আশ্রয় হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ
জল নয়, বড়াল দিয়ে সেদিন বয়েছিল রক্তের স্রোত
- ডেমরা গণহত্যা দিবস আজ

ছবি: আগামীর সময়
১৯৭১ সালের ১৪ মে। ক্যালেন্ডারের পাতায় এক অভিশপ্ত দিন। পাবনার ফরিদপুরের তৎকালীন দুর্গম গ্রাম ডেমরা সেদিন হয়েছিল রক্তাক্ত। জল নয়, ডেমরা গ্রাম ঘেঁষে বয়ে চলা বড়াল নদী দিয়ে সেদিন যেন বয়েছিল রক্তের স্রোত। পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসররা মেতে উঠেছিল এক পৈশাচিক উৎসবে। নিরাপদ আশ্রয় ভেবে আসা মানুষগুলো মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল নিথর লাশে। ৮০০-এর বেশি প্রাণের বিনিময়ে ডেমরা আজ বাংলার ইতিহাসের এক বেদনাসিক্ত নাম।
পাবনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম ডেমরা। ফরিদপুর উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার, সাঁথিয়া থেকে ৯ কিলোমিটার এবং বাঘাবাড়ী থেকে দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। গ্রামটির উল্টোদিকেই বড়াল নদী। নদীকে কেন্দ্র করেই সেখানে গড়ে উঠেছিল আশপাশের জনপদের মধ্যে অন্যতম বড় হাট। গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই ছিলেন হিন্দু, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন সম্পদশালী। ঘি, ছানা, মিষ্টি, মাটির পাতিলের জন্য গ্রামটি প্রসিদ্ধ। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও সমৃদ্ধ।
দুর্গম ভেবেই শহর ও আশপাশের কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নেন সেখানে। ১৪ মে ছিল হাটের দিন। ভোরে গ্রামটির তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি ও রাজাকার বাহিনী। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে গ্রামবাসী তখন গভীর ঘুমে। এরই মধ্যে হঠাৎই নেমে আসে যমদূত। রাজাকারদের সহায়তায় নিস্তব্ধ গ্রামটি ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি হায়েনারা। শুরু হয় আর্তচিৎকার আর বুলেটের তাণ্ডব।
এর আগে ১৩ এপ্রিল পাবনা শহর ফের দখল করে নেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এর পর থেকেই জেলার বিভিন্ন জনপদে শুরু হয় গণহত্যা। জীবন বাঁচাতে পাবনা শহর, বেড়া, শাহজাদপুর, কুচিয়ামারা, নগরবাড়িসহ অনেক এলাকার মানুষ আশ্রয় নেন নিভৃত গ্রাম ডেমরা, রূপসী ও বাউশগাড়িতে। আশ্রয় নেওয়াদের অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ধনী ব্যবসায়ী। তাদের দিকে নজর পড়ে স্থানীয় রাজাকারদের। আশ্রয় নেওয়া লোকদের অর্থ-সম্পদ লুটের পরিকল্পনা। তারা যোগাযোগ করে সাঁথিয়ায় রাজাকার নেতাদের সঙ্গে। ১০ মে রাজাকার নেতাদের নিয়ে হয় বৈঠক। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়— ডেমরা ও বাউশগাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে পাকিস্তানি বাহিনীকে। যে কাজের অন্যতম দোসর ছিল আসাদ রাজাকার।
গ্রামের একপাশে ছিল বড়াল নদী। প্রাণ বাঁচাতে শত শত মানুষ নদীতে ঝাঁপ দিলেও মেলেনি নিস্তার। পানি থেকে তুলে পাড়ে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে চালানো হয় ব্রাশফায়ার। বৃষ্টির মতো লাশ পড়ে নদীর জলে। সেই রক্তে লাল হয়ে ওঠে বড়ালের নীলাভ জল। গ্রামবাসী টানা এক মাস ব্যবহার করতে পারেনি নদীর পানি
দিনটি ছিল শুক্রবার। মুসল্লিরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ফজরের নামাজের। মসজিদে তখনো আজান দেয়নি। হঠাৎই শুরু হয় গুলিবর্ষণ। সঙ্গে ঘুমন্ত মানুষের ঘরে দেওয়া হয় আগুন। আচমকা এমন আক্রমণে দিশেহারা মানুষ। আর্তচিৎকারে শুরু করে ছোটাছুটি। যে যেভাবে পারেন চেষ্টা করেন পালানোর। কেউ বা না বুঝেই দৌড়াচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গেই তারা হন গুলিবিদ্ধ। অনেকে আবার সাঁতরে নদী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা ঢুকে পড়ে গ্রামের ভেতর। বাড়ি বাড়ি শুরু করে তল্লাশি। কাকডাকা ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। একদিকে জ্বলছিল বসতঘর, অন্যদিকে চলছিল নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ডেমরা, রূপসী ও বাউশগাড়ি গ্রামের ঝোপঝাড় আর কুয়া ভরে উঠেছিল লাশে। এমনকি দুই সহোদরকে গাছের সঙ্গে বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতেও দ্বিধা করেনি মানুষরূপী পাকিস্তানি হায়েনারা। বাবা-মায়ের সামনে কেড়ে নেয় কন্যার সম্ভ্রম। স্বামীর সামনে স্ত্রীর। সেদিনের সেই বীভৎসতা আজও ডেমরার বাতাসকে করে তোলে ভারী।
এ নারকীয় গণহত্যায় শুধু বাউশগাড়িরই প্রাণ হারায় সাড়ে তিনশ লোক।
প্রত্যক্ষদর্শী ওয়াজেদ আলীর মতে, এদিন মাখন লাল রায়, বলরাম রায়, বিভূতিভূষণ কুণ্ডু, বীর ভদ্র কুণ্ডু, শুরেন্দ্রনাথ ঘোষ, সতীন্দ্রনাথ ঘোষ, ঋষিকেশ কুণ্ডু, স্বপন কুণ্ডু, সুশান্ত ঘোষ, মাহমুদ আলী, দুলাল কর্মকার, অনাথ বন্ধু, জগদীশ কুণ্ডু, সতীশ চন্দ্র কুণ্ডু, নীল মনি পাল, মংলা কুণ্ডু, বীরেন্দ্রনাথ পাল, জামিনী মোহন পালসহ হত্যা করা হয় প্রায় ৯০০ মানুষকে, যার অধিকাংশকে দেওয়া হয় মাটিচাপা।
গ্রামের একপাশে ছিল বড়াল নদী। প্রাণ বাঁচাতে শত শত মানুষ নদীতে ঝাঁপ দিলেও মেলেনি নিস্তার। পানি থেকে তুলে পাড়ে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে চালানো হয় ব্রাশফায়ার। বৃষ্টির মতো লাশ পড়ে নদীর জলে। সেই রক্তে লাল হয়ে ওঠে বড়ালের নীলাভ জল। গ্রামবাসী টানা এক মাস ব্যবহার করতে পারেনি নদীর পানি। এ পানি দিয়ে বাড়ির রান্না ও ধোয়ামোছার কাজ করতেন তারা। শুধু তাই নয়, এলাকার মানুষ এ নদীর মাছ খাওয়াও দেয় বন্ধ করে। প্রতিদিনই পাঁচ-সাতটি করে লাশ যেত ভেসে। মরদেহের দুর্গন্ধে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম। পচা মরদেহের দুর্গন্ধে সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা জনপদ।
যে ক্ষত শুকায়নি আজও। মাখন লাল রায় থেকে মাহমুদ আলী— কত শত নাম হারিয়ে গেছে বড়াল নদীতে। ডেমরা গণহত্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি এক করুণ আখ্যানের দীর্ঘশ্বাস। আজ ৫৫ বছর পার হলেও বড়াল নদীর স্রোতে যেন আজও শোনা যায় সেই ৮০০ শহীদের বুকফাটা আর্তনাদ।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর





