আগামীর সময়

আজ থেকেই শুরু মহিমান্বিত রাত কদরের সন্ধান

আজ থেকেই শুরু মহিমান্বিত রাত কদরের সন্ধান

প্রতীকী ছবি

রমজান মাসের দিনগুলো যেমন সিয়াম, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মুমিনের জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলে, তেমনি এর রাতগুলো হয়ে ওঠে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের অপূর্ব সুযোগ। কিন্তু রমজানের শেষ দশক এলে সেই রাতগুলোর মাহাত্ম্য যেন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ এই সময়েই লুকিয়ে আছে এমন এক রাত, যার মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও বেশি। সেটি হচ্ছে ‘লাইলাতুল কদর’।

আজ ২০ রমজানের দিন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে ২১ রমজানের রাত। আর এই রাত থেকেই শুরু হয়ে যায় সেই মহামূল্যবান রাতের অনুসন্ধান। একজন মুমিনের জন্য এটি শুধু একটি রাতের অপেক্ষা নয়; বরং এটি এমন এক আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা, যেখানে মানুষ আল্লাহর দরবারে নিজের হৃদয়, অশ্রু ও প্রার্থনা নিবেদন করে।

লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য বোঝাতে আল্লাহতাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন—
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ ۝ وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ ۝ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ
অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। তুমি কি জানো কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।” (সুরা আল-কদর, আয়াত : ১–৩)
একটি রাত, যার ইবাদতের সওয়াব হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি। এ যেন মানুষের সীমিত জীবনে অসীম কল্যাণ লাভের এক অপূর্ব সুযোগ। হিসাব করলে দেখা যায়, হাজার মাস প্রায় ৮৩ বছরেরও বেশি সময়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে এই রাতটি ইবাদতে কাটাবে, সে যেন একটি দীর্ঘ জীবনের সমপরিমাণ ইবাদতের সওয়াব লাভ করতে পারে।

পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে—
تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ ۝ سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ
অর্থাৎ, ‘সে রাতে ফেরেশতারা এবং রুহ (জিবরাইল) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিতে অবতীর্ণ হন প্রত্যেক বিষয়ের নির্দেশ নিয়ে। ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত সে রাত শান্তি ও কল্যাণময়।’ (সুরা আল-কদর, আয়াত : ৪–৫)
এ আয়াত আমাদের সামনে এক অপূর্ব দৃশ্য তুলে ধরে; রাতের নিস্তব্ধতায় পৃথিবীর আকাশ ভরে যায় ফেরেশতাদের আগমনে। তারা নিয়ে আসে রহমত, শান্তি ও বরকতের বার্তা। পুরো রাত যেন হয়ে ওঠে আসমানি অনুগ্রহে ভরা এক পবিত্র সময়।

মহানবী (সা.) উম্মতকে এই রাতের গুরুত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন করে বলেছেন—
وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদতে দাঁড়াবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারি, হাদিস: ২০১৪)
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আল্লাহর ক্ষমা। মানুষ ভুল করে, গুনাহে জড়িয়ে পড়ে, আবার অনুতপ্ত হয়। লাইলাতুল কদর সেই অনুতপ্ত হৃদয়ের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অসাধারণ সুযোগ—এক রাতের আন্তরিক তওবা ও ইবাদত বহু গুনাহ মুছে দিতে পারে।


তবে আল্লাহর অসীম হিকমতের কারণে এই রাতটি নির্দিষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং মহানবী (সা.) বলেছেন—
تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنْ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ
“তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।” (বুখারি, হাদিস: ২০১৭)
এই নির্দেশনার মধ্যেই রয়েছে এক গভীর শিক্ষা। যদি কদরের রাত নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো, তাহলে মানুষ হয়তো শুধু একটি রাতেই ইবাদতে ব্যস্ত হতো। কিন্তু এখন একজন মুমিন শেষ দশকের প্রতিটি রাতকেই মূল্যবান মনে করে এবং ইবাদতে মনোনিবেশ করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও আমরা এর বাস্তব দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। আয়েশা (রা.) বলেন,
كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ وَأَحْيَا لَيْلَهُ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ
“রমজানের শেষ দশক শুরু হলে নবী (সা.) নিজে রাত জেগে ইবাদত করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করতেন।” (বুখারি, হাদিস: ২০২৪)


এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো দোয়া ও ইস্তিগফার। আয়েশা (রা.) একবার নবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “যদি আমি কদরের রাত পেয়ে যাই, তখন কী দোয়া করব?” তিনি বললেন—
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
অর্থাৎ, “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন।” (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩) এই সংক্ষিপ্ত দোয়ার মধ্যে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা নিহিত আছে—আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহ।

আজকের রাত থেকে শুরু হচ্ছে সেই লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান। এটি কেবল একটি রাত খোঁজার চেষ্টা নয়; বরং নিজের হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার এক গভীর আধ্যাত্মিক যাত্রা।
যখন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ ঘুমে নিমগ্ন থাকবে, তখন কিছু সৌভাগ্যবান বান্দা হয়তো অশ্রুসজল চোখে আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে থাকবে। তারা কোরআন তিলাওয়াত করবে, সিজদায় মাথা নত করবে, নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাইবে। হয়তো সেই মুহূর্তেই আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে যাবে তাদের জন্য।

তাই আজকের রাত থেকে আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে নতুন এক প্রত্যাশা জাগা উচিত। হয়তো এই রাতগুলোর কোনো একটিতেই লুকিয়ে আছে সেই মহামূল্যবান রাত; যে রাত মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে, গুনাহ মুছে দিতে পারে এবং আখিরাতের জন্য অসীম কল্যাণের দ্বার খুলে দিতে পারে।
হয়তো আজ রাতই হতে পারে সেই রাত। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দান করুন।

লেখক : শিক্ষার্থী, এন আকন্দ কামিল মাদরাসা, নেত্রকোনা

    শেয়ার করুন: