ডুবতে থাকা পুতিন কি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবেন

যে মানুষ ডুবতে শুরু করে, সে অনেক সময় নিজেকে বাঁচাতে অন্যকেও পানির নিচে টেনে নেয়
ভোরবেলা। আকাশটা তখনো পুরোপুরি আলোয় ভরেনি। রাশিয়ার এক তরুণ সৈনিক মায়ের পাঠানো শেষ মেসেজটা আরেকবার পড়ে নিলেন— ‘সাবধানে থেকো বাবা। যুদ্ধ শেষ হলে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসো।’
ছেলেটি হয়তো ভাবছিল, কয়েক মাস যুদ্ধ করে ফিরে আসবে। বুকভরা পদক থাকবে, থাকবে বীরত্বের গল্প।
কিন্তু যুদ্ধ মানুষের পরিকল্পনা মেনে চলে না। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার আগেই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে। সামনে কোনো ট্যাংক নেই, নেই যুদ্ধবিমান। চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা।
হঠাৎ আকাশে ভেসে এলো ভনভন শব্দ। একটি ছোট্ট ড্রোন। মুহূর্তের মধ্যে সেটি ঝাঁপিয়ে পড়ল। সব শেষ।
ভাবুন একবার। একজন মানুষকে মাসের পর মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, কোটি কোটি রুবল খরচ করে অস্ত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে, আর সামনের লাইনে গিয়ে তিনি আধা ঘণ্টাও টিকে থাকতে পারছেন না। এটাই এখন ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়ংকর বাস্তবতা।
একসময় যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণ করত ট্যাংক, কামান আর যুদ্ধবিমান। এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে কয়েক হাজার ডলারের ছোট ছোট ড্রোন। এই প্রযুক্তির বদলে যাওয়া যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনের মানচিত্রই পাল্টাচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে রাশিয়ার অর্থনীতি, সমাজ, এমনকি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও।
প্রশ্ন হচ্ছে— যদি সত্যিই যুদ্ধের জোয়ার পুতিনের বিপক্ষে ঘুরে যায়, তাহলে কি তিনি থেমে যাবেন? নাকি ডুবতে থাকা মানুষের মতো বাঁচার শেষ চেষ্টায় আরও ভয়ংকর কিছু করে বসবেন?
চলুন, ফরেন পলিসির এক নিবন্ধের আলোকে পুরো ঘটনাটা শুরু থেকে বুঝে নেওয়া যাক।
যে যুদ্ধ তিন দিনে শেষ হওয়ার কথা ছিল
২০২২ সালে ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেনে হামলার নির্দেশ দেন, তখন ক্রেমলিনের ধারণা ছিল— কয়েক দিনের মধ্যেই কিয়েভ দখল হয়ে যাবে; ইউক্রেন সরকার ভেঙে পড়বে; রাশিয়াপন্থী একটি সরকার ক্ষমতায় বসবে; তারপর সব শেষ।
কিন্তু বাস্তবতা হলো সম্পূর্ণ উল্টো। যুদ্ধ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধের সময়কালকেও ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধও এত দীর্ঘ হয়নি।
অর্থাৎ যে অভিযানকে পুতিন ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলেছিলেন, সেটিই এখন রাশিয়ার জন্য এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধ চলছে, কিন্তু সামনে এগোচ্ছে না রাশিয়া
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরও রাশিয়া উল্লেখযোগ্য কোনো সামরিক সাফল্য পাচ্ছে না। বরং কিছু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে রুশ বাহিনী কিছু এলাকায় উল্টো ভূখণ্ড হারিয়েছে।
অর্থাৎ হাজার হাজার সেনা মারা যাচ্ছেন, বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে; কিন্তু যুদ্ধের মানচিত্র প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এটাই আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিক।
একটি সংখ্যাই পুরো ছবিটা বদলে দেয়
যুদ্ধে কত মানুষ মারা গেছে, সেটা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রের হিসাব ভিন্ন। তবে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ-এর প্রধান আনা কিস্ট-বাটলারের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার নিহত সেনার সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখে পৌঁছেছে। আর পশ্চিমা বিভিন্ন সংস্থার হিসাব বলছে, নিহত ও আহত মিলিয়ে রাশিয়ার মোট সামরিক ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি।
সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার। একজন বাবা; একজন ছেলে; একজন স্বামী; আর একটি অসমাপ্ত জীবন।
যুদ্ধে শুধু কত মানুষ মারা গেল, সেটাই সব নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো— কে কত দ্রুত মানুষ হারাচ্ছে। সমরবিদদের অনেকেই বলছেন, একজন ইউক্রেনীয় সেনা নিহত বা গুরুতর আহত হওয়ার বিপরীতে রাশিয়ার আটজন সেনা একই পরিণতির শিকার হচ্ছেন। অর্থাৎ রাশিয়া শুধু যুদ্ধ করছে না; একই সঙ্গে নিজের সামরিক শক্তিকেও দ্রুত নিঃশেষ করে ফেলছে।
মাসে ৩০ হাজার মানুষ হারালে কী হয়
চলতি বছরে প্রতি মাসে রাশিয়ার গড়ে ৩০ হাজারেরও বেশি সেনা নিহত বা আহত হচ্ছে। এই বিশাল ক্ষতি পূরণ করা এখন ক্রেমলিনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই নতুন লোক টানতে রাশিয়া একের পর এক প্রলোভন দিচ্ছে। নতুন কেউ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে তাকে সাইনিং বোনাস হিসেবে দেওয়া হচ্ছে ৮০ হাজার ডলার পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, অনেকের ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত ঋণও মওকুফ করে দেওয়া হচ্ছে। ভাবুন, একটি দেশ কতটা মরিয়া হলে মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর জন্য এত বড় আর্থিক প্রলোভন দিতে বাধ্য হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো— টাকা দিয়ে মানুষকে যুদ্ধে পাঠানো যায়; কিন্তু জীবন ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।
যুদ্ধ ঢুকে পড়েছে রাশিয়ার ঘরে
একসময় রাশিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধ মানে ছিল টেলিভিশনের পর্দা। সংবাদে দেখানো কয়েকটি ভিডিও। ম্যাপে লাল আর নীল রঙের কয়েকটি তীর। তারপর আবার স্বাভাবিক জীবন। কারণ যুদ্ধ হচ্ছিল ইউক্রেনে। রাশিয়ার ভেতরে নয়।
ক্রেমলিনও সেটাই চেয়েছিল। দেশের মানুষ যেন মনে করে, এটি একটি ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’— দূরের কোথাও চলছে, যার প্রভাব তাদের দৈনন্দিন জীবনে পড়বে না।
কিন্তু যুদ্ধের একটা স্বভাব আছে। সে এক জায়গায় আটকে থাকে না। আজ সেই যুদ্ধ কড়া নাড়ছে রাশিয়ার নিজের দরজায়। আর সেই দরজা খুলে দিয়েছে ইউক্রেনের তৈরি ছোট ছোট ড্রোন। যে ড্রোন শুধু মানুষ নয়, অর্থনীতিকেও আক্রমণ করছে।
যুদ্ধের শুরুতে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল অস্ত্রের অভাব। রাশিয়ার মতো বিশাল বিমানবাহিনী নেই। বড় ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারও নেই। তাই ইউক্রেন বেছে নেয় অন্য পথ। নিজেদের প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করতে শুরু করে দীর্ঘপাল্লার ড্রোন। FP-1, FP-2, Hornet— এমন একের পর এক নতুন ড্রোন এখন শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে রাশিয়ার গভীরে গিয়ে আঘাত হানছে। এসব হামলার উদ্দেশ্য শুধু সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করা নয়। বরং এমন জায়গায় আঘাত করা, যেখানে আঘাত লাগলে পুরো দেশের অর্থনীতি কেঁপে ওঠে।
তাই ইউক্রেনের ড্রোনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে— তেল শোধনাগার, তেল পাইপলাইন, জ্বালানি সংরক্ষণাগার, জ্বালানি রপ্তানির অবকাঠামো। কারণ ইউক্রেন খুব ভালো করেই জানে, রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রের ফুয়েল আসে তেল থেকে। যেখানে অর্থনীতি দুর্বল হবে, সেখানেই দুর্বল হবে যুদ্ধের ক্ষমতা।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো— এর মূল্য শেষপর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এখন নিয়মিত জ্বালানির সংকটের খবর আসছে। কোথাও কোথাও রেশন করে জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে। রাশিয়ার অধিকৃত ক্রিমিয়ায় পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে, সাধারণ মানুষের কাছে জ্বালানি বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। দেশের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চলে জ্বালানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। এদিকে মে মাসে রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদন আরও ১০ শতাংশ কমে যায়। ফলে সরকার সাময়িকভাবে পেট্রল রপ্তানিও বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ, যে দেশ একসময় জ্বালানি বিক্রি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত, আজ সেই দেশকেই নিজের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মানুষের মনে প্রশ্নও বাড়ছে— এই যুদ্ধ কি সত্যিই জেতা সম্ভব? আর এখান থেকেই শুরু হচ্ছে ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য আরও বড় সংকট।
মস্কোও আর নিরাপদ নয়
একসময় মনে করা হতো, রাশিয়ার রাজধানী মস্কো এতটাই সুরক্ষিত যে সেখানে হামলা করা প্রায় অসম্ভব। আজ সেই ধারণাও ভেঙে গেছে। জুনের মাঝামাঝি ইউক্রেনের বড় ধরনের ড্রোন হামলায় মস্কোর সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগারগুলোর একটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই স্থাপনাটি ২০২৭ সালের আগে পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে চালু করা কঠিন হতে পারে।
এটি শুধু একটি শিল্পকারখানার ক্ষতি নয়। এটি ছিল একটি বার্তা— ‘আমরা চাইলে তোমাদের রাজধানীতেও পৌঁছাতে পারি।’ এমন বার্তা কোনো দেশের জনগণের আত্মবিশ্বাসের ওপর কত বড় আঘাত হানে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
প্রতিদিন সাত লাখ ব্যারেল তেল কম!
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধন সক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় সাত লাখ ব্যারেল কমে গেছে। সংখ্যাটি শুনতে হয়তো সাধারণ মনে হতে পারে।
কিন্তু এর অর্থ হলো— প্রতিদিন লাখ লাখ ডলারের উৎপাদন কমে যাওয়া, রপ্তানি কমে যাওয়া, সরকারের আয় কমে যাওয়া। আর সেই সঙ্গে যুদ্ধ চালানোর অর্থও কমে যাওয়া। অর্থাৎ, একটি ছোট ড্রোন হয়তো একটি ট্যাংক ধ্বংস করছে; কিন্তু শত শত ড্রোন একসঙ্গে মিলে ধীরে ধীরে একটি দেশের অর্থনীতিকেও রক্তশূন্য করে ফেলছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গেও কালো ধোঁয়া
জুনের শুরু। রাশিয়ার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরাম শুরু হওয়ার প্রথম সকাল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অতিথিরা সম্মেলনে আসছেন। ঠিক সেই সময় শহরের একটি তেল টার্মিনালে আঘাত হানে ইউক্রেনীয় ড্রোন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ ঢেকে যায় ঘন কালো ধোঁয়ায়।
ভাবুন পরিস্থিতিটা। রাশিয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বোঝাতে চাইছে—সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। আর ঠিক তখনই অতিথিদের চোখের সামনে জ্বলছে একটি তেল স্থাপনা। এর চেয়ে বড় বিব্রতকর বার্তা আর কী হতে পারে?
হাজার মাইল দূরেও নিরাপত্তা নেই এর কয়েক দিন পর আবার হামলা। এবার লক্ষ্য পশ্চিম সাইবেরিয়ার তিউমেন অঞ্চলের আন্টিপিনস্কি তেল শোধনাগার। এই স্থাপনাটি প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল পরিশোধন করে।
আর সবচেয়ে অবাক করার বিষয়— এটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এক হাজার মাইলেরও বেশি দূরে। অর্থাৎ, ইউক্রেন এখন এমন জায়গায়ও আঘাত করতে পারছে, যেগুলো একসময় সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে মনে করা হতো।
ফলে শুধু সীমান্ত নয়, রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলের ভ্লাদিভস্তক এবং সাখালিনের মতো দূরবর্তী এলাকাও এখন অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাধ্য হচ্ছে। একসময় যে দেশ অন্যদের ভয় দেখাত, এখন সেই দেশ নিজের আকাশ পাহারা দিতেই ব্যস্ত।
যুদ্ধ শুধু বন্দুক দিয়ে চলে না
অনেকে মনে করেন, যুদ্ধ মানেই বন্দুক, ক্ষেপণাস্ত্র আর ট্যাংক। আসলে যুদ্ধের আরেকটি ফ্রন্ট আছে— অর্থনীতি। যে দেশের অর্থনীতি টিকে থাকবে, শেষপর্যন্ত তার যুদ্ধ করার ক্ষমতাও টিকে থাকবে। আর এখানেই রাশিয়ার সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হচ্ছে।
ইউক্রেনের ড্রোন একের পর এক তেল স্থাপনায় আঘাত করছে। জ্বালানি উৎপাদন কমছে, সঙ্গে সরকারের আয় কমছে। অন্যদিকে যুদ্ধ চালাতে প্রতিদিনই লাগছে বিপুল অর্থ। একসময় এই দুইয়ের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর সেই সংঘর্ষের লক্ষণ এরই মধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে।
ফাটল অর্থনীতির ভিতেও
যুদ্ধের প্রথম দিকে রাশিয়ার মানুষ ভেবেছিল, সবকিছু সাময়িক; কিন্তু এখন বাজারে দাম বাড়ছে। শ্রমিকের সংকট দেখা দিচ্ছে। রাষ্ট্রের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। আর এই সংকট নিয়ে খোলাখুলিভাবে সতর্ক করতে শুরু করেছেন খোদ রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও। এখান থেকেই শুরু হচ্ছে পুতিনের জন্য সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। কারণ যুদ্ধে শত্রুর মুখোমুখি হওয়া সহজ।
কিন্তু নিজের দেশের অর্থনীতি, ব্যবসায়ী ও জনগণের অসন্তোষের মুখোমুখি হওয়া অনেক বেশি কঠিন।
যুদ্ধে গোলার শব্দ প্রথমে শোনা যায় সীমান্তে। তারপর সেই শব্দ ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় বাজারে, কারখানায়, ব্যাংকে; শেষপর্যন্ত মানুষের রান্নাঘরেও।
আজ রাশিয়ায় ঠিক সেটাই ঘটছে। যে যুদ্ধ একসময় শুধু ইউক্রেনের মাটিতে সীমাবদ্ধ ছিল, সেটি এখন রাশিয়ার অর্থনীতির ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আর অর্থনীতিতে লাগা আগুন নিভানো অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রের আগুন নেভানোর চেয়েও কঠিন হয়ে পড়ে।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলভিরা নাবিউলিনা সাধারণত খুব মেপে কথা বলেন; কিন্তু তিনিও সম্প্রতি সতর্ক করেছেন— দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং অর্থনীতির অবনতি প্রায় স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।
আরও একটি বিষয় তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। রাশিয়ার আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শ্রমিক সংকট এত প্রকট হয়েছে।
কারণ, হাজার হাজার মানুষ যুদ্ধে মারা গেছেন। অনেকে গুরুতর আহত। আবার বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ এখন যুদ্ধক্ষেত্রে। ফলে কারখানা চালানোর মতো লোকও কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ, যুদ্ধ শুধু মানুষ কেড়ে নিচ্ছে না; উৎপাদনক্ষম হাতও কমিয়ে দিচ্ছে।
দুটি পথ— দুটিই বিপজ্জনক
সুইডেনের সামরিক গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান টমাস নিলসন রাশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে একটি কঠিন মূল্যায়ন দিয়েছেন। তার ভাষায়, রাশিয়ার সামনে এখন মূলত দুটি সম্ভাবনা রয়েছে। একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পতন। অথবা একটি আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা।
আর যে পথেই যাওয়া হোক না কেন, শেষ গন্তব্য হতে পারে আর্থিক বিপর্যয়। এ ধরনের মন্তব্য সাধারণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছ থেকে নয়, বরং গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের কাছ থেকে এসেছে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
পুতিনের ঘনিষ্ঠরাও কি চিন্তিত?
যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়ার ধনী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে খুব একটা মুখ খোলেননি; কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
মস্কোয় এমন গুঞ্জনও ছড়িয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নাবিউলিনাকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। কারণ, তার অর্থনৈতিক সতর্কবার্তাগুলো নাকি ক্রেমলিনের জন্য অস্বস্তিকর। এদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার ভরতে রাশিয়ার ধনকুবেরদের কাছ থেকে তথাকথিত ‘স্বেচ্ছা অনুদান’ নেওয়া হচ্ছে। সরকার আশা করছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এভাবে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা যাবে।
শুধু তাই নয়। সম্প্রতি রাশিয়ার অন্যতম বড় কৃষি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ভাদিম মোশকোভিচের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদও রাষ্ট্র জব্দ করেছে।
এই ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। যুদ্ধের খরচ মেটাতে সরকার এখন শুধু সাধারণ মানুষের দিকে নয়, দেশের ধনীদের দিকেও হাত বাড়াচ্ছে।
আর ইতিহাস বলে, ক্ষমতাসীনদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা শুরু হয় তখনই, যখন তাদের নিজের সমর্থকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকেন।
রাশিয়ায় কি আবার ১৯১৭ সালের ছায়া?
রুশ সামরিক ব্লগার ম্যাক্সিম কালাশনিকভ সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন— ‘আমরা কি আবার ১৯১৭ সালের মতো কোনো ঘটনার দিকে এগোচ্ছি?’
১৯১৭ সাল রাশিয়ার ইতিহাসে এক ভয়াবহ মোড়। সে বছর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চাপে রুশ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। জার দ্বিতীয় নিকোলাস ক্ষমতা হারান। এরপরই শুরু হয় রুশ বিপ্লব, যার পথ ধরে জন্ম নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।
অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক সেই জায়গায় পৌঁছেছে— এমনটা বলছেন না বিশ্লেষকরা। তবে তারা মনে করেন, অর্থনৈতিক চাপ, যুদ্ধের ক্লান্তি এবং জনঅসন্তোষ মিলিয়ে ক্রেমলিনের ভেতরে ধীরে ধীরে ফাটল তৈরি হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ভয়। অনেকেই ভাবতে পারেন— যদি পুতিন চাপে পড়েন, তাহলে হয়তো তিনি যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করবেন; কিন্তু ইতিহাস সবসময় সে কথা বলে না। বরং ইতিহাস আর মনোবিজ্ঞান— দুটোই আরেকটি সতর্কবার্তা দেয়। যে মানুষ ডুবতে শুরু করে, সে অনেক সময় নিজেকে বাঁচাতে অন্যকেও পানির নিচে টেনে নেয়। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘Drowning Man Syndrome’। এই ধারণাটিই এখন বহু পশ্চিমা বিশ্লেষকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধক্ষেত্রে, অর্থনীতিতে এবং রাজনীতিতে চাপ যত বাড়বে, পুতিন ততই নতুন করে উত্তেজনা বাড়ানোর পথ বেছে নিতে পারেন। আর সেখানেই শুরু হচ্ছে এই গল্পের সবচেয়ে বিপজ্জনক অধ্যায়।
ধরুন, একজন মানুষ নদীতে ডুবে যাচ্ছেন। তিনি সাঁতার জানেন না। চারপাশে পানি। বাঁচার আর কোনো উপায় নেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে যদি আরেকজন মানুষ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যান, অনেক সময় ডুবতে থাকা ব্যক্তি আতঙ্কে উদ্ধারকারীকেই জড়িয়ে ধরেন। এমনকি নিজেকে ভাসিয়ে রাখার জন্য অন্য মানুষটিকেও পানির নিচে ঠেলে দেন। মনোবিজ্ঞানে এই আচরণকেই বলা হয় ‘ড্রাউনিং ম্যান সিনড্রোম’।
অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক বলছেন, ভ্লাদিমির পুতিনের বর্তমান অবস্থাও অনেকটা এমন। যুদ্ধের ময়দানে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য নেই, অর্থনীতি চাপে, দেশের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে।
এমন অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— পুতিন কি শান্ত হবেন, নাকি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবেন? চাপ বাড়লেই কেন হুমকির ভাষা বদলে যায়?
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই একটি বিষয় বারবার দেখা গেছে। যখনই রাশিয়া বড় ধরনের চাপে পড়েছে, তখনই ক্রেমলিনের ভাষা আরও কঠোর হয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনার বদলে এসেছে হুমকি। সামরিক ব্যর্থতার পর বেড়েছে পারমাণবিক অস্ত্রের আলোচনা। অর্থনৈতিক সংকটের সময় বেড়েছে পশ্চিমবিরোধী বক্তব্য। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি শুধু কাকতালীয় নয়; বরং এটি ক্রেমলিনের একটি পরিচিত কৌশল।
পুরনো গল্প, নতুন জোর
পুতিন ক্ষমতায় আসার পর থেকে একটি কথা বারবার বলা হয়েছে— ন্যাটো রাশিয়াকে ঘিরে ফেলছে। পশ্চিম রাশিয়াকে দুর্বল করতে চায়। এই বক্তব্য বহু বছর ধরেই ক্রেমলিনের রাজনৈতিক প্রচারের অংশ; কিন্তু যুদ্ধ যত কঠিন হচ্ছে, এই ভাষাও তত তীব্র হচ্ছে।
রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সের্গেই নারিশকিন পর্যন্ত দাবি করেছেন, ব্রিটেন নাকি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনায় ভূমিকা রাখছে। যদিও পশ্চিমা বিশ্লেষকরা এই দাবিকে বাস্তবতার সঙ্গে অসংগত বলেই মনে করেন।
সমস্যা হলো— পুতিনের সামনে সহজ কোনো পথ নেই এখন পুতিন কী করতে পারেন?
যুদ্ধ চালিয়ে গেলে— অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে, মানুষ আরও ক্লান্ত হবে, অসন্তোষও বাড়বে।
আবার যুদ্ধ থামিয়ে সমঝোতায় গেলে— সেটিও তার জন্য সহজ নয়। কারণ গত কয়েক বছরে রাশিয়ার অর্থনীতির একটি বড় অংশই যুদ্ধনির্ভর হয়ে উঠেছে। অস্ত্র কারখানা চলছে। সামরিক সরঞ্জাম তৈরির অর্ডার বাড়ছে। লাখো মানুষ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। হঠাৎ যুদ্ধ থেমে গেলে সেই অর্থনীতিও বড় ধাক্কা খেতে পারে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক দিক থেকেও পুতিনের জন্য সমঝোতা কঠিন। কারণ শুরু থেকেই তিনি দাবি করে আসছেন, ইউক্রেনকে রাশিয়ার প্রভাব বলয়ের বাইরে থাকতে দেওয়া যাবে না। এই অবস্থান থেকে সরে আসা তার নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্যও বড় আঘাত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় ভয়— হারানোর কিছু না থাকলে মানুষ কী করে? ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় নিয়েছেন এমন নেতারাই, যাদের মনে হয়েছে— এখন আর হারানোর কিছু নেই। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কাও ঠিক এখানেই।
তাদের মতে, যুদ্ধ যত কঠিন হবে, পুতিন তত বেশি হাইব্রিড যুদ্ধ, সাইবার হামলা, নাশকতা কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে গোপন অভিযান বাড়াতে পারেন।
এর মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর রুশ সাইবার হামলার অভিযোগ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এগুলো হয়তো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়; কিন্তু এগুলোও যুদ্ধেরই আরেকটি রূপ।
তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে। আধুনিক যুদ্ধ আর শুধু সীমান্তে লড়া হয় না। এটি লড়া হয় অর্থনীতিতে, প্রযুক্তিতে, ড্রোনে, সাইবার জগতে, জনমতে, এমনকি মানুষের মনেও।
আজ রাশিয়া যেমন চাপের মুখে, তেমনি ইউক্রেনও ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, অসংখ্য প্রাণ ঝরে গেছে, শহর ধ্বংস হয়েছে। তাই এই যুদ্ধের কোনো পক্ষই প্রকৃত অর্থে বিজয়ী নয়— সবচেয়ে বড় পরাজিত সাধারণ মানুষ।
আর ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে যে প্রশ্নটি দিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম, সেটি এখনো উত্তরহীন— চাপের মুখে তিনি কি সমঝোতার পথ বেছে নেবেন, নাকি আরও সংঘাতের?
এর উত্তর আজ কারও জানা নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। যে যুদ্ধ ২০২২ সালে কয়েক দিনের অভিযানের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল, সেটি এখন রূপ নিয়েছে এমন এক দীর্ঘ সংঘাতে, যার প্রভাব শুধু ইউক্রেন বা রাশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি— সবই এই যুদ্ধের অভিঘাতে বদলে যাচ্ছে।
লেখক: উপ-বার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়





