বিদায় আতাউর রহমান
- আমাদের মঞ্চসারথির প্রস্থান

আতাউর রহমান
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক কিংবদন্তীতুল্য ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান। তিনি একাধারে ছিলেন অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যসংগঠক ও লেখক। ১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে জন্ম নেওয়া এই সংস্কৃতিজন স্বাধীনতা-পরবর্তী গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।
তার থিয়েটারকর্মের সঙ্গে আমার পরিচয় প্রথম শৈশবে। ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে বেইলি রোডে (বর্তমান নাটক সরণি) সপরিবারে দেখেছিলাম তার নির্দেশিত ‘ঈর্ষা’। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজিত নাটকটি এ দেশের থিয়েটার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তিনটি চরিত্র এবং সাতটি সংলাপের নাটকটি লিখেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন আমি নাগরিক নাট্যাঙ্গন ইনস্টিটিউট অফ ড্রামাতে (এনএনআইডি) ছয় মাসের একটি কোর্সে অংশগ্রহণ করি। ড. ইনামুল হক ও লাকী ইনাম পরিচালিত এই থিয়েটার শিক্ষাকেন্দ্রে তখনকার প্রথিতযশা নাট্যব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষকদের অনেকেই পড়াতেন। ‘ঈর্ষা’ দেখার ১২-১৩ বছর পরে সেখানেই শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম আতাউর রহমানকে।
শিক্ষকতায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী, সময়ানুবর্তী ও বাগ্মী। সহজ ভাষায় তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরতেন থিয়েটার তথা পারফর্ম্যান্স আর্টের নানা জটিল তত্ত্ব ও প্রয়োগ। এই কোর্সে আমাদের একটি অ্যাসাইনমেন্টের বিষয় ছিল তার নির্দেশিত নাটক ‘রক্তকরবী’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত কালজয়ী নাটকটি শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় কলকাতার মঞ্চে আসা অবধি বিবেচিত হতো একটি মঞ্চায়ন দুঃসাধ্য পাণ্ডুলিপি হিসেবে। বহুরূপী প্রযোজিত ‘রক্তকরবী’ ভেঙে দেয় সেই ধারণা। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনাটিও এদেশের থিয়েটার ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক।
এনএনআইডি’র ছাত্রত্ব শেষেও তার স্নেহপূর্ণ অভিভাষণে সিক্ত হয়েছি বহুবার। আতাউর রহমানের নিয়মানুবর্তিতা ও পরিমিতিবোধ রীতিমতো অনুসরণযোগ্য। মতের বা মনের অমিল হলেও কারও সম্পর্কে করতেন না অশোভন শব্দ উচ্চারণ। তার অফিসে, নাটকের প্রদর্শনীতে বা কোনো আয়োজনে নিজের মূল্যবান সময় ও নানা পরামর্শ দিয়েছেন অনুজ শিল্পী-সাহিত্যিক-সংগঠকদের।
আতাউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। ১৯৬৮ সালে গঠিত নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি ছিলেন জিয়া হায়দার। ১৯৭২ সালে এই নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ই বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে নিয়মিত থিয়েটার চর্চা শুরু করে। নাটকটি ছিল বাদল সরকার রচিত ‘বাকী ইতিহাস’।
এই নাট্যদল গঠন প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছে ১৯৬৮ সালে, কিন্তু তখন কেবল রেডিওতে নাটক করতাম। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ দিয়ে মঞ্চনাটক শুরু। তার কিছুদিন আগে আলী যাকেরের সাথে পরিচয় হলো। আলী যাকের আরণ্যকে কাজ করত। মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় কবর নাটকে কাজ করেছে, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে শো হয়েছিল। দেখতে গেলাম। এর আগেও দেখা হয়েছিল, একেবারে প্রথমে যখন নাগরিকের মিটিং করি স্বাধীনতার পর, ফজলে লোহানী সাহেবের বাসায়। সেখানে সৈয়দ আলী আহসান সিডনি ছিলেন, যাকের তার কাজিন হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন। এরপর দেখা এই কবর নাটক দেখতে গিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় উনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করেছেন। কালচারাল মাইন্ডেড, সত্যিকার অর্থেই শিক্ষিত। কবর দেখার পর দেখা করলাম, বললাম— আমরা একটা দল করি, নাম নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, উনি জানতে চাইলেন, কারা কারা আছেন? আমি বললাম, আমি, জিয়া হায়দার, ইনামুল হক, লাকী ইনাম এরা আছেন। বললেন, ঠিক আছে আমিও আপনাদের সাথে কাজ করতে চাই। এভাবেই উনি আমাদের দলে যোগ দিলেন।’
মাইকেল মধুসূদন দত্তর বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ নাটকটির মাধ্যমে ১৯৭২ সালে নাট্য নির্দেশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। একই থিয়েটার গ্রুপ থেকে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা’, ‘রক্তকরবী’, ‘ক্রয়লাস ও ক্রেসিদা’, ‘অপেক্ষমাণ’ নাটকগুলো।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় ছাড়াও বিভিন্ন নাট্যদল বা রেপার্টরিতে আতাউর রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘আগল ভাঙার পালা’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘নারীগণ’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘রুদ্র রবি ও জালিয়ানওয়ালাবাগ’-এর মতো মঞ্চসফল প্রযোজনা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন ‘মঞ্চসারথীর কাব্যকথা’, ‘নাটক করতে হলে’, ‘নাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা’, ‘প্রজাপতি নিবন্ধ’, ‘লেখনী’সহ বিভিন্ন গ্রন্থ। মঞ্চের পাশাপাশি তিনি অভিনয় করেছেন চলচ্চিত্র ও টিভি নাটকে।
সৈয়দ শামসুল হক রচিত বা রূপান্তরকৃত বেশ কয়েকটি নাটক নির্দেশনায় তিনি দেখিয়েছেন অসাধারণ মুনশিয়ানা। রবীন্দ্র নাটক, ক্লাসিক যুগের ও আধুনিক যুগের বাংলা নাটকসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় আতাউর রহমান ছিলেন অনবদ্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী। প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়ায় তিনি অনর্গল বলতে পারতেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বের্টোল্ট ব্রেখট বা বুদ্ধদেব বসুর আপাত কঠিন সাহিত্যকর্ম থেকে।
আতাউর রহমান নানা সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদ ও চলচ্চিত্র জুরিবোর্ডের সদস্য হিসেবে।
ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) বাংলাদেশ শাখা ও পরে আন্তর্জাতিক সভাপতিও ছিলেন এই বিশিষ্ট নাট্যজন। আতাউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধাব্যক্তিত্ব। দেশের নাট্য তথা সংস্কৃতি অঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক।
নির্দেশক, অভিনেতা, নাট্যসমালোচক ও সংগঠক পরিচয়; নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই) ইত্যাদি সংগঠন-জোট ছাপিয়ে একজন আতাউর রহমান হয়ে উঠেছিলেন আমাদের মঞ্চসারথি। তার এই স্মৃতি সমুজ্জ্বল থাকবে এদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে।
লেখক : রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ক্রিয়েটিভ, রিসার্চ অ্যান্ড ইভেন্টস, আগামীর সময়
নাট্যকর্মী, অনুস্বর







