আগুন ঝরা স্লোগানে খামেনির শেষ বিদায়

লাল পতাকা মূলত প্রতিশোধের আহ্বানকে নির্দেশ করে। ছবি : সংগৃহীত
ইরানের রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ইসলামি বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের প্রথম দিন ছিল গভীর শোক, আবেগ ও প্রতিরোধের অঙ্গীকারে পরিপূর্ণ। লাখো শোকাহত মানুষের উপস্থিতিতে মোসাল্লা প্রাঙ্গণ জুড়ে বারবার ধ্বনিত হয়েছে ‘ইন্তেকাম, ইন্তেকাম’ (প্রতিশোধ, প্রতিশোধ) স্লোগান।
একপর্যায়ে সমবেত জনতা একসঙ্গে ‘মার্গ বার আমরিকা’ (আমেরিকার মৃত্যু হোক), ‘মার্গ বার ইসরায়েল’ (ইসরায়েলের মৃত্যু হোক) এবং ‘লাব্বাইক ইয়া খামেনি’ (‘হে খামেনি, আমরা আপনার জন্য প্রস্তুত) স্লোগান দেয়। পরে জনতা সমস্বরে স্লোগান দেয়, ‘শহীদ ইমামের প্রেমে নিবেদিত হৃদয়গুলোর প্রতি আল্লাহর সালাম’ এবং ‘আজ তেহরান যেন আশুরার রূপ ধারণ করেছে।’
শোকাহত মানুষের হাতে ছিল শহীদ নেতার ছবি, ইরানের জাতীয় পতাকা এবং বিভিন্ন প্রতিরোধী সংগঠনের পতাকা। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বহু মানুষ লাল পতাকা বহন করছেন, যা প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। পুরো পরিবেশে শোকের পাশাপাশি প্রতিরোধের দৃঢ় অঙ্গীকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সাম্প্রতিক সিময়ের হামলার জন্য দায়ী করে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। বক্তারা বলেছেন, শহীদ নেতার আদর্শ ও পথ অনুসরণ করে ইরান তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করবে এবং আগ্রাসনের জবাব দিতে পিছপা হবে না।
গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের প্রতিশোধের অঙ্গীকার
শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনি এবং তার সঙ্গে শাহাদাতবরণকারী ব্যক্তিদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়।
শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান ও জানাজা উপলক্ষে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছে, তারা ‘সমসাময়িক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী অপরাধ’ সংঘটিত করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, হামলার জন্য যাদের দায়ী করা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
এতে জনগণকে জানাজার শোভাযাত্রায় ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা হোসেইনি খামেনির প্রতি আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রণালয় জানায়, বিদেশি হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের অঙ্গীকার অব্যাহত থাকবে।
শত্রুর ওপর বজ্রাঘাত অব্যাহত থাকবে
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভিও শহীদ নেতার বিদায় অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে প্রকাশিত এক বার্তায় কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
তিনি বলেছেন, ইরানের জনগণের জন্য জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত আইআরজিসির মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা শত্রুর বিরুদ্ধে ‘ক্রোধের বজ্রাঘাত’ অব্যাহত রাখবে।
বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘আজ আমরা গভীর শোকের মধ্য দিয়ে আমাদের শহীদ নেতাকে বিদায় জানাচ্ছি। মহান আল্লাহর সঙ্গে আমরা অঙ্গীকার করছি, তার নেতৃত্বে ইসলামি সমাজের জন্য নির্ধারিত মহান লক্ষ্য বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এক মুহূর্তের জন্যও থামব না।’
তিনি আরও বলেছেন, ইরানের প্রত্যেক শহীদের রক্ত প্রতিশোধের নতুন প্রেরণায় পরিণত হবে এবং সত্য ও অসত্যের মধ্যকার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। তার ভাষায়, শত্রুরা এরই মধ্যে যে কঠোর ও অপ্রত্যাশিত আঘাত পেয়েছে, ভবিষ্যতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে।
মোসাল্লায় সমবেত মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত স্লোগান এবং সামরিক ও গোয়েন্দা নেতৃত্বের বক্তব্যে একই বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে— শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ, জাতীয় ঐক্য এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নীতি থেকে ইরান সরে আসবে না।
লেখক : ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআইআরবির বাংলা বিভাগের সিনিয়র সাংবাদিক









