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন-আফগানিস্তান হয়ে ভারতে প্রবেশ করবেন। তারপর ব্রিটিশদের তাড়িয়ে ভারত স্বাধীন করবেন। কিন্তু ২২ জুন হঠাৎ করেই হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে বসে। অথচ তাদের মধ্যে আক্রমণ চুক্তি ছিল। সুভাষ খুব চিন্তায় পড়ে যান।
এই সময়ে নেতাজি ডাক পান ভারতের আরেক স্বাধীনতাকামী নেতা রাস বিহারী বসুর। রাস বিহারী বসু ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লীগের নেতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত ছেড়ে জাপানে আশ্রয় নেন। তিনি জার্মানিতে সুভাষের কমকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পারেন। বয়সের ভারে বৃদ্ধ হয়ে গেছেন রাস বিহারী বসু। তার মনে হয়েছে, সুভাষ পারবে ভারতকে স্বাধীন করতে। তাই জার্মানিতে খবর পাঠান জাপানে এসে সুভাষকে ন্যাশনাল লীগের দায়িত্ব বুঝে নিতে। জার্মানি থেকে জাপান পৌঁছার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সেটা বুঝতে পেরেই সুভাষ হিটলারের সাহায্য নেন। তার কাছ থেকে সাবমেরিন নিয়ে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে জাপান পৌঁছান। পিএস আবেদ হাসানকে সঙ্গে নিয়ে ৯০ দিন সাবমেরিনে কাটাতে হয়। জার্মানি ছাড়ার খবর হয়তো ব্রিটিশরা জেনে গিয়েছিল। কিন্তু এত দীর্ঘ পথ সাবমেরিনে আসার কথা হয়তো ব্রিটিশরা চিন্তাও করতে পারেনি। রয়টার্স সেই মিথ্যা খবরটাই প্রচার করে।
সিঙ্গাপুর এসে সুভাষ পুরো যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। গঠন করেন ‘আজাদ হিন্দ সরকার’। ভারতের বাইরে এটাই প্রথম অস্থায়ী স্বাধীন সরকার। সুভাষ বসু সরকারের প্রধান। এখানেও ব্রিটিশ বাহিনীর আত্মসমর্পণকারী ৪৫ হাজার ভারতীয় সেনা নিয়ে গড়ে তোলেন ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আইএনএ)। সুভাষ সুপ্রিম কমান্ডার। এবার দিল্লি দখলের পরিকল্পনা করেন সুভাষ। আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে থাইল্যান্ড হয়ে মিয়ানমারের দুর্গম পাহাড়ি ও জঙ্গলের পথ পার হয়ে তার বাহিনী পৌঁছে যায় মণিপুরের ইম্পাল। সুভাষও যুদ্ধক্ষেত্রে। হঠাৎ তাকে জরুরিভিত্তিতে সিঙ্গাপুর ফিরে যাওয়ার জন্য বলা হয়। কারণ জাপান আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছে। দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মাঝেই সুভাষ সিঙ্গাপুর ফিরে আসেন।
সিঙ্গাপুর ফিরে সুভাষ তার সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন। ১৬ আগস্ট ১৯৪৫। সকাল সাড়ে ৯টা। বিমানে চেপে বসলেন সুভাষ। বিমান ছাড়ার আগে তিনি হুকুমনামায় লিখলেন, তার অনুপস্থিতিতে আজাদ হিন্দ প্রভেন্সিয়াল সরকার প্রধানের দায়িত্বে থাকবেন মেজর জেনারেল এম জেড কিয়ানি। বিকেল ৩টায় নেতাজি ব্যাংকক নামলেন। ১৭ আগস্ট ব্যাংকক থেকে সাইগন। সাথে আয়ার, কর্নেল হাবিবুর রহমান, প্রীতম সিং, গুলজার সিং, আবিদ হাসান ও দেবনাথ দাস। সবাই একটি বিমানেই যেতে পারতেন। কিন্তু জাপান সরকার আরও একটি বিমানের ব্যবস্থা করেছে। সে বিমানে যাবেন সুভাষ, কর্নেল হাবিবুর রহমান, প্রীতম সিং, আয়ার আর জাপানি কর্নেল কিয়ানো। অপরটিতে জেনারেল ইসোদা, হাচাইয়া, গুলজার সিং, আবিদ হাসান ও দেবনাথ দাস। বেলা ১০টায় সাইগন পৌঁছান।
হঠাৎ জাপানি লিয়াজোঁ অফিসার এসে হাজির। জানালেন এই মুহূর্তে একটি জাপানি বিমান ছাড়বে। একটি মাত্র সিট খালি আছে। এখনই নেতাজিকে বিমানবন্দর যেতে হবে। এই বিমানেই কেন যেতে হবে, কোথায় যাবেন? কোনো উত্তর নেই। সহকর্মীদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসলেন সুভাষ। পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করলেন। লিয়াজোঁ অফিসারকে বলে আরেকটি সিটের ব্যবস্থা করলেন। কর্নেল হাবিবুরকে নিয়ে নেতাজি বিমানে চেপে বসলেন। সাইগন থেকে হাইতো। তার আগে যাত্রবিরতি তুরান। তুরানে রাত্রিযাপন করলেন।
১৮ আগস্ট তুরান থেকে একটা বোমারু বিমানে চাপলেন নেতাজি। সাথে কর্নেল হাবিবুর। বিমানটি দুই ইঞ্জিনের স্যালি ৯৭.২ মডেলের। বিমানের লক্ষ্য হাইতো। হাইতো বিমানবন্দরে নামা হলো না। সেখান থেকে ফরমোজা দ্বীপের তাইহোকু। তাইহোকু থেকে দাইরেন যাবেন। তারপর? তারপর শুধুই প্রশ্ন, সবকিছুই অন্ধকারে ঢাকা। তারপর ২৩ আগস্ট জাপানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ডোমেই-এর সংবাদ।
নেতাজির মৃত্যু সংবাদের পর ব্রিটেন ও আমেরিকার সামরিক গোয়েন্দারা তদন্ত করে। তদন্তকালে তাদের সন্দেহ জাগে সুভাষ হয়তো বেঁচে আছেন। কিন্তু কীভাবে বাঁচলেন, কোথায় গেলেন— সে বিষয়ে তারা সুনিশ্চিত নয়। দেশ স্বাধীনের পর ভারত সরকার নেতাজির মৃত্যুর বিষয়ে তদন্ত করতে একটি কমিটি ও দুটি কমিশন গঠন করে। কিন্তু কূল-কিনারা করতে পারেনি তারা। ১৯৫৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সুভাষের সহযোদ্ধা শাহনওয়াজকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি হয়। শাহনেওয়াজ তখন কংগ্রেস নেতা। কমিটির সদস্য ছিলেন তিনজন। ১১ আগস্ট কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদন ১৮ আগস্ট বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষের মৃত্যু সমর্থন করে। দুইজন সদস্য এ বিষয়ে একমত, কিন্তু অপরজন ভিন্ন মত দেন। তিনি ছিলেন সুরেশ চন্দ্র বোস, সুভাষের বড় ভাই। এরপর বিতর্ক আরও বেড়ে যায়।
সংসদ সদস্য, গবেষক ও জনসাধারণ সুভাষের মৃত্যুর বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইন্দিরা সরকার নতুন করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের Commissions of Inquiry Act, 1952-এর অধীনে ১৯৭০ সালের ১১ জুলাই বিচারপতি গোপাল দাস খোসলাকে প্রধান করে এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিশন গঠন করে। ১৯৭৪ সালে দাখিল করা খোসলা কমিশনের প্রতিবেদন শাহনেওয়াজ কমিটির সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করে। দুটি প্রতিবেদনের পরও বিতর্ক শেষ হয় না। সুভাষের মৃত্যু নিয়ে ভারত জুড়ে বিতর্ক চলতেই থাকে।
অবশেষে ১৯৯৯ সালের ১৪ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির মনোজ কুমার মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন ২০০৫ সালের ৮ নভেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়। এ প্রতিবেদন ভারত জুড়ে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করে। মুখোপাধ্যায় কমিশন তার প্রতিবেদনে ৬৮টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। এতে বলা হয়, ১৮ আগস্ট ১৯৪৫ তাইহোকুতে (বর্তমানে তাইপে, তাইওয়ান) বিমান দুর্ঘটনার কোনো প্রমাণ মেলেনি। নেতাজি বেঁচে আছেন— এর সমর্থনেও কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কমিশন হাসপাতালের চিকিৎসা, নার্সদের বক্তব্য, নেতাজিকে দাহ করা, তার অস্থিভষ্ম সংগ্রহ, রেনকোজি মন্দিরের অস্থিভস্ম নেওয়ার বিষয়ে কোনো প্রমাণ পায়নি। সেই সাথে ডোমেই-এর সংবাদের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পায়নি। ২০০৬ সালের ১৭ মে ভারত সরকার (ইউপিএ সরকার) প্রতিবেদনটি সংসদে উপস্থাপন করে। সংসদ কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো প্রত্যাখ্যান করে। ফলে নেতাজির মৃত্যু রহস্য অজানাই থেকে যায়।
উপমহাদেশের রাজনীতিতে নেতাজি ছিলেন পুরোদস্তুর একজন অসাম্প্রদায়িক নেতা। ব্রিটিশদের কূটচাল সম্পর্কে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে ব্রিটিশরা ক্ষমতার মেয়াদ বাড়াতে চায়— এটা সুভাষ ভালো করেই জানতেন। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘পাখিদের মধ্যে কাক, পশুদের মধ্যে খেঁকশিয়াল, আর মানুষের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা সবচাইতে ধূর্ত ও নিষ্ঠুর। ভারত স্বাধীনের সময় সুভাষ নিরুদ্দেশ, অথবা মৃত। তিনি থাকলে হয়তো ভারত ভাগ হতে দিতেন না। সুভাষ পেয়েছিলেন জনগণের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসায় ভীত ছিল ব্রিটিশরা। উপমহাদেশে ব্রিটিশরা আসার আগে হাজার বছর সকল ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করে আসছে। ধর্মের কারণে মানুষে মানুষে সংঘাত-সংঘর্ষ হয়নি। ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত উপমহাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে সুভাষের কারণেই।
ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কিত দলিলের ষষ্ঠখণ্ডে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি লিখেছেন, ‘আজাদ হিন্দ সরকার, আজাদ হিন্দ ফৌজের যুদ্ধবন্দি ও বিচারকে কেন্দ্র করে সারাদেশের ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনা, রাজকীয় নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মধ্যে এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, এই পরিস্থিতিতে ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যতীত বিকল্প পথ ছিল না।’
ভারতের স্বাধীনতার সময়ে ক্লিমেন্ট এটলির এ লেখা সম্পর্কে ভারতবাসী জানতে পারেনি। রেডক্লিফের এক খোঁচায় একটি রাষ্ট্র তিনটি দেশ হয়ে গেল। দেশগুলো একে অপরের শত্রু হয়ে গেল। ব্রিটশি শাসনকাল থেকেই সাম্প্রদায়িক সংঘাতে অকাতরে সাধারণ মানুষ প্রাণ দিচ্ছে। তারা জানে না, কেন দেশভাগ হলো, কেনই বা তাদের বাস্তুভিটা ছেড়ে অন্যদেশে যেতে হবে। অথচ যারা দেশে ভাগ করে ক্ষমতায় গেলেন তারা কোনো বিপদের সম্মুখীন হলো না। সেই ধারা আজও চলছে তিনটি দেশেই। তিনটি দেশই আজ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঊর্বর ভূমি। এটাই ব্রিটিশ ধূর্ততা— যা সুভাষ বুঝেছিলেন। তাই তো এতদিন পরও সুভাষ প্রাসঙ্গিক হয়ে ফিরে আসে।










