যে হ্রদে প্রাণী পাথর হয়ে যায়

উড়ে যেতে যেতে হঠাৎ পাথরে পরিণত হয়েছে প্রাণীটি
লালচে পানির ধারে পড়ে আছে একটি পাখি। ডানা ছড়ানো, ঠোঁট সামান্য ফাঁক। দেখলে মনে হয়, উড়ে যেতে যেতে হঠাৎ পাথরে পরিণত হয়েছে প্রাণীটি। আশপাশে তাকালে দেখা যাবে, একইভাবে পড়ে আছে আরও কিছু পাখি ও বাদুড়। তাদের শরীরের ভঙ্গি এতটাই স্বাভাবিক যে মনে হয়, এই বুঝি নড়েচড়ে উঠবে। কিন্তু সেগুলো নিথর। আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ার ন্যাট্রন হ্রদ ঘিরে এমন দৃশ্যই মানুষের মনে বিস্ময় জাগায়।
দূর থেকে হ্রদটির পানি কখনো লাল, কখনো কমলা আভায় দেখা যায়। চারপাশের শুষ্ক প্রান্তর আর অদ্ভুত রঙের পানি মিলে জায়গাটিকে করে তুলেছে রহস্যময়। তবে প্রাণীরা এখানে এসে সত্যিই জীবন্ত অবস্থায় পাথর হয়ে যায়- বিষয়টি তেমন নয়। হ্রদের পানি ও খনিজের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখে।
পানির মধ্যে লুকিয়ে থাকা রহস্য
ন্যাট্রন হ্রদের পানি অত্যন্ত ক্ষারীয়। এতে সোডিয়াম কার্বনেটসহ বিভিন্ন খনিজ পদার্থের উপস্থিতি রয়েছে। কিছু পরিস্থিতিতে পানির তাপমাত্রাও অনেক বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিবেশে প্রাণীদের টিকে থাকা কঠিন। কোনো প্রাণী হ্রদের পানিতে পড়ে মারা গেলে তার দেহে খনিজ পদার্থের আস্তরণ জমতে পারে। ফলে দেহটি শক্ত ও পাথরের মতো দেখায়। এ কারণেই হ্রদটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রাণীকে পাথর বানিয়ে দেওয়ার গল্প।
আলোকচিত্রী নিক ব্র্যান্ডটের তোলা কিছু ছবি এই রহস্যকে আরও পরিচিত করে তোলে। তিনি হ্রদের আশপাশে পাওয়া মৃত প্রাণীর দেহ সংগ্রহ করে সেগুলোকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন, যেন তারা জীবন্ত অবস্থায় রয়েছে। পরে সেই ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়লে ন্যাট্রন হ্রদ নিয়ে মানুষের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
মৃত্যুর মাঝেও জীবনের আয়োজন
ন্যাট্রন হ্রদকে শুধু প্রাণীর মৃত্যুর জায়গা ভাবলে ভুল হবে। এই প্রতিকূল পরিবেশই আবার এক বিশেষ পাখির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। লেসার ফ্লেমিঙ্গো নামে পরিচিত গোলাপি আভাযুক্ত পাখিরা এখানে প্রজনন করে। হ্রদের লবণাক্ত ও ক্ষারীয় পরিবেশে জন্মানো শৈবাল তাদের খাবারের অন্যতম উৎস। অন্য অনেক প্রাণীর জন্য প্রতিকূল হলেও এই পরিবেশ তাদের জীবনচক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একদিকে প্রাণীর দেহকে পাথরের মূর্তির মতো দেখানো খনিজের আস্তরণ, অন্যদিকে হাজার হাজার ফ্লেমিঙ্গোর আনাগোনা- ন্যাট্রন হ্রদে পাশাপাশি দেখা যায় প্রকৃতির দুই বিপরীত রূপ। যে জায়গাকে দেখে মনে হয় মৃত্যুর নীরব রাজ্য, সেখানেই আবার গড়ে ওঠে নতুন জীবনের আয়োজন। প্রকৃতির রহস্য সম্ভবত এখানেই- একই পরিবেশ কারও জন্য বিপজ্জনক, আবার কারও বেঁচে থাকার অবলম্বন।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন,লাইভ সায়েন্স




