ঈদের আনন্দ পূর্ণ হোক দরিদ্র প্রতিবেশীর মুখের হাসিতে

প্রতীকী ছবি
ঈদ মুসলমানের জন্য আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ভ্রাতৃত্বের উৎসব। এ দিন মানুষ নতুন পোশাক পরে, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে, সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করে এবং আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই আনন্দের অংশীদার হয় সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষও।
আজ আমাদের সমাজে এমন অনেক পরিবার আছে, যাদের ঘরে ঈদের দিনও পর্যাপ্ত খাবার থাকে না, শিশুদের নতুন পোশাক জোটে না, কিংবা কোরবানির গোশতের স্বাদ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয় অন্যের দয়ার ওপর। ধনী সমাজের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের পাশেই নীরবে লুকিয়ে থাকে তাদের দীর্ঘশ্বাস। অথচ ইসলাম এমন এক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে একজন মুসলমানের আনন্দ তার প্রতিবেশীর কষ্টের কারণ হবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ১১২)
এই হাদিস ইসলামের সামাজিক দায়িত্ববোধের এক গভীর শিক্ষা বহন করে। ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং এটি মানবিক সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায়েরও ধর্ম। তাই ঈদের দিনে প্রতিবেশীর হক আদায় করা কেবল নৈতিকতা নয়, বরং ঈমানি দায়িত্ব।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন ও নিকটবর্তী প্রতিবেশীর সঙ্গে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৩৬)
এ আয়াতে প্রতিবেশীর অধিকারকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় তার প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণে।
ঈদুল আজহার সময় এ দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কোরবানির অন্যতম শিক্ষা হলো ত্যাগ ও ভাগাভাগি। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রকে খাওয়াও।’ (সুরা হজ, আয়াত : ২৮)
অর্থাৎ কোরবানির গোশত শুধু নিজের ঘর ভরানোর জন্য নয়; বরং সমাজের দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যও। যে কোরবানির আনন্দ গরিব মানুষের ঘরে পৌঁছায় না, সে আনন্দ ইসলামের পূর্ণ চেতনা বহন করে না।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ ঈদের আনন্দ অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর সংস্কৃতিতে রূপ নিচ্ছে। কে কত দামী পোশাক পরল, কার বাসায় কত বড় আয়োজন হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার ছবি বেশি আলোচিত হলো, এসব নিয়ে ব্যস্ততা বাড়ছে। অথচ পাশের ঘরের অভাবী মানুষটির দিকে অনেক সময় নজরই দেওয়া হয় না। ইসলাম এই আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতাকে সমর্থন করে না।
হজরত উমর (রা.) বলতেন, ‘ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি ক্ষুধায় মারা যায়, তবে তার দায়িত্ব উমরের ওপর বর্তাবে।’ ইসলামের শাসন ও সমাজচিন্তার ভেতরে এমন গভীর মানবিকতা ছিল বলেই মুসলিম সভ্যতা একসময় মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
ঈদের দিন একজন দরিদ্র শিশুর হাতে নতুন পোশাক তুলে দেওয়া, কোনো অসহায় পরিবারের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া কিংবা নিঃসঙ্গ প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া কখনও কখনও বড় বড় আনুষ্ঠানিক ইবাদতের চেয়েও হৃদয়স্পর্শী হয়ে ওঠে। কারণ ইসলাম মানুষের হৃদয়ে আনন্দ পৌঁছে দেওয়াকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কোনো মুসলমানের হৃদয়ে আনন্দ প্রবেশ করানো।; (আত-তাবারানি, আল-মু‘জামুল আওসাত, হাদিস : ৬১৯২)
ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই, যখন ধনী-গরিবের ব্যবধান কিছুটা হলেও কমে আসে, যখন সমাজের অবহেলিত মানুষও অনুভব করে যে, তারাও এই আনন্দের অংশ। একজন মুসলমানের ঘরে ঈদের খুশি পূর্ণতা পায় তখনই, যখন তার প্রতিবেশীর ঘরেও অন্তত একটি হাসি ফুটে।
আজ প্রয়োজন ঈদকে কেবল ভোগের উৎসব না বানিয়ে মানবিকতার উৎসবে পরিণত করা। কোরবানির রক্তের চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি মূল্যবান মানুষের অন্তরের তাকওয়া, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ।
ঈদের সকালে নতুন পোশাকের চেয়েও সুন্দর দৃশ্য হলো, কোনো দরিদ্র মানুষের মুখে ফুটে ওঠা প্রশান্তির হাসি। আর সেই হাসির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য ও ইসলামের নির্মল মানবতা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






