সাক্ষাৎকার
ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি কমাবে রেট্রোফিটিং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সম্প্রতি ঘন ঘন ভূকম্পন অনুভূত হচ্ছে দেশ জুড়ে। এতে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, ভূমিকম্প-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে উঠতে করণীয়, ভবনকে ভূমিকম্প-সহনীয় করে তোলা– এসব বিষয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রখ্যাত অধ্যাপক ও ভূমিকম্প-বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বখতিয়ার আবিদ চৌধুরী
আগামীর সময়: সম্প্রতি তিনটি ছোট ভূমিকম্প অনুভূত হলো দেশে। অনেকেই বলছেন, এটি বড় ভূমিকম্পের সংকেত। এই ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটুকু?
মেহেদী আহমেদ আনসারী: সারা বিশ্বে প্লেটগুলোতে মুভমেন্ট হয়। ১০টি প্লেট আছে, সেগুলোর জয়েন্টে বড় বড় আর্থকোয়াক হয়। বাংলাদেশকে হিস্টোরিক্যাল আর্থকোয়াকের বেসিসে পাঁচটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। এটি নিয়ে ইউএনডিপির একটি রিপোর্ট আছে, ২০০৯ থেকে ২০১২-এর মধ্যে এটি নিয়ে কাজ করেছে তারা। সে সময় ড. মল্লিককে আনা হয়েছিল, তিনি পাঁচটি সোর্সকে আইডেন্টিফাই করেছেন। প্লেট বাউন্ডারি ১, যেটি মিয়ানমার থেকে শুরু করে নোয়াখালী পর্যন্ত। তারপর আছে প্লেট বাউন্ডারি-২, এটি নোয়াখালী থেকে শুরু করে সিলেট। প্লেট বাউন্ডারি-৩ সিলেট থেকে ইন্ডিয়ার দিকে চলে গেছে। ৪ নম্বরটা হচ্ছে মধুপুর ফল্ট, ৫ নম্বরে ডাউকি ফল্ট, যেটি বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। পাঁচটি জোনেই কিন্তু বড় বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। ১৭৬২ সালে প্লেট বাউন্ডারি-১-এ হওয়া আরকান আর্থকোয়াক ছিল ৮ মাত্রার বেশি, সেবার সুনামিও হয়েছিল। প্লেট বাউন্ডারি ১ ও ২-এর মধ্যে ১৮৬৯ কাছাড়, তারপর আছে ১৮৯৭ শ্রীমঙ্গল আর্থকোয়াকের ইতিহাস। ডাউকি ফল্টে ১৮৯৭ সালের ৮ মাত্রার অধিক এবং মধুপুর ফল্টে ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল আর্থকোয়াকের ইতিহাস রয়েছে। বড় আর্থকোয়াকগুলো সাধারণত ৩৫০ থেকে ৪৫০ বছর পরপর আসে। আর যেগুলো ৭ মাত্রার আর্থকোয়াক, সেগুলো আসে মোটামুটি ১৫০ থেকে ২০০ বছর পর। হিস্টোরিক্যাল আর্থকোয়াক ছাড়াও কিন্তু আমাদের কিছু আর্থকোয়াক আছে, যেগুলো সম্পর্কে আমরা জানি না। কারণ, বাংলাদেশের আর্থকোয়াক হিস্টোরি হচ্ছে ২৫০ বছরের, যেখানে চীন বা জাপানের প্রায় ২০০০ বছরের হিস্টোরি। আমাদের যেহেতু হিস্টোরিটা কম, কিছু আর্থকোয়াক হয়তো আছে, যেগুলো আমাদের নলেজে নেই। সেগুলো ধরে নিয়ে আমরা ধারণা করি যে একটা ৭ মাত্রার আর্থকোয়াক এখানে যেকোনো সময় হতে পারে।
আগামীর সময়: আমরা কি শুধু ঢাকাকে মাথায় রেখে ভূমিকম্পের আলোচনাটা করছি? মানে আমাদের এখানে ভূমিকম্প নিয়ে যে আলোচনাটা হয়, এটা কি শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নাকি সারা বাংলাদেশ নিয়েই?
মেহেদী আহমেদ আনসারী: বাংলাদেশ তো খুব ছোট একটা দেশ। ৮ মাত্রার আর্থকোয়াক হলে দেখা যাবে পুরো বাংলাদেশই কমবেশি এফেক্টেড হচ্ছে। আর ৭ হলে দেখা যাবে যে হয়তো পার্শিয়ালি এফেক্টেড হবে। আসলে শুধু ঢাকা না; আমরা সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, চট্টগ্রাম এগুলো নিয়েও ভাবি। ওভারঅল যেটি হচ্ছে, একটি ৮ ম্যাগনিচিউডের আর্থকোয়াক হলে দেখা যাবে— রাজশাহী থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত ৫০ শতাংশের বেশি এলাকাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি চট্টগ্রামে বড় আর্থকোয়াক হয়, তখন কক্সবাজার, নোয়াখালী ও সিলেট পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আসলে আমরা ঢাকা নিয়ে বলি, কারণ ঢাকাকে নিয়ে কাজ বেশি হয়েছে। আর ঢাকা আমাদের ক্যাপিটাল; ঢাকায় এফেক্ট হলে আমাদের ইকোনমি কলাপস করে যাবে।
এখানে একটা প্রসঙ্গে বলা দরকার। ফিলিপাইনে ‘ডিজাস্টার ফান্ড’ রয়েছে। প্রতিবছরের যে বাজেট, তার ৫ শতাংশ ওরা অ্যালোকেট করে রাখে ডিজাস্টারের ক্ষতি সামলে ওঠার জন্য। সেটি ফ্লাড হতে পারে, ভূমিকম্প বা সাইক্লোন হতে পারে। আমাদের দেশে যেহেতু আর্থকোয়াক বড় সমস্যা হিসেবে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে শহরে, তাই ডিজাস্টার ফান্ডের কথা আমাদেরও ভাবা দরকার। এ ছাড়া শহরের বিল্ডিংগুলোকে ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়ামের আওতায় যদি সরকার আনতে পারে, তাহলে ওখান থেকে যে প্রিমিয়ামটা কালেক্ট করা যাবে, সেটি কিন্তু আমাদের বড় সাপোর্ট হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম নিলে তারা ক্লায়েন্টকে েফার্স করবে ভালোভাবে বিল্ডিং তৈরি করতে। কারণ, বিল্ডিং ভাঙলে কিন্তু তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এটি একটি ইনডাইরেক্ট প্রসেস। এটি সারা ওয়ার্ল্ডেই প্র্যাকটিস করে।
আগামীর সময়: শহরাঞ্চলে বসবাস করা অধিকাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন। সে ক্ষেত্রে তো বাড়ির মালিক ভাড়া বাড়িয়ে ইন্স্যুরেন্সের টাকা তুলতে চাইবে...
মেহেদী আহমেদ আনসারী: প্রিমিয়াম খুব কম হবে। আমার এক আত্মীয় এখন থেকে ১০ বছর আগে প্রিমিয়াম নিয়েছিলেন। পুরো বিল্ডিংটার অ্যানুয়াল প্রিমিয়াম এক লাখ টাকা পড়েছিল। এখনো এ রকমই হবে প্রিমিয়াম, এর বেশি হওয়ার কথা নয়। এই এক লাখ টাকা যদি আমি ভাড়া হিসেবে ধরি, যদি ১০টি ফ্ল্যাট হয়, তাহলে আপনি কত করে পাচ্ছেন? ১০ হাজার টাকা করে বছরে। তার মানে মাসে হয়তো ৮০০ টাকা। খুব বেশি কিছু তো নয়।
বাংলাদেশ তো খুব ছোট একটা দেশ। ৮ মাত্রার আর্থকোয়াক হলে দেখা যাবে পুরো বাংলাদেশই কমবেশি এফেক্টেড হচ্ছে। আর ৭ হলে দেখা যাবে যে হয়তো পার্শিয়ালি এফেক্টেড হবে। আসলে শুধু ঢাকা না; আমরা সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, চট্টগ্রাম এগুলো নিয়েও ভাবি। ওভারঅল যেটি হচ্ছে, একটি ৮ ম্যাগনিচিউডের আর্থকোয়াক হলে দেখা যাবে— রাজশাহী থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত ৫০ শতাংশের বেশি এলাকাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি চট্টগ্রামে বড় আর্থকোয়াক হয়, তখন কক্সবাজার, নোয়াখালী ও সিলেট পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে
আগামীর সময়: ঢাকার অধিকাংশ ভবন বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হয়নি। এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর ক্ষেত্রে ‘রেট্রোফিটিং’ কতটা কার্যকর বা ব্যয়বহুল? এটির বাস্তবায়ন কীভাবে হবে?
মেহেদী আহমেদ আনসারী: রেট্রোফিটিংয়ের ক্ষেত্রে প্রথমে থার্ড পার্টি কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বিল্ডিং চেক করার জন্য। তারা বিল্ডিং চেক করে একটি রিপোর্ট দেয়। থার্ড পার্টির রিপোর্ট দুই স্তরের হয়– একটি হচ্ছে ইনিশিয়াল চেক করে যে বিল্ডিংটা ভালো, না খারাপ। আরেকটা হচ্ছে, ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট। গার্মেন্টস বিল্ডিংগুলোর কথা বলছি। ইনিশিয়াল চেকে যদি দেখে বিল্ডিংয়ের অবস্থা ভালো নয়, তখন সেকেন্ড স্টেপে আমরাই আবার বলি, ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করতে। ইনিশিয়াল চেক করতে হয়তো সাত দিন লাগে। ডিটেইল করতে কিন্তু দুই মাস লাগে। কারণ বিল্ডিংয়ের কংক্রিট, রড, মাটি ইত্যাদি এবং কম্পিউটারে ভবনের থ্রি-ডি মডেল তৈরি করে ভূমিকম্প সহনীয়তা পরীক্ষা করা হয়। যদি দেখে যে বিল্ডিংটা সাসটেইন করবে না, তখন ‘রেট্রোফিটিং’-এর প্রোপোজাল দেওয়া হয়। রেট্রোফিটিংয়ে মাটির নিচ থেকে বিল্ডিংয়ের কলামগুলোকে মোটা করা, বিমগুলো মোটা করাসহ বিভিন্ন কাজ করা হয়। রেট্রোফিটিংয়ে একজন কন্ট্রাক্টর কাজ করবে। কিন্তু এটির সুপারভিশনের দায়িত্ব হবে ওই ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মটার, যারা ভবনের নকশাটা প্রণয়ন করছে। কাজ েশষে তাকে একটা ফাইনাল সার্টিফিকেট দিতে হবে। সার্টিফিকেটে বলা থাকবে, ‘আমার নকশা অনুযায়ী কাজ করা হয়েছে এবং আমি সুপারভাইজ করেছি।’
রানা প্লাজা থেকে শুরু করে কমবেশি অনেক ইনভেস্টিগেশনে জড়িত ছিলাম। দেখা গেছে যে ইঞ্জিনিয়ার খুঁজে পাওয়া যায় না। তেমন কোনো কাগজ নেই। শুধু আর্কিটেকচারাল একটা ড্রয়িং পাওয়া যায়। কিন্তু কোন ইঞ্জিনিয়ার ডিজাইন করেছে, কীভাবে করছে— কোনো তথ্য নেই। সেটিকে এনশিওর করার জন্যই কিন্তু আমরা এই দায়বদ্ধতা এনেছি। তার একটি সার্টিফিকেট দিতেই হবে। না হলে সে তার টাকা ক্লেইম করতে পারবে না ক্লায়েন্টের কাছ থেকে। একটি পাঁচ কাঠার বিল্ডিংয়ে ইনিশিয়াল চেকিং বা ডিজাইন, ড্রয়িং করতে ৫-৬ লাখ টাকার মতো খরচ হয়। আর যদি রেট্রোফিটিং করতে হয়, সে ক্ষেত্রে একটি পাঁচ কাঠার প্লটে ৬০ লাখ টাকার মতো লাগবে।
২০১৫-তে যখন নেপালে আর্থকোয়াক হলো, তখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে এক মিটিংয়ে রেট্রোফিটিংয়ের প্রস্তাব করেছিলাম। বাট তখন কেউ রাজি হলো না। তখন রাজি হলে আমরা ১০ বছর এগিয়ে যেতাম। প্রসেসটা জলদি শুরু করা দরকার।
আগামীর সময় : ঢাকার অধিকাংশ ভবন তো জলাশয় ভরাট করে তৈরি। রেট্রোফিটিংটা আসলে এখানে কতটা কার্যকর? আর ভূমিকম্প হলে সয়েল লিকুইফ্যাকশন বা মাটির তরলীকরণের ঝুঁকি কতটা?
মেহেদী আহমেদ আনসারী: যদি বেলে মাটি হয় এবং নদী বা জলাশয় আশপাশে থাকে, তাহলে সেটি লিকুইফ্যাকশন হবে। ঢাকা শহরে কিছু এলাকায় বালুর ওপর ভবন দাঁড়িয়ে আছে। বসুন্ধরার ৬-৭ মিটার মাটি হচ্ছে বালু। এখানে লিকুইফ্যাকশন হবে, অ্যাম্প্লিফিকেশন হবে। মানে নরম বালু, লুজ বলি আমরা। লুজ বালু এবং নরম মাটি— এই দুটোতে অ্যাম্প্লিফিকেশন হবে। আর শুধু বালু মাটির মধ্যে লিকুইফ্যাকশন হয়। অ্যাম্প্লিফিকেশন কিন্তু দুইটাতেই হবে। কাদামাটিতেও হবে, বালুতেও হবে। ঢাকার প্রায় ৪০ শতাংশ কিন্তু জলাভূমি ছিল। ঢাকার চারদিকে যত প্রজেক্ট– ইস্টার্ন, শিকদার, বসুন্ধরাসহ আরও অনেক নাম না জানা ছোট ছোট কোম্পানি আছে, এগুলো সব জলাভূমি ভরাট করে তৈরি করেছে। এখানে লিকুইফ্যাকশনটা হবে। মানে ভূমিকম্প হলে সয়েল উইল বিহেভ অ্যাজ এ লিকুইড।
পদ্মা নদীর তীরে রূপপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করা হয়েছে। সেখানে যেটি করা হয়েছে– প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে মাটির ভেতরে সিমেন্ট ইনজেক্ট করা হয়েছে। সিমেন্ট যদি মাটির সঙ্গে মেশে ও পানির সংস্পর্শে আসে, সময় দিলে কিন্তু জমে যায়। রূপপুর পাওয়ার প্ল্যান্টে বালু মাটিকে কনভার্ট করা হয়েছে পাথরে। পাথরের সমস্ত বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেখানে। এভাবে বালুর সঙ্গে বা নরম কাদামাটির সঙ্গে যদি সিমেন্ট ইনজেক্ট করি, ওটা কিন্তু লিকুইফ্যাকশনটাকে থামিয়ে দিতে পারে। আরও কতগুলো টেকনিক আছে, যেটি করা সম্ভব– গ্রাউটিং আছে, স্যান্ড কমপ্যাকশন আছে। অনেকে মনে করে, পাইলিং করলেই বিল্ডিংটা টিকে যাবে, আসলে তা নয়। আপনি যদি একটা বাঁশ নরম মাটিতে পুঁতে নাড়াচাড়া করার চেষ্টা করেন, দেখবেন বাঁশটি নড়ছে। পাইল তো একটা শক্ত খুঁটি, ওটাও নড়বে। সে জন্য আশপাশের মাটিটাকেও শক্ত করে নিতে হবে। তার মানে লিকুইফ্যাকশন বা অ্যাম্প্লিফিকেশন যে মাটিতে ঘটবে, সেখানে পাইল ইজ নট এনাফ। মাটিটাকেও টেক কেয়ার করতে হবে। পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি, গুলশানে কিন্তু কোনো সমস্যা নেই। কারণ এই জায়গাগুলোর মাটি লাল। আমরা বলি, মধুপুর গড়। কিন্তু যত ডোবা-নালার ভেতর বাড়ি করা হয়েছে, সেখানে সমস্যা রয়েছে।
আমাদের এখানে সব আমলাই কিন্তু চায় ইকুইপমেন্ট কিনতে। কারণ ইকুইপমেন্টের পার্সেন্টেজ পাওয়া যায়। বিল্ডিংগুলো ভূমিকম্প-সহনীয় কি না, সে বিষয়ে আগ্রহ নেই
আগামীর সময়: অন্য প্রসঙ্গে আসি। ভূমিকম্পের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে স্কুলগুলোতে ড্রিল চালু করা যেতে পারে? এ বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেবেন?
মেহেদী আহমেদ আনসারী: এর জন্য কিন্তু প্রথমে বিল্ডিংটাকে ঠিক করতে হয়। আমরা বুয়েটে ফায়ার ড্রিল করতে চাচ্ছি। আমরা প্রথমে যেটি করেছি— আমাদের সিভিল বিল্ডিংয়ের তিনটি সিঁড়িতে ফায়ার ডোর লাগিয়েছি, যাতে আগুন ওখানে না ঢোকে। ফ্লোরে অ্যারো চিহ্ন দিয়ে রেখেছি। না হলে যখন হঠাৎ আমরা বেল দেব, শিক্ষার্থীরা প্যানিক করে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করবে। ওদের কিন্তু এই গাইডগুলো আমরা করেছি। ঠিক ভূমিকম্পের সময়ের জন্য এই ড্রিলটা করতে হবে। কিন্তু প্রথম এজাম্পশন হচ্ছে বিল্ডিং ইটসেলফ হ্যাজ টু বি আর্থকোয়াক প্রুফ। বিল্ডিং যদি ধসে যায়, আমাদের কোনো ট্রেনিংই কাজে আসবে না। সে জন্য প্রথম কথা হচ্ছে, যেই স্কুলে বা অফিসে আমরা এই ট্রেনিংগুলো দেব— আগে চেক করতে হবে সেগুলো ভূমিকম্প-সহনীয় কি না। এটি ফার্স্ট প্রায়োরিটি। তারপর আসবে ড্রিল। প্রথম হচ্ছে ভূমিকম্প চলাকালে প্যানিক করা যাবে না। বিল্ডিংয়ে যদি সেফ হয়, দেয়াল ঘেঁষে মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়াতে হবে। কারণ, ছাদটা যখন ভাঙে, তখন ছাদের মাঝখান দিকটা আগে পড়ে যায়। সাধারণত স্কুলের রুমগুলো অনেক বড় হয়ে থাকে, স্বাভাবিকভাবে দেয়াল অনেক লম্বা। শিক্ষার্থীদের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানোর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রথমে হচ্ছে ভূমিকম্প সহনীয় বিল্ডিং, দ্বিতীয় হচ্ছে ওদের ট্রেইনআপ করা মাথায় হাত দিয়ে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানো, থার্ড হচ্ছে ভূমিকম্প শেষ হয়ে গেলে ডিসিপ্লিনওয়েতে নামা।
আগামীর সময় : অনেক বছর ধরেই বলা হচ্ছে যে আমরা ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি। কোনো সরকার কি আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে? চেষ্টা করেছে যে আসুন, আমরা বসি; কী করা যায় দেখি...
মেহেদী আহমেদ আনসারী: এটি আসলে আমাদের ম্যান্ডেটে আছে কিন্তু। আমরা যদি এসওডি দেখি, স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট; ওখানে কিন্তু বলা আছে যে টেকনিক্যাল কমিটি করতে হবে, বুয়েটের বুদ্ধি নিয়ে লং টার্ম-শর্ট টার্ম প্ল্যানিং করতে হবে। প্রতিবার সরকার আসলে একবার আলাপ করে। এই সরকার এখনো আলাপ করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আলাপ হয়েছিল ২০২৪-এর নভেম্বরে। তার পরে আলাপ আর এগোয়নি। এই সরকার যেহেতু লং টার্মে এসেছে, আশা করি ভাববে এ বিষয়ে।
আগামীর সময়: ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতার সক্ষমতা ফায়ার ব্রিগেডের কতটা আছে বলে আপনার মনে হয়? শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের কথাই বলছি।
মেহেদী আহমেদ আনসারী: আমাদের এখানে সব আমলাই কিন্তু চায় ইকুইপমেন্ট কিনতে। কারণ ইকুইপমেন্টের পার্সেন্টেজ পাওয়া যায়। বিল্ডিংগুলো ভূমিকম্প-সহনীয় কি না, সে বিষয়ে আগ্রহ নেই। এখানে তো টাকা নেই। প্রজেক্টে তো পয়সা পাওয়া যায়। সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইকুইপমেন্ট অনেকবার কেনা হয়েছে। ১০০০ কোটি টাকার ইকুইপমেন্ট কেনা হয়েছে ২০১০-১২ সালে। ২০২২-এ প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলারের ইকুইপমেন্ট কেনা হয়েছে ফায়ার সার্ভিস আর সিটি করপোরেশনের জন্য। এখানে একটা তথ্য দিই। টার্কি আর্থকোয়াকে দেখা গেছে, সবকিছু মিলিয়ে একজন মানুষকে বিল্ডিংয়ের রাবেল থেকে বের করতে প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আমাদের কিন্তু একটা বিল্ডিংকে মজবুত করতে লাগবে ৬০ লাখ টাকা। তো, আমরা কি পাঁচতলা বিল্ডিংয়ে ৫০ জনকে বাঁচাব মজবুতিকরণ করে, নাকি ইনভেস্ট করব ইকুইপমেন্টে? রেট্রোফিটিংয়ে বরং সাধারণ মানুষকে যদি লং টার্ম-শর্ট টার্ম লোন দেওয়া যায়, সেটি আমাদের জন্য ভালো। ইকুইপমেন্ট আমাদের আছে। কিন্তু ইকুইপমেন্ট তো বছর বছর পড়ে থাকে। তবে আমাদের ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা আগের থেকে অনেক বেশি এখন। কিন্তু ফায়ার ব্রিগেডের সক্ষমতার সঙ্গে ভূমিকম্প-সহনীয় বিল্ডিং তৈরি করা দরকার। নইলে েদখা যাবে হাজার কোটি টাকার ইকুইপমেন্ট কিনে বসে আছি, ১০ বছর আর্থকোয়াক নেই, ওটা নষ্ট হয়ে গেছে। এইটা কিন্তু হয়েছে, ইনফ্যাক্ট ২০১০-এ ইকুইপমেন্টগুলোর অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। ওই কমিটিতে আমি কাজ করছি, আমি আর এখন যেতে চাই না। কারণ আমার মনে হয়েছে, ওখানে ভাগবাটোয়ারার চেষ্টা হয়।
আগামীর সময়: আপনাকে ধন্যবাদ।
মেহেদী আহমেদ আনসারী: আপনাকেও ধন্যবাদ।





