নারীর হাতে নগদ নেই, সংসারে বেসুরো সঙ্গীত

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
মানিব্যাগের ওজনটা বুঝে নেওয়া। বিশেষ করে ঘরের বাইরে পা ফেলতে। জুতসই না হলে তাতে কদাচিৎ যোগান দেন বাড়ির কর্ত্রী। কিন্তু এটা সচরাচর ঘটে এমন নয়। হবে কিভাবে? নারীর হাতে তো টাকা দেওয়া হয় না। সংসার চালানো কর্তাও দেন না, দেশ চালানো সরকারও না। এতে সংসারের সঙ্গীত বেসুরো বাজে। সামাজিক স্থিতিটাই হয়ে যায় টালমাটাল।
নারীর হাতে নগদ অর্থ দেওয়ার সুফল পেয়েছে পৃথিবীর অনেক দেশই। পাচ্ছে আমাদের প্রতিবেশী দেশের একাধিক রাজ্যও। অথচ আমরা বুঝিনা। শত যন্ত্রণা সয়ে সংসার টেনে নেয় এই নারী। কাঁখে সন্তান, হাতে ঝাড়ু-এ নিত্যদিনের ছবি। স্বজনের সাহায্যে লাঠিটা ওরাই এগিয়ে দেন। কোমর বেঁধে লেগে যায়-যখন কেউ জাগে না। অথচ তাদের নিত্যনিগ্রহ। স্বামীর আচরণ নির্জলজ্জের আস্ফালন। চনমনে মন নিয়ে সংসার করেন খুব কম। ভোঁতা মনে তারা ঘানি টানেন।
নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার অন্যতম উপায় হচ্ছে নগদ অর্থ হস্তান্তর। বহু দেশে এটা প্রচলিত এবং জনপ্রিয়ও। ব্রাজিল ইকুয়েডর জাম্বিয়া এই নগদ হস্তান্তরের প্রকল্প শুরু করেছে সেই ২০০৩ সালে। মেক্সিকোতে চলছে ১৯৯৭ থেকে। এগুলির কোনোটি শর্তাধীন, কোনোটি নিঃশর্ত। শর্তাধীন হলে টাকা পেতে হলে শর্ত পূরণ করতে হয়। সে শর্তগুলো আবার সংসারকল্যাণী। সন্তানকে স্কুলে পাঠায় কিনা, সংসারে নারীর মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছেতো? এ টাকা পাঠানো হয় নারীদের নিজের ব্যাংক হিসেবে। এতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। ঘরে ও ঘরের বাইরে নানা বিষয়ে মত দিতে পারা তখন আর লোকদেখানো না। এতে নারীর দর কষাঘষির সুযোগ বাড়ে। ব্যাংক হিসাবে ঢোকা টাকা নিজের অধিকারের বোধ তৈরি করে। আর নিঃশর্ত হলে তো কোনো কথাই নেই।
আমাদের এখানে ভোট নিয়ে এতো উৎসব তারপরও অর্ধেক ভোটারের মন পাওয়ার চেষ্টাই করা হয় না। ভোটে উজ্জ্বল উত্থান নেই নারীর। দূরদর্শীতার অভাব রাজনীতিকদের। ভোটের ফোকাসে যতটুকু থাকার কথা ততটা থাকে না এদেশের নারীরা। ভোটের মাঠে সার্চ ইঞ্জিন খুঁজে বেড়ায় শুধু পুরুষদের মনের অলিন্দ।
অথচ নারীদের কথা থাকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে। কতটুকু লেখে? পুরুষদের জন্য থাকে পুরো বই আর নারীদের জন্য এক চ্যাপ্টার-বড়জোর। অর্ধেক ভোটার হওয়ার পরও নারীরা ফোকাসে নেই কেন? এটা কেউ জানে না। খুঁজে বের করতে লাগবে দীর্ঘ গবেষণা।
এই নগদ দেয়ার বিষয়টি কতটা কার্যকর বা কেমন গুরুত্বপূর্ণ তা যদি ভারতের কয়েকটা রাজ্যের দিকে তাকাই তাতেই বোঝা যায়। বছরের গোড়াতেই হয়ে গেল বিহারের ভোট। নীতীশ কুমার আবারো মুখ্যমন্ত্রী হলেন। কি ছিল নীতীশের কারিশমা? নিঃসন্দেহে নারী ভোটার। নারীদের জন্য তার প্রকল্প হচ্ছে ‘মহিলা রোজগার যোজনা’। যার আওতায় ফি বছর নারীদের ব্যাংক একাউন্টে চলে যায় ২০ হাজার করে টাকা। দুই মাস আগে হয়ে যাওয়া ভোটের আগেও এই টাকা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে। নীতীশ ভোটের আগে এই টাকা দিয়ে নারী ভোট কিনছেন-এটা সে পারে কিনা? এন্তার কথাবার্তা। যেমন উঠেছে পশ্চিমবঙ্গে। মহিলা রোজগার যোজনার মতো এখানে প্রকল্প লক্ষী ভান্ডার। বাংলাদেশ লাগোয়া এই রাজ্যটিতে ভোটের বাজনা বেজে উঠেছে। শিগগির তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে, যা হতে পারে এ মাসেই। এই রাজ্যের নিম্ন আয়ের নারীরা বছরে পেয়ে থাকেন ১৫ হাজার টাকা। এখানেও প্রশ্ন উঠেছে মুখ্যমন্ত্রী রাস্তাঘাট ঠিক না করে, পানীয়জলের ব্যবস্থা না করে-জনগণের টাকা ভোট কেনায় খরচ করতে পারেন কিনা। যখন কোনোভাবেই মমতাকে টলানো যায়না তখন বলা হচ্ছে লক্ষী ভান্ডারের টাকা মিসকিনদের। দয়ার টাকা নেয়া উচিত নয়। সরকারের দেওয়া কোন টাকাটা ভিক্ষা, কোনটা অনুদান বা প্রাপ্য নিশ্চয়ই এগুলোর ব্যাখ্যা আছে অর্থনীতিবিদদের কাছে। এসব ‘খিঁজরানো’র আসল উদ্দেশ্য একটি রাজনৈতিক দলকে আটকানো। কিন্তু বছরে ১৫ হাজার টাকা পেয়ে নারীরা উপকৃত হচ্ছেন। অনেকে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগাচ্ছেন। চলে যাচ্ছে নিজের হাতখরচ, কখনো আটকে গেলে তুলে দিতে পারছেন স্বামীর হাতেও। লক্ষী ভান্ডারের বার্ষিক খরচ ২৬ হাজার কোটি টাকা। ২ কোটি ২০ লাখ নারীর ব্যাংক একাউন্টে প্রতি মাসে মাসে তাদের অংশ পৌছে যায়।
দেশভেদে নারীর হাতে নগদ অর্থ দেওয়ার বিভিন্ন নাম হতে পারে। উদ্দেশ্য কিন্তু ক্ষমতায়ন। নগদ অর্থে তাদের হাতকে শক্তিশালী করা। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যখন ভোট আসে তখন নারীদের কে কত বেশি নগদ টাকা দিবে তা নিয়ে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। এই নারীরাই বিহারে নীতীশকে বারবার মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছেন। মমতা তৃতীয় দফার পর এবার চতুর্থবারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
মহিলা রোজগার যোজনা হোক বা হোক লক্ষ্মী ভান্ডার। সবই রাজনৈতিক প্রকল্প। নারী ভোটার আকৃষ্ট করাই উদ্দেশ্য। শুধু বিহার বা পশ্চিমবঙ্গেই নয় ভিন্ন নামে এ ধরনের প্রকল্প আছে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভারতে। ঝাড়খন্ডে ‘মাইয়া সম্মান’, মহারাষ্ট্রে ‘লরকি বহিন’, মধ্যপ্রদেশে ‘লাডলি বেহনা’, কর্নাটকে ‘গৃহলক্ষ্মী’ বা উড়িষ্যার ‘সুভদ্রা’ প্রকল্প। যার প্রতিটিই সরকারি অর্থায়নে। টাকা ছাড়লেই ভোট মেলে এমনও নয়! অন্ধ্র প্রদেশে জগন রেড্ডি হারত না-‘নবরত্ন’ চালুর পরও। টাকা ছড়ালেই হয় না, থাকতে হবে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধও।
প্রতিবেশী দেশের আনাচে-কানাচে যখন নারী ভোটারদেরা ফোকাস করা হয় তখন আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বসে থাকে হাত-পা গুটিয়ে । নারীর প্রতি এতোটাই উস্মা! বোন, আপা, মাইয়া, লক্ষ্মী, লড়কি, বহিন, বেটি যে নামেই ডাকি না, আমরা তাদের অধিকার থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি। লেখাপড়ায় প্রতিবন্ধকতা স্বাভাবিক ঘটনা। লেখাপড়া করলেও চাকরির দরকার নেই-এই ভাবনা বেশিরভাগ পরিবারে। চাকরি করলেও মাইনের টাকাটা ঠিকই স্বামীর পকেটেই ঢুকে যায়। বেতনের টাকা তুলে না দিলেও কোথায় বিনিয়োগ হবে, কোথায় খরচ হবে-সিদ্ধান্তটা দেন স্বামী। এখন বাইরে খাওয়ার চল বেড়েছে। বাইরে খেতে গেলে কি খাওয়া হবে অর্থাৎ মেনুটা ঠিক করেন গৃহকর্তা।
বাংলাদেশেও নারীদের জন্য কিছু প্রকল্প আছে। কিন্তু সেগুলো সবই নামমাত্র। সবচেয়ে বড় প্রকল্প হচ্ছে বিধবা ভাতা। বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারী মাসে ৬৫০ টাকা ভাতা পান। যার সংখ্যা প্রায় ২৯ লাখ। বয়স্ক ভাতার মধ্যেও নারী রয়েছেন। ভাতাও মাসে সাড়ে ছয়শ টাকা। মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় দেওয়া ভাতার পরিমাণ ১৫০ টাকা। প্রয়োজনের তুলনায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ভালো বরাদ্দ নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে সামান্য ভাতা দেয়া হয় তা দিয়ে উচ্চমূল্যের বাজারে কিছুই হয়না। এসব সুরক্ষা খাতকে নতুন করে সাজানো দরকার । যাতে তারা চলতে পারেন এমন ভাতা পান। দেশে ১২৩টি সামাজিক নিরাপত্তা বা সুরক্ষা কর্মসূচি আছে যা বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ২৫টির মত মন্ত্রণালয়। এসবে উপকারভোগীর পুনরাবৃত্তি আছে। সমান্তরালে আছে দুর্নীতির অভিযোগ।
বিএনপি সরকার ফ্যামিলি কার্ড চালু করছে। এতে আগ্রহ আমজনতার। যা তারা বলে আসছে নির্বাচনের আগে থেকেই। নির্বাচনী ইশতিহারেও প্রধান প্রতিশ্রুতির একটি এই কার্ড। প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা বা নিশ্চিত করা হবে সমমূল্যের নিত্যপণ্য।
বাংলাদেশ গত ৩৫ বছর শাসন করেছেন দুজন নারী নেত্রী। তারপরও এদেশে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নামমাত্র। নানা কায়দা কানুন করেও তাদের রাজনীতিতে আনা যায় না পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণেই। গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন আড়াই হাজারের বেশি। অথচ নারী প্রার্থী মোটে ১০৭। তাদের মধ্যে ৭২ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের, বাকিরা নির্দল। এদের মধ্যে জয়ী হয়ে সংসদের আসন নিশ্চিত করতে পেরেছেন হাতেগোনা মাত্র ৭ জন। যেখানে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী সেখানে ভোটে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে এমন তথ্য নারী ক্ষমতায়নের জন্য মারাত্মক হুমকি। নারী প্রার্থী কম হওয়ার কারণ রাজনীতিতে আগ্রহের ঘাটতি নয় বরং দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার সীমাবদ্ধতা। বিএনপি ১৩ টি আসনে প্রার্থী দিলেও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো দলের কোনো নারী প্রার্থী নেই। উল্টো এসব দল নারীর কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। জুলাই সনদার খসড়া অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোকে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
প্রতিবেশী দেশে নারীদের হাতে নগদ টাকা দেওয়ার চল থাকার পরেও বাংলাদেশের রাজনীতিকরা নারীদের হাতে টাকা দিতে অনাগ্রহী। তারপরও চাকরি-ব্যবসায় অংশগ্রহণ বেড়েছে নারীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে আগে কার্যকর ছিল ‘সূর্যাস্ত আইন’। এখন সেখানে রাতেও ঢুকতে পারেন নারীরা। অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী মিলে যৌথ হিসাব খোলেন ব্যাংকে।
কৃষ্ণান্ধকারে এই বিন্দু বিন্দু আলোও তো কম পাওয়া নয়।

