ইসলামে মানুষের জীবন কতটা মূল্যবান?

প্রতীকী ছবি
পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার জীবন। এই জীবন কোনো রাষ্ট্র, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দান নয়; এটি মহান আল্লাহর অমূল্য আমানত। তাই ইসলামে মানুষের জীবনকে এমন মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যার তুলনা অন্য কোনো পার্থিব সম্পদের সঙ্গে কোনোভাবেই করা যায়না। সম্পদ হারালে তা ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু একটি প্রাণ একবার নিভে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এ কারণেই ইসলাম মানুষের জীবন রক্ষা করাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত এবং অন্যায়ভাবে জীবন হরণকে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করেছে।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন,
لَوْ أَنَّ أَهْلَ السَّمَاءِ وَأَهْلَ الأَرْضِ اشْتَرَكُوا فِي دَمِ مُؤْمِنٍ لأَكَبَّهُمُ اللَّهُ فِي النَّارِ
‘আসমান-জমিনের মধ্যে বসবাসকারী সকলে একত্রে মিলিত হয়েও যদি একজন মু’মিনকে হত্যা করার কাজে শরিক হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের সবাইকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৩৯৮)। একটি মাত্র প্রাণের বিনিময়ে সম্মিলিতভাবে এত বড় শাস্তির ঘোষণা প্রমাণ করে, আল্লাহর কাছে মানুষের জীবন কতটা মর্যাদাপূর্ণ।
পবিত্র কোরআন এই শিক্ষাকে আরও সুস্পষ্ট করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো প্রাণকে হত্যা করল, অথচ সে হত্যার অপরাধী নয় বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করেনি, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে একজনের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৩২)। একটি প্রাণের সঙ্গে সমগ্র মানবজাতির তুলনা করে কোরআন মানবজীবনের অসীম মূল্য তুলে ধরেছে। তাই একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দুর্ঘটনাগ্রস্তকে উদ্ধার করা, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া কিংবা আত্মহত্যার পথ থেকে কাউকে ফিরিয়ে আনা, সবই জীবন রক্ষার অন্তর্ভুক্ত মহৎ আমল।
বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছিলেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য এ দিনের, এ মাসের এবং এ নগরের পবিত্রতার মতোই পবিত্র।’ (বুখারি, হাদিস: ১৭৩৯)। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি মানবাধিকারের এমন এক ভিত্তি স্থাপন করেন, যা আজও বিশ্বমানবতার জন্য অনুকরণীয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু হত্যা নয়, হত্যা সংঘটনের সব পথই নিন্দিত। অন্যায়ভাবে কাউকে নির্যাতন করা, সন্ত্রাস সৃষ্টি করা, প্রতিহিংসার আগুন উসকে দেওয়া, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কাউকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া কিংবা মানুষের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে এমন কাজ করা, সবই ইসলামের ন্যায় ও করুণার আদর্শের পরিপন্থী। এমনকি প্রাণীর প্রতিও নিষ্ঠুরতা ইসলামে নিষিদ্ধ। তাহলে আশরাফুল মাখলুকাত মানুষের জীবনের মর্যাদা কত উচ্চ, তা সহজেই অনুমেয়।
আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, সড়ক দুর্ঘটনায় অবহেলা এবং সামাজিক বিদ্বেষের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ ঝরে পড়ছে। একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো জীবনের পক্ষে দাঁড়ানো, শান্তির পক্ষে কথা বলা এবং অন্যায়ভাবে রক্তপাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। কারণ, যে হাত একটি জীবন রক্ষা করে, সে হাতই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যায়; আর যে হাত অন্যায়ভাবে রক্ত ঝরায়, সে নিজের জন্য আল্লাহর কঠিন শাস্তিকে আহ্বান করে।
মানুষের জীবন আল্লাহর দান, তাই এর ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্বও একমাত্র তাঁরই। ইসলামের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি প্রাণের মূল্য কোনো সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। যে সমাজ মানুষের জীবনের মর্যাদা রক্ষা করে, সেই সমাজেই প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, সহমর্মিতা এবং প্রকৃত মানবিক সভ্যতা।
লেখক: তরুণ আলেম ও লেখক






