যুদ্ধ শেষ হলেও প্রভাব থাকে দশকের পর দশক

ইরানের তেহরানে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি আবাসিক ভবনের বসার ঘর থেকে তোলা দৃশ্য। ফাইল ছবি
শক্তি প্রদর্শনীর ভেতরে রয়েছে অস্ত্র বাণিজ্যের বিজ্ঞাপন। অস্ত্র উৎপাদনকারীদের জন্য, ব্যবসায়ীদের জন্য তাই পৃথিবী জুড়ে অস্থিরতা, যুদ্ধ-সংঘাত সৃষ্টি করা খুব দরকার। ব্যবসার পাশাপাশি যুদ্ধের কৌশলগত রাজনৈতিক দিকও অনস্বীকার্য।
বর্তমান পৃথিবীতে যখন সংঘাত, উত্তেজনা আর ক্ষমতার রাজনীতি চলছে, প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে একে অন্যকে ছাপিয়ে যাচ্ছে, তখন বড় যে প্রশ্নটি সবার আগে সামনে এসে দাঁড়ায়, তা হলো : সাধারণ মানুষ কি যুদ্ধ চায়। জবাব হলো 'না'। তারা চায় শান্তি। তাহলে যুদ্ধ কেন হচ্ছে? উত্তর খুঁজতে ইরানের ওপর চাপানো যুদ্ধ প্রসঙ্গে আসা যাক।
আলোচনা চলছিল পরোক্ষে। মত-অমত থাকতেই পারে। আবার ভারসাম্যও তৈরি হতে পারে। কিন্তু না। পরমতসহিষ্ণুতার পরিবর্তে অবৈধভাবে বারবার হামলা চালানো হলো ইরানের ওপর। ২০২৫-এর জুনে এবং ২৬ ফেব্রুয়ারিতে। হামলা চালালে আর আলোচনার গুরুত্ব থাকল কই? আলোচনার ভেতরেই ইরানের ওপর চাপানো হলো যুদ্ধ। যুদ্ধের টার্গেট হলো : ইরানে সরকার পরিবর্তন এবং পরমাণু শক্তি ধ্বংস করা। যুদ্ধের ভেতর এর সঙ্গে যুক্ত হলো হরমুজ প্রণালি। এখন এটাই প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রসঙ্গটা এখন বিশ্ব জুড়ে আলোচ্য বিষয়। ইরানের প্রসঙ্গ সামনে এলেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনে উত্তেজনার ঢেউ ওঠে, জোয়ার বয়ে যায় আলোচনার টেবিলে টেবিলে। হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক প্রভাব, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি— সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। যে যাই বলুক! বর্তমানে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইরানই অবশ্য হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের পরিণতি এখন ভোগ করছে সারা বিশ্ব। কেননা, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি এখন কার্যত প্রায় বন্ধ। অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির। ইরানের অনুমতি সাপেক্ষে কিছু জাহাজ যেতে পারছে। খুব অল্প কয়েকটি জাহাজই দিনের বেলা পার হচ্ছে। অনেক শিপিং কোম্পানি নিরাপত্তাহীনতার কারণে যাতায়াত বন্ধ রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান সরাসরি উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। তাদের আটকে থাকা জাহাজ বের করে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছ— অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি এলাকায় কোনো জাহাজ প্রবেশ করলে হামলা করা হবে। তবে প্রোটোকল মেনে সব জাহাজই প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে কেবল শত্রুদের সামরিক জাহাজ ছাড়া।
হামলা, ড্রোন এবং মাইন ঝুঁকিতেও রয়েছে জাহাজগুলো। ফলে হরমুজ প্রণালি এলাকা এখন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। দ্বন্দ্বটা কিন্তু প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। ইরান দাবি করছে তারা প্রণালির বড় অংশের ওপর 'পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ' প্রতিষ্ঠা করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা নৌ চলাচল নিশ্চিত করবে, যদিও তা সুদূরপরাহত। বরং হরমুজ অবরোধ ভাঙার জন্য ‘ফ্রিডম প্রজেক্ট’ নামে মার্কিন অভিযান শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে আর কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা ট্যাংকার চলাচল করেনি। অবশ্য এরই মধ্যে পিছু হটে গেছে মার্কিন অবরোধকারী জাহাজগুলো।
এই সব রাজনৈতিক কিংবা সামরিক দ্বন্দ্বের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কি শুধু ইরান কিংবা আমেরিকা-ইসরাইলই হচ্ছে? না। পারস্য উপসাগরীয় এলাকার তেল-উত্তোলনকারী সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ, অর্থনীতি। তেলের সঙ্গে জড়িত সব খাত : কৃষি-শিল্প-কলকারখানা, বিদ্যুৎ ইত্যাদি সব ক্ষেত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রাজনৈতিক এই হিসাবের বাইরে যে বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। সেটা হলো— যুদ্ধ মানে মানুষ হারানো, প্রাণ হারানো, স্বপ্ন হারানো, ভবিষ্যৎ হারানো।
যুদ্ধকে অনেক সময় পরিসংখ্যানের ভাষায় হিসাব করা হয়। যেমন দেখা হয়— কোন পক্ষে কতজন নিহত হয়েছে, কার কত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, কতটি শহর, অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে ইত্যাদি। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে যে গল্পগুলো থাকে, সেগুলোই সবচেয়ে ভয়াবহ। যদিও সেগুলোর খবর কেউ রাখে না। একজন মা— যিনি তার সন্তানকে হারান, একজন শিশু যে তার পিতা-মাতাকে হারায়, শৈশব হারায়, একজন তরুণ যে তার ভবিষ্যৎ হারায়, এগুলো কোনো চার্টে দেখা যায় না, লেখাও হয় না, যুদ্ধবাজরাও এগুলো নিয়ে ভাবে না। অথচ ইরান হোক, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য যেকোনো দেশই হোক কিংবা বিশ্বের যেকোনো ভূখণ্ডই হোক— যুদ্ধের প্রথম শিকার কিন্তু সাধারণ মানুষ নারী, শিশু, বৃদ্ধ।
যুদ্ধের সিদ্ধান্তটা কিন্তু রাজনৈতিকভাবেই নেওয়া হয়। ওই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে কী রকম বিপর্যয়কর এক অমানবিক বাস্তবতার মুখে পড়তে হয় বিশ্বকে, সেটা কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা কমই ভাবেন অথবা ভাবেনই না। তারা কী ভাবেন? তারা নিরাপত্তা প্রসঙ্গ টেনে, কৌশল আর প্রভাব বিস্তারের কথা বলে যুদ্ধের কথা ভাবেন, সিদ্ধান্ত নেন, চাপিয়ে দেন। সেই সিদ্ধান্তের কুফল কিন্তু তারা ভোগ করেন না, ভোগ করে সাধারণ মানুষ।
অবাক ব্যাপার হলো, এই সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করে কিন্তু সাফল্য-ব্যর্থতা কিংবা জয়-পরাজয়ের উপসংহার টানা হয়। একটি সামরিক অভিযানকে হয়তো কৌশলগতভাবে সফল বলা যেতেও পারে; কিন্তু সেই 'সাফল্যে'র ভেতরে যদি হাজারো মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে কি প্রশ্ন ওঠে না—সাফল্যটা আসলে কার?
বিশেষ করে ইরানের মতো একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস আর সভ্যতার লালনভূমিকে কেন্দ্র করে যখন উত্তেজনা তৈরি হয়, তখন শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। প্রশ্নও কি জাগে না— একটি সমৃদ্ধ সভ্যতা ধ্বংসের মধ্যে সাফল্যটা কার?
যুদ্ধের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষতিও কিন্তু কম নয়। যুদ্ধে শুধু গোলা-বারুদই ধ্বংস হয় না বরং এটি যুদ্ধরত দেশগুলোর অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দেয়। যুদ্ধের কারণে একটি দেশের অবকাঠামো এবং তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উপরিকাঠামোও ধ্বংস হয়ে যায়। যেমন : ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়, আমদানি-রপ্তানির চেইন স্তব্ধ হয়ে যায়। আর এর ফলে-কর্মসংস্থান কমে যায়, মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়, শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাহত হয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ে ইত্যাদি।
এটা কোনো সাময়িক সমস্যা নয়। কেননা, যুদ্ধ শেষ হলেও তার প্রভাব দশকের পর দশক ধরে থেকে যায়। একটি প্রজন্ম বড় হয় অনিশ্চয়তার মধ্যে, আরেকটি প্রজন্ম হারিয়ে যায় বিচিত্র সংকটের অন্ধকারে। দেশের শিক্ষিত এবং মেধাবী জনগোষ্ঠী, যারা একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ— তারা নিশ্চিত ভবিষ্যতের স্বপ্নে অনেক সময় দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। এটা একটি দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
অদৃশ্য ক্ষতিও কি কম? যুদ্ধের কারণে বাহ্যিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এমন কিছু ক্ষতিও ঘটে যা চোখে দেখা যায় না। যেমন : মানসিক ক্ষতি। এটা যেকোনো যুদ্ধের সবচেয়ে নীরব এবং সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
অবকাঠামো কিংবা উপরিকাঠামোর ক্ষতি হয়তো সময়ের পরিক্রমায় পূরণ হলেও হতে পারে কিন্তু মানসিক ক্ষতি? নাহ! এই ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। কেননা, যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর যারা বেঁচে থাকে, তারা যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও মানসিকভাবে যুদ্ধের ভেতরেই থেকে যায়। মানে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) বা দুর্ঘটনা পরবর্তী মানসিক বৈকল্য। এটা একটা মানসিক অবসাদ। ভয়াবহ এবং জীবনের জন্য হুমকিপূর্ণ ঘটনা দেখা, কিংবা সে রকম অভিজ্ঞতা লাভের ফলে সৃষ্ট একটি মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা হলো এই অবসাদ। কী হয়?
রোগী সেই ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি বারবার অনুভব করেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তীব্র উদ্বেগ, ভয় এবং মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে থাকেন। ট্রমাটিক ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়— এমন পরিস্থিতি, মানুষ কিংবা স্থানগুলো এড়িয়ে চলার প্রবণতা তৈরি হয় আক্রান্তদের মধ্যে। হঠাৎ কোনো শব্দ বা সেরকম কোনো ঘটনায় চমকে ওঠা, ঘুমে সমস্যা এবং সবসময় সতর্ক থাকার প্রবণতা দেখা যায়। সব মিলিয়ে ভয় কাজ করে, অনিদ্রা দেখা দেয়, হতাশা সৃষ্টি হয়, সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগে ইত্যাদি।
এসব মানসিক ক্ষতি কিন্তু বাহ্যিকভাবে দেখা যায় না, তবে এগুলো সমাজকে এবং সমাজের সন্ত্রস্ত মানুষকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়, ধ্বংস করে দেয়।
যে বিষয়টি না বললেই নয় : যুদ্ধের রাজনৈতিক সংঘাতের নির্মম শিকার হয় নিরীহ শিশুরাও। মিনাবের শাজারাহ তাইয়্যেবা স্কুলের ঘটনা বিশ্ব জুড়ে সবার মনকেই আক্রান্ত করেছে, শোকাহত করেছে।
বিশ্বব্যাপী যারা মানবাধিকারের কথা বলে, যারা শিশু অধিকারের কথা বলে তারাই এই সব নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। শিশু হত্যাকারীরাই শিশু অধিকারের কথা বলে, এরচেয়ে আর হাস্যকর ঘটনা কী হতে পারে। গাজার ঘটনা কিংবা এপস্টিন ফাইলের কথা কি বিশ্ববাসীর অজানা?
অসংখ্য স্কুল ধ্বংস করেছে ইসরায়েল-আমেরিকা। অসংখ্য গবেষণাগার, মেডিকেল সেন্টার, হাসপাতাল, তেল স্থাপনা, গ্যাস স্থাপনা, বিদ্যুৎ স্থাপনা, ব্রিজ ইত্যাদির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য স্থাপনা টার্গেট করে, ঘোষণা দিয়ে তারা ধ্বংস করেছে, যা আন্তর্জাতিক সব আইন-কানুনবিরোধী। কিন্তু কে শোনে তার কথা। যারা মানুষের বিচিত্র অধিকার নিয়ে সোচ্চার— তাদের মুখে রা-টিও নেই। ইরান একটি মুসলিম দেশ, এটাই কি অপরাধ? তাহলে কি মুসলিম দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করার, অগ্রগতির লাভ করার কোনো অধিকার নেই? নতুন করে ভাববার সময় কি হয়নি এখনো?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, যুদ্ধের কি কোনো বিকল্প নেই? যুদ্ধ ছাড়া কি কোনো সমাধান নেই?
এই জিজ্ঞাসার উত্তরে ইতিহাস কিন্তু ইতিবাচক কথা বলে। বড় বড় অনেক সংঘাত-সংঘর্ষ শেষ হয়েছে আলোচনার মাধ্যমে, কূটনীতির মাধ্যমে, ধৈর্য, যুক্তি ও সহনশীলতার মাধ্যমে। মনে রাখা দরকার, সংলাপ কখনো দুর্বলতার পরিচয় নয় বরং এটি প্রজ্ঞার পরিচয়।
ইরানসহ যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই যদি পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে যুদ্ধ অনিবার্য নয়। তারপরও যুদ্ধ কেন হয়? ব্যক্তিস্বার্থে?
হ্যাঁ! অপ্রিয় হলেও কথাটা সত্য। ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ সম্পর্কে মার্কিন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস নিজেই বলেছেন, 'ট্রাম্প যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন-সম্পর্কিত নথি প্রকাশের ঘটনা থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরানোর জন্য ইরানে যুদ্ধ শুরু করেছেন।' এই কাজে তাকে প্ররোচিত করেছে শিশু হত্যাকারী, দুর্নীতিবাজ নেতানিয়াহু। যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তারা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। ব্যক্তিকে ঘিরে কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে দেশে দেশে যুদ্ধ-সংঘাতের অনেক ইতিহাস রয়েছে।
মিডিয়াকে ব্যবহার করে যুদ্ধের পক্ষে তারা জনমত তৈরি করে। আজকের যুগের মিডিয়া, যুদ্ধের আবহ বেশ দ্রুত তৈরি করে দেয়। মিডিয়া অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে উত্তেজনাই বেশি ছড়ায়। অসচেতন সাধারণ জনগোষ্ঠী অনেক সময় মিডিয়ার ভাষ্যে প্রতারিত হন।
কিন্তু যারা সচেতন বলে নিজেদের মনে করেন, তাদের দায়িত্ব হলো প্রশ্ন করা : আমরা কি মিডিয়ার কাছ থেকে 'তথ্য' পাচ্ছি, নাকি প্রভাবিত, প্রতারিত হচ্ছি?
অনেকে আবার যুদ্ধকে খেলার মতো উপভোগ করতে চান। হ্যাঁ! যুদ্ধকে রোমাঞ্চ হিসেবে দেখানো খুব সহজ, কিন্তু ওই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার ভয়ংকর বাস্তবতা বহন করা অত্যন্ত কঠিন।
ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর বহু দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। লম্বা সময় ধরে ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, অবরোধ দেওয়া হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, বিশ্ব-ভূগোল থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও ইরান তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তুলেছে। ইরানের এই অগ্রগতি শত্রুদের সহ্য হয়নি। বিনা অজুহাতে তারা ইরানের ওপর যেরকম পাশবিক হামলা চালিয়েছে তাতে ইরানের জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু শত্রু দানবদেরও ক্ষয়ক্ষতি কম হয়নি। তাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে— ইরানের কাছে নির্মম পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। ইরানকে তারা একটি পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে এবং পশ্চিম এশিয়ায় তাদের সব স্বার্থে যেরকম আঘাত লেগেছে তার মূল্য অপরিসীম। পশ্চিম এশিয়ার অন্তত ১৬টি মার্কিন স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বিশ্ব জুড়ে তেল সংকটসহ হাজারো সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই সব সংকট কেটে উঠতে কত দীর্ঘ সময় লাগতে পারে, তা অনাগত কালই বলে দেবে।
ইরান প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে— এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ভূখণ্ডের নাম নয়। ইরান একটি ঐতিহ্যবাহী জাতি, একটি সমৃদ্ধ সমাজ, একটি ইতিহাস, একটি প্রাচীন সভ্যতার নাম। ইরান একটি উন্নত সংস্কৃতির লালনভূমির নাম। হাজারো বছরের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই সমাজে রয়েছে কোটি কোটি মানুষ— যাদের চাওয়া খুব সাধারণ : শান্তিতে বাঁচা, কাজকর্ম করা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়া, নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন করা।
কিন্তু যখন কোনো দেশকে শুধু কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হয়, তখন মানুষের মুখগুলো হারিয়ে যায়। আর তখনই ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
সুতরাং যুদ্ধের চক্র ভাঙতে হবে। যুদ্ধ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিশোধের চক্র তৈরি করে। এক আঘাতের জবাবে আরেক আঘাত, আর সেই আঘাত আবার নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়। এই চক্র যদি ভাঙা না যায়, তাহলে শান্তি শুধু একটি স্বপ্নই থেকে যাবে।
চক্র ভাঙতে হলে কী কী প্রয়োজন? সংযম, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— মানবিক চিন্তা। এই মানবিক চিন্তা অনেকেই করতে চায় না। তারা শক্তিকে বাহাদুরি আর শান্তিকে দুর্বলতা মনে করে। প্রকৃতপক্ষে শান্তি কোনো দুর্বলতার নাম নয়। এটি সবচেয়ে শক্তিশালী সিদ্ধান্তগুলোর অন্যতম। যুদ্ধ দ্রুত শুরু করা যায় কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সময় লাগে, প্রজ্ঞা লাগে, ইতিবাচক মানসিক প্রস্তুতি লাগে।
আর যুদ্ধ? তার পরিণতি সামলাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লেগে যায়। ইরান হোক বা অন্য কোনো অঞ্চল— আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে বুদ্ধিমত্তা এবং মানবিকতার প্রয়োগ। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো পতাকা, কোনো সীমান্ত, কোনো রাজনৈতিক জয়— একটি হারানো জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না, দিতে পারে না একটি জীবনের মূল্যও।
তাই আমাদের সবসময় মনে রাখা উচিত— যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়, এটি একটি অনন্ত ক্ষতির নাম। আর শান্তি কোনো স্বপ্ন নয়, শান্তি একটি মানবিক সিদ্ধান্তের নাম। আমরা যদি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবি, তাহলে পথ একটাই— যুদ্ধ নয়, শান্তি।
সিনিয়র সাংবাদিক, পার্স টুডে; তেহরান, ইরান




