আমার হৃদয়ে বাঁচো-২
অচেনা মানুষ আনিস রহমান

ইরাজ আহমেদ। স্কেচ: আগামীর সময়
আশির দশকের শুরুর দিকে তিনি হঠাৎ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের আলোচিত ‘আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি’ উপন্যাসের কপি হাতে ঘুরতে শুরু করলেন। মাঝে মাঝে আড্ডায় বলে উঠতেন এই লাইনটি। তখনই তাকে গলায় জড়াতে দেখা যেত ফিলিস্তিন গেরিলাদের স্কার্ফ ‘কুফিয়া’। তখন যে কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে যোগ দেয়ার তীব্র ইচ্ছা কাজ করত তার মধ্যে। চে গুয়েভারা তার কাছে ছিল সাচ্চা বিপ্লবী আর স্পার্টাকাস পৃথিবীতে প্রথম বিদ্রোহী। খুব ভালো হাত দেখতে পারতেন আবার শেক্সপিয়ারের হ্যামলেটের বহু সংলাপ ছিল তার মুখস্ত।
তিনি ছিলেন আনিস রহমান। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মেধাবী ছাত্র। পরে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ওই বিভাগেই। মাধ্যমিক থেকে শুরু করে এম.এ পরীক্ষা পর্যন্ত প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলেন। আশির দশকে গুণমুগ্ধ ছাত্র আর একদল তরুণ রাজনৈতিক কর্মী ছিল তার অনুসারী। মানুষের বিশেষ করে ছাত্র এবং অনুসারীদের গভীর ভালোবাসা পেয়েছিলেন তিনি। পেয়েছিলেন বলার কারণ হচ্ছে আনিস রহমান বেশ কয়েক বছর আগেই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তার বেঁচে থাকার সময়টা ছিল ভীষণ ভাবে জীবন্ত এবং উন্মাতাল।
এক নারীকে ভালোবাসতেন আনিস ভাই। কিন্তু সেই একপাক্ষিক গোপন প্রেম মাধবীলতাকে ছুঁতে পারেনি। শোনা যেত, নিয়মিত সেই রমণীকে প্রেমপত্র লিখতেন। কখনো ২৫ পৃষ্ঠার চিঠিও লিখেছেন
প্রায় বছর চল্লিশ আগে এক উন্মত্ত রোদ আছড়ে পড়া দুপুরে ক্যাম্পাসের রাস্তায় আমাকে পাকড়াও করে রিকশায় তুলে নিলেন আনিস ভাই। রিকশা কিছুদূর অগ্রসর হতেই আমাকে আটক করার কারণটা জানা গেল। তিনি টিএসসি’র মিলনায়তনে মাইকেল মধুসন দত্তের ‘মেঘনা বধ কাব্য’ মঞ্চস্থ করতে চান। তার কথায় খুবই উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলাম আমি। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই আমার সব উৎসাহ এক ফুৎকারে নিভেও যায়। তার ইচ্ছা, আমি রাবণের চরিত্রে অভিনয় করি। তার দৃষ্টিতে সেই জটিল চরিত্রে অভিনয় করার জন্য আমিই নাকি যথার্থ ব্যক্তি। মনে পড়ে, ভয় পেয়ে সেদিন রিকশা থেকে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য এরপরেই অনেকদিন তিনি আমাকে তাড়া করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমি রাজি হইনি।
তিনি তখন সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক। হঠাৎ একদিন দেখা গেল তাকে বিড়াল কোলে নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতে। কারণ জানতে চাইলে অম্লানবনে বলেছিলেন, তার ধারণা বিড়ালটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চাইতে বেশি জ্ঞানী। তাই প্রাণীটির যত্ন নিচ্ছেন। ততদিনে মেঘনাধ বধ কাব্য নিয়ে নাটক নির্মাণের ইচ্ছাটি তিরোহিত হয়েছিল।
এক নারীকে ভালোবাসতেন আনিস ভাই। কিন্তু সেই একপাক্ষিক গোপন প্রেম মাধবীলতাকে ছুঁতে পারেনি। শোনা যেত, নিয়মিত সেই রমণীকে প্রেমপত্র লিখতেন। কখনো ২৫ পৃষ্ঠার চিঠিও লিখেছেন। কিন্তু হেমন্তের অরণ্যের কোনো পোস্টম্যান চিঠিগুলো ঠিকানায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিল। চিঠিগুলো কখনো পোস্ট-ই করা হয়নি। গভীর ভালোবাসার শব্দে লেখা সব চিঠির শিরোনামে লেখা থাকত— ফ্রম দ্য বার্নিং ফ্রন্টিয়ার।
কিছু কিছু মানুষ পৃথিবীতে ঘোর সৃষ্টি করে চলে। তারে একাকী জীবন শেষ পর্যন্ত কোথাও নিজেকে জড়িয়ে ফেলে না কিন্তু অন্য অনেক মানুষকে জড়িয়ে ফেলে তার তৈরি ঘোরের রাজ্যে। আনিস ভাই তেমনি এক মানুষ ছিলেন। প্রায়শই ফরাসি কবি চার্লস বোল্যেরের সেই বিখ্যাত কবিতা ‘অচেনা মানুষ’র শেষ লাইন আবৃত্তি করতেন গভীর আবেগাক্রান্ত হয়ে— বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ কী ভালোবাস তুমি?
আমি ভালোবাসি মেঘ...চলিষ্ণু মেঘ...
আবার কখনো ‘হ্যামলেট’ থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। মানুষের মনের জটিল অবস্থা ব্যাখ্যা করতে তার কাছে জটিলতম এই রাজপুত্র চরিত্রটি ছিল অব্যর্থ ওষুধ। কিন্তু তিনি নিজেই নিজের কাছে ছিলেন ভীষণ অচেনা ও একা। হয়ত গভীর মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়েছিল তাকে। ভুগতে হয়েছিল অর্থকষ্টে। এক পর্যায়ে অনেকটাই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। ফলে তার ঘটনাবহুল জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি হারানোর ঘটনা। তখন আনিস ভাই বসবাস করতেন পুরান ঢাকার একটি আবাসিক হোটেলে। সেই উদভ্রান্ত এক সময়ে তার সঙ্গে নিয় দেখা হত। বিবর্ণ জামাকাপড় থাকত পরনে। কিন্তু তার মনের মধ্যে চিন্তার তীব্র প্রবাহ মৃত বলে ঘোষিত হয়নি। সেই সময়ে একদিন বলেছিলেন, স্ট্রিট লাইটের পোস্ট কেটে একটি বিশাল লোহার কলম তৈরি করবেন এবং ইট-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করবেন খাতা। ফরাসি বিপ্লবের জন্মদিনে সেই খাতা-কলম উদ্বোধন করা হবে শ্রমজীবী মানুষের হাতিয়ার হিসেবে।
এত কিছু ভাবতে ভাবতে এই জীবন থেকে হারিয়ে গেলেন আনিস রহমান। মৃত্যুর ঘূর্ণীপাক এসে তাকে নিয়ে গেল জীবনের ভিতর থেকে। এক কুয়াশায় মোড়া শীতের সকালকে ভীষণ বিপন্ন করে তুলেছিল তার মৃত্যু সংবাদ। নিজের গ্রামের বাড়িতে অসুস্থ হয়ে তিনি মারা যান। কিন্তু তার সঙ্গে কাটানো এক উজ্জ্বল সময়ের স্মৃতি রয়ে গেল মনের মধ্যে। আমাকে চমকে দিয়ে আনিস ভাই বিদায় নিয়েছেন চিরকালের জন্য। তিনি ভালোবেসেছিলেন শুধু মেঘ...চলিষ্ণু মেঘ। চেনা মানুষের গল্প এভাবেই ধীরে অচেনা হয়ে যায়। দিন যায় আমাদের।




