গোপালগঞ্জে শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু

গোপালগঞ্জে শারদীয় দুর্গাপূজার একটি মণ্ডপের প্রতিমা। ছবি: আগামীর সময়
গোপালগঞ্জে ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে আজ শুক্রবার শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
কৈলাশ ছেড়ে মর্ত্যে বাবার বাড়িতে পদার্পণ করেছেন দেবী দুর্গা। ৬ দিনের এ সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন ৪ সন্তান— গনেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী।
দুর্গোৎসব শুরুর প্রাক্কালে গতকাল বৃহস্পতিবার পঞ্চমীতে দশভূজা দেবীর বোধন হয়েছে। পুরাণ অনুসারে, দক্ষিণায়নে নিদ্রিত দেবী দুর্গার নিদ্রা ভাঙানোর জন্য বোধনের মাধ্যমে বন্দনা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুসারে মণ্ডপে-মন্দিরে পঞ্চমীর সায়ংকাল তথা সন্ধ্যায় বন্দনা পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ সকাল সাড়ে ৮টায় মহাষষ্ঠীতে ষষ্ঠীবিহিত পূজা, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজা। প্রতি বছর ৫দিন এ উৎসব হলেও এ বছর সপ্তমী পূজা পড়েছে ২দিন। তাই ৬ দিনের এ উৎসব শেষ হবে আগামী ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। শনিবার সপ্তমীতে মাতৃরূপী দুর্গার মুখ উন্মোচিত হবে মণ্ডপে। লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতীকে নিয়ে মণ্ডপে অধিষ্ঠিত হবেন দশভূজা দেবী।
বৃহস্পতিবার পঞ্চমীর রাতেই গোপালগঞ্জে জমে উঠেছে উৎসব।মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খনাদ আর ঢাক-ঢোল মাতিয়ে তুলেছে পূণ্যার্থীদের মন। পাশাপাশি নজরকাড়া আলোকসজ্জা, প্যান্ডেল, দৃষ্টিনন্দন গেট ও মণ্ডপের সাজসজ্জা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করেছে।
শহরের প্রত্যেক পাড়া ও মহল্লার মণ্ডপগুলো সেজেছে অপরূপ সাজে। সাজসজ্জায় রয়েছে নতুনত্ব। ঝলমলে আলোয় উদ্ভাসিত মণ্ডপগুলোয় বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সৃষ্টি হয়েছে পূজার আবহ।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ত্রেতাযুগে ভগবান রাম তার স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করতে দেবী দুর্গার অকাল বোধন করেন। ব্রহ্মার নির্দেশ অনুযায়ী দুর্গার সাহায্যে রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। দেবীর সেই আগমণের সময়ই দুর্গোৎসব।
রাম শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করেছিলেন বলে এ পূজা শারদীয় দুর্গাপূজা নামেও পরিচিত। আর মর্ত্যলোকে আসতে দেবীর সেই ঘুম ভাঙানোকে বলা হয় অকাল বোধন।
গোপালগঞ্জ জেলার ৫ উপজেলা ও ৪ পৌরসভায় এ বছর ১ হাজার ২৮৮ টি মণ্ডপে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গাপূজা।
বৃহস্পতিবার রাতে গোপালগঞ্জ শহরের মণ্ডপগুলোয় দেখা যায়, আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে মন্দির প্রাঙ্গণ। নির্মিত হয়েছে প্যান্ডেল। ভক্তরা এসেছেন দেবী দর্শনে। তাদের কেউ ছবি তুলছেন মণ্ডপে। কেউ বা প্রণাম করছেন দুর্গাকে। আবার অনেকে নেচে-গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করছেন। মণ্ডপগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জ সরকরি কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী অরিন্দম সরকার বলেছেন, ‘পঞ্চমীর রাতে শহরের ১০ মণ্ডপে ঘুরেছি। সবগুলো মণ্ডপই ভাল লেগেছে। এখানে যেমন উৎসবের আমেজ রয়েছে, তেমনি পূজার ভক্তিপূর্ণ আবহ সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে মণ্ডপগুলোর উৎসবমুখর পরিবেশ ভালো লেগেছে।’
গোপালগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় সিকদার জানিয়েছেন, সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার দিন ‘কন্যারূপে’ ধরায় আসেন দশভূজা দেবী দুর্গা, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তাকে ১ বছরের জন্য বিদায় জানানো হয়। তার এ ‘আগমন ও প্রস্থানের’ মধ্যে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত ৬ দিন চলে দুর্গোৎসব।
শহরের সাহাপাড়া মন্দিরের পুরোহিত দীপংকর চক্রবর্তী জানান, ‘পঞ্জিকা মতে, দেবী দুর্গা এবার মর্ত্যে এসেছেন ঘোটকে অর্থাৎ ঘোড়ায় চড়ে। ফল ‘ছত্রভঙ্গ’। এর সহজ অর্থ হলো সামাজিক, রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে। দেবী গমন করবেন নৌকায় করে। এর ফল হলো ‘শস্যং বুদ্ধিস্তথাজলম’। এটির সহজ অর্থ হলো প্রভূত শস্য উৎপাদন হবে এবং দেশে সুফল ও বর্ষা ভালো থাকবে।
পুরোহিত বললেন, ‘শাস্ত্র অনুযায়ী, দেবীর আসা ও যাওয়ার বাহন এক হলে তা অশুভ ধরা হয়। সৌভাগ্যবশত এ বছর দেবীর আগমনের বাহন ঘোড়া ও গমনের বাহন নৌকা আলাদা রয়েছে। তবে ভক্তের আরাধনায় দেবী তুষ্ট হলেই বিশ্বে মিলবে শান্তি ও সমৃদ্ধি।’





