ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি নবীজির অভূতপূর্ব মানবিকতা

প্রতীকী ছবি
মানুষের পরিচয় তার ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কিংবা ভাষায় সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা আছে, অধিকার আছে এবং সেই মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বও আছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন এ মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে তাঁর আচরণ ছিল ন্যায়, সহমর্মিতা, সৌজন্য ও মর্যাদাবোধে পরিপূর্ণ। তিনি ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, কিন্তু মানুষের প্রতি মানবিক আচরণকে কখনো ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল করেননি।
মদিনায় হিজরতের পর মহানবী (সা.) যে সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন; সেখানে মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও বসবাস করত। মদিনার সনদে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতার অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘ইহুদিদের ধর্ম তাদের জন্য এবং মুসলিমদের ধর্ম মুসলিমদের জন্য।’ (ইবন হিশাম, আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, ২/১৪৭-১৫০)। এটি ছিল বহুধর্মীয় সমাজে সহাবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
মহানবী (সা.)-এর মানবিকতার একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা ঘটেছিল এক ইহুদির জানাজা অতিক্রম করার সময়। ইহুদির মরদেহ পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। সাহাবিরা বললেন, এটি তো একজন ইহুদির জানাজা। তখন তিনি বললেন, ‘সে কি মানুষ নয়?’ (বুখারি, হাদিস : ১৩১২; মুসলিম, হাদিস : ৯৬১)। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও একজন মানুষের মৃত্যুকে তিনি মানবিক মর্যাদার বিষয় হিসেবে দেখেছেন। এই ছোট্ট ঘটনাটিই তাঁর মানবিক দর্শনের গভীরতা প্রকাশ করে।
একবার এক ইহুদি ব্যক্তি তাঁর কাছে পাওনা আদায়ের জন্য কঠোর ভাষায় কথা বলেছিল। সাহাবিরা তার আচরণে ক্ষুব্ধ হলে নবীজি (সা.) তাদের থামিয়ে দেন এবং পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি তাকে অতিরিক্ত কিছু দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘তার অধিকার তাকে দিয়ে দাও এবং তাকে কিছু অতিরিক্ত দাও।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৩০৩)। অর্থাৎ বিরোধ বা কঠোর আচরণও তাঁর ন্যায়বোধ ও সৌজন্যকে অতিক্রম করতে পারেনি।
পবিত্র কোরআনও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ন্যায় ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।’ (সুরা মুমতাহিনা, ৬০:৮)। মহানবী (সা.) এই নীতিকে নিজ জীবনে বাস্তব রূপ দিয়েছেন।
তাঁর মানবিকতা শুধু ব্যক্তিগত আচরণে সীমাবদ্ধ ছিল না; রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নীতিতেও এর প্রতিফলন ঘটেছিল। তিনি অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘আমর (রা.) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জিম্মীকে কতল করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না। যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতে পাওয়া যাবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩১৬৬)
আজকের পৃথিবীতে ধর্মীয় বিভাজন, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার বিস্তার যখন মানুষের শান্তিকে বিপন্ন করছে, তখন মহানবী (সা.)-এর জীবন আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল নৈতিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। মতের ভিন্নতা থাকবে, বিশ্বাসের পার্থক্য থাকবে; কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা, তার অধিকার রক্ষা করা এবং ন্যায় ও সদাচরণ বজায় রাখাই মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ। তাঁর মানবিকতার সৌন্দর্য এখানেই যে, তিনি ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষকেও মর্যাদার চোখে দেখেছেন এবং শিখিয়েছেন, মানবিকতা কোনো সম্প্রদায়ের একচেটিয়া সম্পদ নয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






