রিজিক বৃদ্ধির পরীক্ষিত আমল
- রিজিক প্রশস্ত হওয়ার নেক আমল
- বরকতপূর্ণ জীবনের কিছু পরীক্ষিত আমল

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে রিজিক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধন-সম্পদ, খাদ্য, সুস্থতা, সন্তান, জ্ঞান, সম্মান, নেক্কার জীবনসঙ্গী- সবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। অনেক মানুষ বেশি উপার্জনের জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করেও মানসিক শান্তি পায় না, আবার কেউ অল্প উপার্জনেও বরকতময় জীবন লাভ করে। ইসলামের শিক্ষা হলো, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহতাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা প্রাচুর্য দান করেন, যাকে ইচ্ছা সীমিত করেন। তবে পবিত্র কোরআন আর রাসুল (সা.)-এর হাদিসে এমন কিছু আমলের কথা এসেছে, যা মানুষের রিজিকে বরকত ও প্রশস্ততা এনে দেয়। এর মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা অন্যতম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক অথবা তার আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি, হাদিস : ২০৬৭)
এই হাদিসে রাসুল (সা.) দুটি বড় নেয়ামতের কথা বলেছেন। একটি হচ্ছে রিজিক বৃদ্ধি আর অপরটি হচ্ছে আয়ুতে বরকত। এ দুটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে ‘সিলাতুর রাহিম’ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাকে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার অর্থ কী
‘সিলাতুর রাহিম’ বলতে শুধু খোঁজখবর নেওয়া নয়; বরং আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করা, প্রয়োজনে সহযোগিতা করা, অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া, অভিমান দূর করা, আর্থিকভাবে সহায়তা করা এবং সম্পর্ক ছিন্ন না করাকে বোঝায়।
ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার ধরন ব্যক্তি ও অবস্থাভেদে ভিন্ন হতে পারে। কখনো অর্থ দিয়ে, কখনো সাক্ষাৎ করে, কখনো সালাম ও সুন্দর কথার মাধ্যমে এ দায়িত্ব পালন হয়। (শরহু সহিহ মুসলিম, ইমাম নববি)
আজকের সমাজে দেখা যায়, সম্পদ বণ্টন, জমিজমা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা অহংকারের কারণে ভাই ভাইয়ের সঙ্গে, সন্তান বাবা-মায়ের সঙ্গে, আত্মীয় আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে। অথচ ইসলাম এটিকে শুধু সামাজিক ত্রুটি নয়; বরং আখিরাতের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখেছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৪; মুসলিম, হাদিস : ২৫৫৬)
কীভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক রিজিক বৃদ্ধি করে
অনেকে প্রশ্ন করেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার সঙ্গে রিজিক বৃদ্ধির সম্পর্ক কী? ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, মানুষের রিজিক শুধু বাহ্যিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং আল্লাহর বরকত ও সন্তুষ্টির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা আত-তালাক, আয়াত : ২-৩)
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা আল্লাহভীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। ফলে এর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর রহমত ও বরকতের উপযুক্ত হয়। অনেক সময় মানুষ অল্প উপার্জনেও প্রশান্তি, সুস্থতা ও পারিবারিক সুখ পায়। এটিই প্রকৃত বরকত।
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেছেন, হাদিসে রিজিক বৃদ্ধির অর্থ হতে পারে বাস্তব সম্পদ বৃদ্ধি অথবা সম্পদে বরকত দান। (ফাতহুল বারি, ১০/৪১৫)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের ভয়াবহতা
পবিত্র কোরআনে আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্টকারীদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষমতায় গেলে কি পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? এরা সেই লোক, যাদের আল্লাহ অভিশপ্ত করেছেন।’ (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত : ২২-২৩)
বর্তমান সময়ে পরিবারে ভাঙন, একাকীত্ব, মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের একটি বড় কারণ আত্মীয়তার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাওয়া। ইসলাম পরিবারকে শুধু আবেগের বন্ধন হিসেবে নয়; বরং সামাজিক স্থিতি ও রহমতের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
রিজিক বৃদ্ধির আরও কিছু আমল
রিজিক বৃদ্ধির জন্য কোরআন-সুন্নাহতে আরও কিছু আমলের কথা এসেছে—
১. ইস্তিগফার করা
আল্লাহর নবী নুহ (আ.) তার জাতিকে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত : ১০-১২)
এই আয়াত প্রমাণ করে, ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মাফের আমল নয়; বরং এটি রিজিক ও বরকত লাভেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মানুষ যখন গুনাহে লিপ্ত হয়, তখন অনেক সময় তার জীবনের বরকত কমে যায়। উপার্জন থাকলেও শান্তি থাকে না, পরিবারে অশান্তি বাড়ে, হৃদয় সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। কিন্তু বান্দা যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তখন আল্লাহ তার জন্য রহমতের দরজা খুলে দেন।
হাসান বসরি (রহ.)-এর কাছে এক ব্যক্তি দারিদ্র্যের অভিযোগ করলে তিনি ইস্তিগফারের পরামর্শ দেন। আরেকজন বৃষ্টির অভাবের কথা বললেও একই পরামর্শ দেন। পরে তিনি এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে বুঝিয়ে দেন, ইস্তিগফার মানুষের জীবনে আল্লাহর রহমত ও রিজিক ডেকে আনে। (তাফসিরে কুরতুবি)
২. তাকওয়া অবলম্বন করা
তাকওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তা এই আয়াত থেকেই বোঝা যায়। আল্লাহতাআলা বলেছেন,
‘যদি জনপদের অধিবাসীরা ইমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহ খুলে দিতাম।’ (সুরা আল-আ’রাফ, আয়াত : ৯৬)
তাকওয়া মানে শুধু ইবাদত করা নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে চলা। ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা, মানুষের হক আদায় করা এবং গোপন-প্রকাশ্যে আল্লাহর আনুগত্য করা তাকওয়ার অংশ।
আজ অনেক মানুষ দ্রুত ধনী হওয়ার জন্য সুদ, ঘুষ, প্রতারণা কিংবা হারাম উপার্জনের পথ বেছে নেয়। সাময়িকভাবে সম্পদ বাড়লেও সেখান থেকে প্রকৃত বরকত উঠে যায়। পক্ষান্তরে তাকওয়াবান ব্যক্তির উপার্জন হয়তো কম হতে পারে, কিন্তু তার জীবনে প্রশান্তি, সম্মান ও কল্যাণ থাকে। এজন্য পবিত্র কোরআনে তাকওয়াকে বরকতের চাবিকাঠি বলা হয়েছে।
৩. দান-সদকা করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারে দান করলে সম্পদ কমে যায়। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, আল্লাহর পথে ব্যয় করা সম্পদ কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং আল্লাহ তা আরও বাড়িয়ে দেন এবং তাতে বরকত দান করেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ২৭৬)
সদকা মানুষের হৃদয়কে কৃপণতা থেকে মুক্ত করে এবং সমাজে সহমর্মিতা সৃষ্টি করে। অনেক সময় মানুষ বুঝতেও পারে না তার বিপদ দূর হওয়া, রোগ থেকে নিরাপত্তা কিংবা অপ্রত্যাশিত রিজিক লাভের পেছনে কোনো গোপন সদকার বরকত কাজ করছে। তাই ইসলামে দান-সদকাকে শুধু মানবিক কাজ নয়; বরং বরকতপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়েছে।
আজ মানুষ রিজিক বৃদ্ধির জন্য নানা পদ্ধতি অনুসরণ করছে। কিন্তু অনেকেই ভুলে যায়, রিজিকের চাবিকাঠি আসমানের মালিকের হাতে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, শুধু পরিশ্রম নয়; বরং নেক আমল, তাকওয়া, ইস্তিগফার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা রিজিকে বরকত আনে।
তাই আমাদের উচিত আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা, অহংকার ও অভিমান দূর করা এবং পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করা। কারণ মানুষের দরজা হয়তো বন্ধ হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।






