আগামীর সময়

কোরআন ও হাদিসের আলোকে রমজানে মুমিনের আমল

কোরআন ও হাদিসের আলোকে রমজানে মুমিনের আমল

সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে কিছু সময় আসে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমতের বার্তা নিয়ে আসে। পবিত্র রমজান তেমনই এক মহিমান্বিত সময়। এটি শুধু একটি মাস নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, তাওবা, ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
অতএব, রমজানের প্রকৃত লক্ষ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন। প্রশ্ন হলো, এই বরকতময় মাসকে আমরা কীভাবে বরণ করব, যাতে তা আমাদের জীবনে সত্যিকার পরিবর্তন আনতে পারে?


১. কৃতজ্ঞতা ও আনন্দের সঙ্গে রমজানকে বরণ করা
রমজান পাওয়া নিজেই আল্লাহর এক বড় নিয়ামত। অনেক মানুষ গত বছর আমাদের সঙ্গে ছিলেন, কিন্তু এ বছর আর রমজান পাননি। তাই এই মাসে পৌঁছাতে পারা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, এটি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত; সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক। এটি তাদের সঞ্চিত সম্পদের চেয়েও উত্তম।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৫৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের রমজানের আগমনের সুসংবাদ দিতেন। তিনি বলেছেন: ‘তোমাদের কাছে রমজান এসেছে, এটি একটি বরকতময় মাস। এতে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।’ (নাসাঈ, হাদিস: ২১০৬) অতএব, রমজানকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত।


২. তাওবা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে প্রস্তুতি
রমজান শুরু হওয়ার আগেই অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা জরুরি। গুনাহ থেকে তাওবা করা, অন্যের হক আদায় করা এবং সম্পর্কের জটিলতা দূর করা রমজানকে ফলপ্রসূ করে। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা আন-নূর, আয়াত : ৩১)
সালাফে সালেহিন রমজানের আগে নিজেদের আমল পরিশুদ্ধ করতেন, যাতে তারা পবিত্র অন্তর নিয়ে এই মাসে প্রবেশ করতে পারেন।


৩. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা
রমজান কোরআন নাজিলের মাস। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রমজান মাস, এতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
তাই এই মাসে কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ বোঝা এবং জীবনে বাস্তবায়নের বিশেষ পরিকল্পনা করা উচিত। জিবরাইল (আ.) প্রতি রমজানে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে কোরআন পর্যালোচনা করতেন (বুখারি, হাদিস ৩২২০)।
\

৪. ইবাদতের পরিকল্পনা করা
রমজানকে ফলপ্রসূ করতে হলে একটি সুন্দর পরিকল্পনা আবশ্যক। যেখানে ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, তারাবিহ, জিকির ও দোয়ার সময় নির্ধারণ করা থাকবে। অপ্রয়োনিয় কথা ও কাজ সর্বত্র দূরের রাখার দৃঢ়তা থাকবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। আর যে ঈমান ও সওয়াবের আশায় রাতে কিয়াম (তারাবিহ) করে, তার পূর্বের গুনাহও ক্ষমা করা হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৮)
এটি প্রমাণ করে যে, রমজান ইবাদতের মাধ্যমে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ।


৫. চরিত্র সংশোধন ও গুনাহ থেকে বিরত থাকা
রমজানের রোজা শুধু ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করার নাম নয়; এটি চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)
তাই জিহ্বা, চোখ, কান ও অন্তরকে গুনাহ থেকে রক্ষা করা রমজান বরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


৬. দান-সদকা ও মানুষের প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধি
রমজান উদারতার মাস। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল, আর রমজানে তাঁর দানশীলতা আরও বৃদ্ধি পেত।’ (বুখারি, হাদিস : ৬)
অতএব, দরিদ্রদের সাহায্য, ইফতার করানো এবং যাকাত-সদকা আদায়ের মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।


৭. দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া
রমজান দোয়া কবুলের বিশেষ সময়। আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, (বলুন) আমি তো নিকটেই আছি; দোয়া করলে আমি দোয়াকারীর দোয়া কবুল করি।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৬)
বিশেষ করে ইফতারের সময়, সাহরির সময় এবং শেষ দশকে দোয়ার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
মোটকথা রমজান আমাদের জীবনের একটি নবজাগরণের মাস। এটি কেবল খাদ্য থেকে বিরত থাকার সময় নয়; বরং অন্তর, চিন্তা ও আচরণকে আল্লাহমুখী করার এক মহাসুযোগ। যে ব্যক্তি পরিকল্পনা, আন্তরিকতা এবং তাকওয়ার চেতনা নিয়ে রমজানকে বরণ করে, তার জীবনেই এই মাসের প্রকৃত বরকত প্রতিফলিত হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রমজানকে যথাযথভাবে বরণ করার তাওফিক দান করুন, এই মাসকে আমাদের জন্য রহমত, মাগফিরাত এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমিন।


লেখক: শিক্ষার্থী, এন আকন্দ কামিল মাদরাসা, নেত্রকোণা।

    শেয়ার করুন: