ওসমান হাদির ভাইয়ের বিস্ফোরক মন্তব্য, উঠছে নানা প্রশ্ন

সংগৃহীত ছবি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া পরপর দুটি পোস্টকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির বড় ভাই ওমর বিন হাদি। পোস্ট দুটিতে অন্তর্বর্তী সরকার, বিএনপি এবং জামায়াতের কয়েকজন ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করার পর সামাজিক মাধ্যমে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
মঙ্গলবার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে ওমর হাদি দাবি করেন, ‘শহীদ ওসমান হাদির হত্যার সঙ্গে ইন্টেরিম সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি সরকারের কয়েকজন এমপি-মন্ত্রী সরাসরি জড়িত।’ পরে আরেকটি পোস্টে তিনি দাবি করেন, ‘শহীদ ওসমান হাদি হত্যার পটভূমি তৈরিতে জড়িত ছিলেন আমিরে জামায়াতের একজন পিএস। হাদিকে ঢাকা-৮ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের ওপর ব্যাপক চাপ দেওয়া হয়েছিল।’
পরপর দেওয়া এই দুই পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে জন্ম দিয়েছে ব্যাপক আলোচনার। বিভিন্ন মহল থেকে এসব দাবির পক্ষে তথ্য-প্রমাণ প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই পোস্টগুলোর তাৎপর্য কী।
পোস্টগুলো যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া হয়েছে, সেটি ওমর হাদির বলে নিশ্চিত করেছেন ইনকিলাব মঞ্চের একাধিক সংগঠক ও পরিবারের সদস্যরা। এর আগে একই অ্যাকাউন্ট থেকে ‘প্রয়োজনে তোমরা হাদির বউকে নিয়ে নাও, শুধু সন্তানটা আমাকে দিয়ে দেও’ এ ধরনের বিতর্কিত মন্তব্যও করতে দেখা যায় তাকে। ওমর বিন হাদিকে গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে দ্বিতীয় সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইনকিলাব মঞ্চের এক সংগঠক আগামীর সময়কে বলেন, ওসমান হাদির হত্যার বিচার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে নানা বিতর্ক। ওমর হাদির সাম্প্রতিক পোস্টগুলো সেই বিতর্ককে উসকে দিয়েছে আরও।
ইনকিলাব মঞ্চের আরেক সংগঠক আগামীর সময়কে বলেন, নিজ স্বার্থের জন্য ওসমান হাদিকে ব্যবহার করেছে ওমর বিন হাদি। ভাই হত্যার বিচার দাবির চেয়েও তার স্বার্থটাই বেশি করে দেখছেন তিনি। নিজ স্বার্থ বুঝে পাওয়ার পর এখন ওসমান হাদিকে নিয়ে করছেন বিদ্রুপ।
এদিকে সোমবার পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি বলেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছিল, সব জানি। বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে।’ একই বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং বিষয়টি প্রকাশ না করার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অনুরোধ এসেছিল।
মমতার বক্তব্যের সঙ্গে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা দেখা গেলেও সরাসরি কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি তিনি।
এই প্রেক্ষাপটে ওমর হাদির পরপর দুটি ফেসবুক পোস্ট নতুন করে জন্ম দিয়েছে বিতর্কের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টগুলোর উদ্দেশ্য ও সময় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তবে এ বিষয়ে ওমর হাদির কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন এমন দাবি ছাত্র অধিকার পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব রাকিবুল ইসলামের। দুটো ঘটনাকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে ফেসবুকে তিনি লিখেন, ‘যেখানে কলকাতার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে জড়িয়ে হাদি হত্যার বক্তব্য দিল সেখানে হাদির ভাই ২টা স্ট্যাটাস দিয়ে ১ম পোস্টে বিএনপি ও ইনটেরিম সরকারকে দায়ী করে এবং এরপর ২য় পোস্টে জামায়াতকে দায়ী করে পোস্ট করে।’
‘এখানে সে স্পষ্টত জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করছে। সে একবার বিএনপি ও ইন্টেরিমকে দোষ দিয়ে এক পক্ষের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে পরক্ষণেই আবার জামায়াতকে দায়ী করে অপর পক্ষের হাতেও অস্ত্র তুলে দিলেন। এতে করে ভারতকে দায় দিয়ে, অমিত শাহের উপর যে রাজনৈতিক প্রেশার তৈরি করা যেতো সেটা সে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে টেনে আনল এবং ভারতকে সেফ জোনে রেখে দিল।’
রাকিবের অভিযোগ, হাদির ভাই নিজেই হাদি হত্যায় জড়িত অথবা সে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ফাঁদে পড়ে ভারতকে সেফ জোনে রাখতে গোটা জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করছে।
আবু আফসান নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী লিখেছেন, ওসমান হাদির ভাই যেহেতু বিএনপি, জামায়াত এবং অন্তর্বর্তী সরকার সবার নাম নিয়েছেন এই বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক কিছু বের হতে পারে। সে নিজেও যদি জড়িত থাকে তাও উঠে আসবে।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড এবং এ-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো নিয়ে এখনো সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।





