প্রতিবেশী ধর্ষক, প্রতিবেশী বিচারক

আমরা যখন শাপলা গেটে পৌঁছলাম, তখন উত্তাল তরঙ্গ। স্থানে স্থানে জটলা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ। রাস্তায় আগুন। রাতের অন্ধকার ভেদ করে উড়ে আসছে ইটের টুকরো। বাড়ছে মানুষের স্রোত। নারী পুরুষ, তরুণ যুবক, কিশোর কিশোরী সবাই ক্রোধান্বিত। ভিড় ঠেলে আরও এগোলাম। কাছাকাছি হতেই দেখা গেল পুলিশ। ঘিরে রেখেছে একটা ভবন।
তুলাতলি থেকে চরচাক্তাই হয়ে ডানদিকে শাপলা গেট এলাকার একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (হাফিজুল কোরআন বালক বালিকা মাদ্রাসা) ভবন। ভবনটিতে আটকে রাখা হয়েছে মনিরকে। তার বিরুদ্ধে চার বছরের শিশু ধর্ষণের অভিযোগ। অভিযোগ বলাটা সমীচীন কতটা! স্থানীয়দের কাছে ধরা পড়া মনিরের ‘আমাকে শয়তানে পেয়েছিল’ শীর্ষক ভিডিও স্বীকারোক্তি ভেসে বেড়াচ্ছে সন্ধ্যা থেকেই।
অপরাধের স্বীকারোক্তির পরও কেন পুলিশ তাকে থানায় নেবে, জনগণের হাতে ছেড়ে দিক। বিচার জনগণই করবে-এমন দাবি উত্তেজিত জনতার। পুলিশ ভবনের নিচে পাহারারত। ক্রোধের মিছিল বাড়ছে। পুলিশের কাছাকাছি হতেই টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ। ইট পাটকেলে পলায়নপর জনতার জবাব।
আমি আর সহকর্মী নুর হাসিব ইফরাজ আশ্রয় নিলাম এক বাড়ির ছাদে। ক্যামেরা চলছে ছাদ থেকে। আবার টিয়ার শেল। ধোঁয়ায় টেকা গেল না সেখানে। ছাদের পাশের ঘরের বাসিন্দারা চুলা জ্বালিয়ে আগুনের আঁচ নিতে সাহায্য করল। তাতে কিছুটা মুক্তি।
নেমে পড়লাম। পুনরায় ছোট্ট গলিসম রাস্তাটিতে। রাত সাড়ে ৮টায় আরও পুলিশ এল। মনিরকে নিয়ে পুলিশ-এলাকাবাসীর টানাটানি। দু পক্ষই তাকে চায়। দুপক্ষের উদ্দেশ্যও এক। প্রথমপক্ষ প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তির বিধানে অঙ্গীকারবদ্ধ। দ্বিতীয়পক্ষটির দাবি তাৎক্ষণিক শাস্তি, জনগণের বিচার। তারাই এখানে বিচারালয়।
এক নারী চিৎকার করে বলছেন, ঢাকার রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় এখন প্রতিবাদ সভা করে এলাম। একই ঘটনা আমার বাড়ির পাশে। এটা মানা যায় না। বিচারের নামে প্রহসন হবে। দুদিন পর সে বের হয়ে যাবে। তাকে জনগণের হাতে তুলে দেওয়া হোক।
এর মধ্যে খবর এল ঢাকায়ও বিক্ষোভ চলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসার বাসায় পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন স্থানীয় লোকজন। দুদিন আগে ঢাকার পল্লবীর এই ঘটনা সারা দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছে। তাই এই ক্ষোভ বিক্ষোভ ক্রোধ ছড়িয়েছে সারা দেশে।
প্রতিবেশী পাড়াবাসী কাকে বিশ্বাস করবে! ডেকোরেশন কর্মী মনির তো প্রতিবেশীর মেয়েটিকেও চকলেট দিত। তার মনের কু ভাবনা কীভাবে বুঝবে? মনিরও যে দুই সন্তানের জনক। শিশু কন্যাটিকে নিয়ে শ্রমজীবী বাবা মা তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তাদের অপরাপর প্রতিবেশীরা প্রতিবাদে মুখর। মনিরকে তারা চায়।
এর মধ্যে একটি মোটরসাইকেল এগিয়ে এলে তাতে আগুন দিতে উদ্যত বিক্ষুব্ধরা। রাস্তার পাশে রেখে আসা বাইকটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ল। বুমটা ইফরাজের হাতে দিয়ে বাইকের নিরাপদ আবাস খুঁজতে বের হলাম। আরও অনেক দূরে একটা চালের মিলের কম্পাউন্ডে রাখলাম অনুমতি নিয়ে। আবার ঘটনাস্থলে।
আরও পুলিশ এল। এল র্যাব। এবার মনে হচ্ছে মনিরকে নিয়ে রওনা হবে। নাছোড় জমায়েত। নতুন করে আগুন দিল চলাচলের পথে। টিয়ারশেল সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ ক্রমশ ঘন হচ্ছে। দোকানপাট বন্ধ। পুলিশের একটা দল টিয়ারশেল ও বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে সামনে এগোলো। অলিগলিতে আশ্রয় নিল লোকজন। সেখান থেকে ইট বৃষ্টি। দুই পুলিশের মাথা ফাটল।
আমরা একটা দোকানে আশ্রয় নিলাম। দোকানের শার্টারে টোকা পড়ছে। ফাঁক করে দেখি পুলিশ কয়েকজন। চোখ লাল। নিজেদের ছোড়া কাাঁদনে গ্যাসে ত্রাহি অবস্থা তাদের। গ্যাস লাইটার চায়। দোকানদার ফরহাদ চারটি গ্যাস লাইটার এগিয়ে দিল তাদের। আমার হাতের পানির বোতলে তৃষ্ণা মেটালেন দু একজন। আবার নেমে পড়লেন তারা দায়িত্বে। মনিরকে যে কোনোভাবে উত্তেজিত জনতার হাতে দেওয়া যাবে না, তাদের সহকর্মী বানিয়াচং থানার এসআই সন্তোষ চৌধুরীর মতো।
একপর্যায়ে বিদ্যুৎ চলে গেল। আরও ভীতিকর পরিস্থিতি। এর মধ্যে পুলিশ ছুটল। রাত তখন ১০টা। চারদিকে রটে গেল অন্ধকারে পুলিশ মনিরকে নিয়ে গেছে। রটনার সত্যতা মিলল। কী আর করা। জনতা হাল ছাড়ার পাত্র নয়। উত্তেজনা প্রশমনে মূল সড়কে রাখা পুলিশের গাড়িতে আগুন দিল। গাড়ি ভাঙচুর চলল। ক্ষোভ বিক্ষোভ তাণ্ডবের আঁচ লাগলো দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর। কয়েকজন সাংবাদিক আহত হলেন। লেগেছে ছররা গুলিও।
আমরা দুজন ফেরার উদ্যোগ নিলাম। ছুটলাম বাইকের দিকে। বাইক যথারীতি নিরাপদে আছে। কিন্তু যে কয়জন শ্রমিকের অনুমতিতে বাইক রেখেছিলাম তাদের অবস্থা করুণ। মিলের কম্পাউন্ডে আড্ডারত শ্রমিকদের দিকেও পুলিশের টিয়ারশেলের ধোঁয়া গেছে। যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে তাড়াতাড়ি পানির ঝাপটা দিলেন তারা। তাতে আরও বেড়েছে জ্বালাপোড়া। দুজন মুখে টুথপেস্ট লাগিয়ে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখেও তাদের চাওয়া ধর্ষকের তৎক্ষণাত শাস্তি। আমরা বাসার পথ ধরলাম।



