সামাজিক মাধ্যমে আমরা কতটা নিরাপদ

সংগৃহীত ছবি
একসময় মানুষ প্রতিবেশীর ঘরে গিয়ে গল্প করত, আত্মীয়তার খোঁজ নিত, মুখোমুখি বসে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করত। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে সামাজিক মাধ্যম। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, এক্স কিংবা ইনস্টাগ্রাম আজ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সংবাদ, শিক্ষা, ব্যবসা, যোগাযোগ এমনকি দাওয়াতি কাজেও সামাজিক মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি এক ভয়ংকর অন্ধকারও ধীরে ধীরে সমাজকে গ্রাস করছে। প্রশ্ন হলো, সামাজিক মাধ্যমে আমরা আসলে কতটা নিরাপদ?
নিরাপত্তা বলতে শুধু আইডি হ্যাক হওয়া বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হওয়াকে বোঝায় না। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের ঈমান, চরিত্র, সম্মান, সময় ও মানসিক প্রশান্তিও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ সামাজিক মাধ্যম আজ এসব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে।
বর্তমান সময়ে গীবত, অপবাদ, বিদ্বেষ ও চরিত্রহনন সামাজিক মাধ্যমে ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। একজন মানুষ হয়তো সামান্য ভুল করল, আর মুহূর্তেই তাকে নিয়ে শুরু হয় উপহাস, ট্রল ও অপমান। অথচ ইসলাম মানুষের সম্মানকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা একে অপরের গীবত করো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)
একই সুরায় আল্লাহ আরও বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)
আজ সামাজিক মাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে। অনেক সময় একটি মিথ্যা পোস্ট মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেয়। কারও সম্মান নষ্ট হয়, পরিবার ভেঙে যায়, সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। ইসলাম তাই তথ্য প্রচারের আগে যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছে, যা বর্তমান ডিজিটাল যুগে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই-বাছাই ছাড়া) তা-ই প্রচার করে।’ (মুসলিম, ভূমিকা, হাদিস : ৫)
এই হাদিস যেন আজকের ‘শেয়ার’ ও ‘ফরোয়ার্ড’ সংস্কৃতির জন্য সরাসরি সতর্কবার্তা। না জেনে, না বুঝে একটি পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়াবহ গুনাহের কারণ হতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমের আরেকটি বড় বিপদ হলো অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়। অ্যালগরিদমভিত্তিক এই প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের দুর্বল প্রবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে ক্রমাগত এমন কনটেন্ট সামনে আনে, যা ঈমান ও চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা নূর, আয়াত : ৩০)
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘চোখ হলো হৃদয়ের দরজা। দৃষ্টি সংযত না থাকলে হৃদয়ও কলুষিত হয়ে পড়ে।’ (আল-জাওয়াবুল কাফি)
আজ অনেক তরুণ-তরুণী ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক মাধ্যমে কাটালেও নিজেদের অজান্তেই মানসিক অস্থিরতা, হতাশা ও আত্মিক শূন্যতায় আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যের চাকচিক্যময় জীবন দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করা, লাইক-কমেন্টের ওপর আত্মমর্যাদা নির্ভর করা কিংবা ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটা— মানুষের আত্মিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে। অথচ ইসলাম মানুষকে অন্তরের প্রশান্তি খুঁজতে শিখিয়েছে আল্লাহর স্মরণে। ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত : ২৮)
সামাজিক মাধ্যমে সময় অপচয়ও বড় একটি সমস্যা। মানুষ কখন যে কয়েক মিনিটের জন্য মোবাইল হাতে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা নষ্ট করে ফেলে, তা টেরই পায় না। অথচ মুমিনের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষকে তার জীবন ও সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, সে তা কোথায় ব্যয় করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৭)
তবে সামাজিক মাধ্যমকে সম্পূর্ণ নেতিবাচকও বলা যাবে না। এটি দাওয়াত, শিক্ষা, মানবিক সহায়তা ও সত্য প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যমও হতে পারে। অসংখ্য মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করছে অনলাইনের মাধ্যমে। অনেক আলেম, গবেষক ও দাওয়াতকর্মী সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের কাছে কোরআন-সুন্নাহর বাণী পৌঁছে দিচ্ছেন। তাই সমস্যা সামাজিক মাধ্যমের মধ্যে নয়; বরং ব্যবহারের ধরনে।
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেছেন, ‘তোমার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করো; কারণ সেটিই তোমার ধ্বংসের কারণ হতে পারে।’ ডিজিটাল যুগে এই কথার পরিধি আরও বিস্তৃত। এখন শুধু জিহ্বা নয়, আঙুলের স্পর্শেও গুনাহ ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি মন্তব্য, একটি পোস্ট বা একটি ভিডিও কখনো মানুষের জন্য সদকায়ে জারিয়া হতে পারে, আবার কখনো মৃত্যুর পরও গুনাহের ধারাবাহিক কারণ হয়ে থাকতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে নিরাপদ থাকতে হলে মুসলমানকে কয়েকটি বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তথ্য যাচাই ছাড়া কিছু প্রচার না করা, অশ্লীল ও ক্ষতিকর কনটেন্ট এড়িয়ে চলা, সময়ের সঠিক ব্যবহার করা, অনলাইন আচরণে তাকওয়া বজায় রাখা এবং প্রতিটি পোস্টের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অনুভূতি রাখা জরুরি।
আজ মানুষের হাতে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু অনেকের হৃদয়ে শান্তি নেই। সংযোগ বাড়ছে, কিন্তু সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। তথ্য বাড়ছে, কিন্তু প্রজ্ঞা কমছে। এই বাস্তবতায় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে ইসলামি নৈতিকতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণই হতে পারে প্রকৃত নিরাপত্তার পথ। কারণ একজন মুমিন শুধু পৃথিবীর মানুষের কাছেই নয়, বরং আসমানের রবের কাছেও তার প্রতিটি শব্দ ও কাজের জবাবদিহি করবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




