দুশ্চিন্তা দূর করবেন কীভাবে, সমাধান কোরআনে
- অন্তরের প্রশান্তির গোপন চাবিকাঠি

জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ, আয়াত : ২৮)
মানুষের জীবনে অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ নতুন কিছু নয়। কেউ অর্থনৈতিক টানাপড়েনে ভুগছেন। কেউ সম্পর্কের জটিলতায় আটকে আছেন। আবার কেউ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়ছেন। এই বাস্তবতায় ইসলাম মানুষের অন্তরের প্রশান্তির জন্য পবিত্র কোরআনের নিচের এই আয়াতটিই হতে পারে সমাধানের অন্যতম একটি পথ। মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন,
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ, আয়াত : ২৮)
এই আয়াত মানুষের মানসিক চিকিৎসার একটি মৌলিক নীতি। যে অন্তর আল্লাহকে ভুলে যায়, সেই অন্তর যতই বাহ্যিকভাবে সুখী হোক, তার ভেতরে থাকে নানান রকমের অস্থিরতা। আর যে অন্তর আল্লাহকে স্মরণ করে, তার বাহ্যিক কষ্ট থাকলেও ভেতরে বিরাজ করে একধরনের স্থির স্বস্তি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ
‘যে তার প্রতিপালকের জিকির করে, আর যে জিকির করে না, তাদের উপমা হলো জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো। (বুখারি, হাদিস : ৬৪০৭)
এই হাদিসে স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে, জিকির শুধু একটি ইবাদত নয়; বরং এটি আত্মার জীবন। যে হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ নেই, সেই হৃদয় ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়, যদিও শরীর বেঁচে থাকে।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘অন্তরের কঠোরতা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আল্লাহর জিকির। জিকির যত বেশি হয়, অন্তর তত নরম হয়।’ (আল-ওয়াবিলুস সাইয়্যিব)
বাস্তবজীবনেও আমরা দেখি, মানুষ যখন একা থাকে বা কষ্টে পড়ে, তখন তার অন্তর সবচেয়ে বেশি অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই মুহূর্তে যদি সে আল্লাহকে স্মরণ করে, নামাজে দাঁড়ায়, দোয়া করে বা চুপচাপ সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলতে থাকে, ধীরে ধীরে তার ভেতরে একধরনের শান্ত পরশ তৈরি হয়। কারণ তখন সে নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার দিকে ফিরে যায়।
জিকিরের আরেকটি বড় দিক হলো, এটি মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে। যে অন্তর আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে, সেই অন্তর গুনাহের দিকে সহজে ঝুঁকে পড়ে না। কারণ তার ভেতরে একটি জীবন্ত সচেতনতা তৈরি হয়, আল্লাহ তাকে দেখছেন।
মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন,
وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
‘তোমরা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত : ১০)
এখানে শুধু দুনিয়ার ও আখিরাত উভয়জগতের সফলতাকেই বোঝায়। অর্থাৎ জিকির এমন একটি আমল, যা মানুষের জীবনকে শুধু মানসিকভাবে শান্ত করে না, বরং চূড়ান্ত সফলতার পথেও নিয়ে যায়।
জিকিরের একটি সুন্দর দিক হলো, এর জন্য কোনো বিশেষ সময়ের অপেক্ষা করতে হয় না। আলাদা করে সময় বের করতেও হয় না। মানুষ হাঁটতে হাঁটতে, কাজ করতে করতে, একা বসে বা ভিড়ের মাঝেও আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে। এ কারণে এটি এমন একটি ইবাদত, যা মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদতে পরিণত করার সুযোগ দেয়।
আধুনিক জীবনের জটিলতা যতই বাড়ুক, অন্তরের শান্তির পথ কিন্তু একটাই। বাহ্যিক সম্পদ, খ্যাতি বা সুযোগ-সুবিধা- সবকিছু থাকা সত্ত্বেও যদি অন্তর অশান্ত থাকে, তবে জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। আর সেই অন্তরকে শান্ত করার সবচেয়ে সহজ, গভীর ও নিশ্চিত উপায় হলো আল্লাহর জিকির।
যে অন্তর আল্লাহকে স্মরণ করে, সে কখনো একা নয়। আর যে অন্তর আল্লাহকে ভুলে যায়, সে ভিড়ের মাঝেও নিঃসঙ্গ।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




