মানুষের কষ্ট দেয়ার ভয়াবহ পরিণতি

প্রতীকী ছবি
মানুষ সামাজিক জীব। একে অপরের সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়েই সমাজ ও সভ্যতা গড়ে ওঠে। ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণকে ঈমানের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। তাই কাউকে কষ্ট দেওয়া, অপমান করা, হয়রানি করা বা তার অধিকার নষ্ট করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। অনেক সময় মানুষ নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের প্রতি যত্নবান হলেও নিজের কথা, আচরণ কিংবা ব্যবহারের মাধ্যমে অন্যের মনে যে আঘাত দিচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকে না। অথচ কিয়ামতের দিন মানুষের হক বা ‘হক্কুল ইবাদ’ সম্পর্কিত জবাবদিহি অত্যন্ত কঠিন হবে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, `আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কোনো অপরাধ ছাড়া কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট গুনাহের বোঝা বহন করে।‘ (সুরা আহযাব, আয়াত : ৫৮)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নিরপরাধ মানুষকে কষ্ট দেওয়া শুধু নৈতিক অপরাধ নয়; বরং এটি আল্লাহর দৃষ্টিতে স্পষ্ট গুনাহ। একজন মুসলমানের পরিচয়ই হলো, তার হাত ও মুখ থেকে অন্যরা নিরাপদ থাকবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান সে ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ১০)
বর্তমান সমাজে মানুষের কষ্ট দেওয়ার অসংখ্য রূপ দেখা যায়। কেউ কটূক্তি করে, কেউ গীবত ও অপবাদ দেয়, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেয়প্রতিপন্ন করে, কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্বলকে নির্যাতন করে। আবার অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান, প্রতিবেশী বা সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও মানুষের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। এসব আচরণকে অনেকেই ছোটখাটো বিষয় মনে করলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো মারাত্মক অপরাধ হতে পারে।
মানুষকে কষ্ট দেওয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির কথা এসেছে ‘মুফলিস’ বা দেউলিয়া ব্যক্তির হাদিসে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো, নিঃস্ব ব্যক্তি কে?’ তারা বললেন, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব হলো সে, যার অর্থ-সম্পদ নেই। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমার উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব হলো সে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্তপাত ঘটিয়েছে কিংবা কাউকে প্রহার করেছে। ফলে তার নেক আমলগুলো তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যদি পাওনাদারদের দাবি অবশিষ্ট থাকে, তবে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮১)
এই হাদিস আমাদের সামনে এক ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরে। শুধু ইবাদত করলেই হবে না; মানুষের হক আদায় করাও জরুরি। কারণ আল্লাহ তাআলা নিজের হক ইচ্ছা করলে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু বান্দার হক আদায় না হলে তার নিষ্পত্তি হবে কিয়ামতের ময়দানে।
বিশেষভাবে দুর্বল, অসহায় ও মজলুম মানুষের কষ্ট দেওয়া আরও ভয়াবহ অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মজলুমের দোয়াকে ভয় করো। কেননা তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৮) একজন অত্যাচারিত মানুষের আর্তনাদ সরাসরি আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বহু শক্তিশালী শাসক ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি মজলুমের অভিশাপে ধ্বংস হয়েছে।
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারেও ইসলামের কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়; আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়; আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়।’ জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, ‘যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৬)
এমনকি পশুপাখির প্রতিও নিষ্ঠুর আচরণের শাস্তির কথা হাদিসে এসেছে। একটি বিড়ালকে না খাইয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার কারণে এক নারী জাহান্নামে যাবে বলে রাসুলুল্লাহ (সা.) উল্লেখ করেছেন। (বুখারি, হাদিস : ৩৩১৮) তাহলে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার অপরাধ কত গুরুতর হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি মানুষের জন্য কল্যাণকামী হবেন। তার কথা, আচরণ ও ব্যবহার অন্যদের শান্তি দেবে। তিনি কাউকে অপমান করবেন না, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন না, কষ্ট দেবেন না। কোরআন আমাদের শিক্ষা দেয়, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো ‘ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৮৩)
আজকের সমাজে অনেক দ্বন্দ্ব, কলহ ও সম্পর্কের অবনতির মূল কারণ হলো মানুষ মানুষের অনুভূতির মূল্যায়ন করতে শিখছে না। অথচ একটি হাসিমুখ, একটি সুন্দর কথা কিংবা একটি আন্তরিক আচরণ যেমন মানুষের হৃদয় জয় করতে পারে, তেমনি একটি কটূক্তি বা অবহেলাও কারও জীবনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে।
তাই আসুন! আমরা নিজেদের কথা, আচরণ ও ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতন হই। কাউকে কষ্ট দিয়ে নয়, বরং মানুষের উপকার করে, তাদের অধিকার রক্ষা করে এবং সুন্দর চরিত্রের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। মনে রাখতে হবে, মানুষের হৃদয় ভাঙা সহজ; কিন্তু সেই হৃদয়ের আর্তনাদ থেকে বাঁচা খুব কঠিন। কিয়ামতের দিনের কঠিন জবাবদিহির আগে আজই আমাদের নিজেদের সংশোধন করা প্রয়োজন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মানুষের হক আদায় এবং কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




